আপনার কাছ থেকে অগ্রিম কর নেয় কেন, কতটা যৌক্তিক

আয়কর রিটার্নপ্রতীকী ছবি

মোটরসাইকেলের মালিকদের ওপর অগ্রিম আয়কর বসানোর পরিকল্পনা করছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। আগামী বাজেটে এমন প্রস্তাব আসতে পারে। এ নিয়ে মোটরসাইকেলচালকদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। গতকাল রোববার সকালে কয়েক শ মোটরসাইকেলচালক এর প্রতিবাদ করেছেন। অগ্রিম কর না বসাতে এনবিআর চেয়ারম্যান বরাবর স্মারকলিপি দিয়েছেন তাঁরা।

শুধু মোটরসাইকেল মালিক নন, আমদানিকারক, ব্যবসায়ী, বাড়ি ও গাড়ির মালিকসহ সমাজের নানা শ্রেণি–পেশার করদাতাদের নানা কারণে অগ্রিম কর দিতে হয়, যা অনেক সময় যৌক্তিক হয় না। তবু করদাতাকে অগ্রিম কর দিতে হয়, যা করদাতার ওপর চাপ সৃষ্টি করে।

এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, আয়কর বিভাগ প্রতিবছর যত টাকার আয়কর আদায় করে থাকে, এর মধ্যে দুই–তৃতীয়াংশের বেশি আদায় হয় উৎসে বা অগ্রিম কর থেকে।

এখন প্রশ্ন হলো সরকার কেন আপনার কাছ থেকে অগ্রিম কর নেয়। এই অগ্রিম আয়কর নেওয়া কতটা যৌক্তিক।

১. করদাতার সামাজিক অবস্থান

করদাতার সামাজিক অবস্থান, আয়, বাড়ি, গাড়িসহ সম্পদের পরিমাণ—এসব দেখে বোঝা যায় তাঁর করযোগ্য আয় আছে। এ ধরনের করদাতার কাছ থেকে এনবিআর অগ্রিম কর আদায় করে। তাঁদের করযোগ্য আয় আছে, এখন অগ্রিম কর দিলেও সমস্যা নেই। বছর শেষে রিটার্ন দেওয়ার সময় অগ্রিম কর দেওয়া করদাতারা তা সমন্বয় করতে পারবেন। কিন্তু মোটরসাইকেলের মালিকদের ওপর অগ্রিম আয়কর বসানোর যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। যেমন মোটরসাইকেলের মালিকদের ওপর মোটরসাইকেলের ইঞ্জিনের ক্ষমতাভেদে (সিসি ভেদে) ২ থেকে ১০ হাজার টাকা বসানোর যে চিন্তা করা হচ্ছে, তা অনেক বাইকারের কাছে অযৌক্তিক। তাঁদের আয়কর দেওয়ার করযোগ্য আয় নেই।

২. রাজস্বের চাপ সামলাতে

উৎসে বা অগ্রিম কর আদায় হলো এনবিআরের কর আদায়ের একটি সহজ পথ। রাজস্ব আদায়ের চাপে পড়ে কয়েক বছর ধরে এনবিআর এই সহজ পথে গেছে। বিভিন্ন খাতে উৎসে কর বা অগ্রিম কর বসিয়ে কর আদায় করা হয়। বছরের শেষে কর পাওয়ার জন্য অপেক্ষা না করে সারা বছর ধাপে ধাপে রাজস্ব সংগ্রহ করা যায়।

৩. কর ফাঁকি কমাতে

পণ্য আমদানি, গাড়ি নিবন্ধন, জমি বিক্রি বা ব্যাংক লেনদেনের সময় আগেই কর কেটে নেওয়ায় আয়ের তথ্য গোপন করা কঠিন হয়।

৪. করদাতাকে কর শোধে অভ্যস্ত করতে

একসঙ্গে বড় অঙ্কের কর না দিয়ে ধাপে ধাপে কর দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। যেমন প্রতি মাসে বেতন–ভাতা দেওয়ার সময় অনেক প্রতিষ্ঠান পে–রোল কর হিসেবে অগ্রিম কর কেটে রেখে সরকারি কোষাগারে জমা দেয়।

৫. অপ্রদর্শিত আয় শনাক্ত করতে

কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ব্যয় ও লেনদেনের সঙ্গে আয়কর রিটার্ন মিলিয়ে এনবিআর সহজে অসংগতি ধরতে অগ্রিম কর আরোপ করে।

৬. ব্যবসার লেনদেন নজরদারিতে

আমদানি, রপ্তানি, ঠিকাদারি, পরিবহন বা কমিশনভিত্তিক আয়ের ওপর অগ্রিম কর নেওয়ায় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের তথ্য সরকারের কাছে আসে।

৭. করব্যবস্থাকে স্বয়ংক্রিয় ও কার্যকর করতে

উৎসে কর কাটা বা অগ্রিম কর নেওয়ার মাধ্যমে আলাদা করে পরে কর আদায়ের চাপ কমে।

৮. সরকারের নগদের প্রবাহ বাড়াতে

সরকার উন্নয়ন ব্যয়, বেতন–ভাতা ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির জন্য দ্রুত অর্থ পায়। কারণ, অগ্রিম কর সারা বছর আহরণ করা হয়।

৯. করের আওতা বাড়াতে

অনেক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান নিয়মিত রিটার্ন না দিলেও বিভিন্ন সেবার সময় অগ্রিম কর দেওয়ার মাধ্যমে কর নেটের মধ্যে আসে।

১০. অর্থনীতির লেনদেনের তথ্যভান্ডার তৈরি করতে

ব্যাংক, সম্পদ ক্রয়–বিক্রয় ও আমদানির তথ্য থেকে কর কর্তৃপক্ষ অর্থনৈতিক কার্যক্রম বিশ্লেষণ করতে পারে।