এসির নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবনে দেশি কোম্পানির পেটেন্ট
দেশের শিল্পাঞ্চলে ব্যবহৃত বিভিন্ন কেমিক্যাল, দূষিত পানি ও ব্যাটারির বর্জ্যের কারণে বাতাসে সালফার ও সিসার মতো ক্ষতিকর উপাদানের পরিমাণ বাড়ছে। এতে বায়ুমণ্ডলে অ্যাসিডিক পরিবেশ তৈরি হচ্ছে। এর প্রভাব শুধু মানুষের স্বাস্থ্যের ওপরই পড়ছে না, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্রও (এসি)। বিশেষ করে এসির কপার ও অ্যালুমিনিয়ামের যন্ত্রাংশে ধীরে ধীরে ক্ষয় বা ‘পিটিং করোশন’ তৈরি হয়। উপকূলীয় এলাকা কক্সবাজারেও বাতাসে লবণাক্ততার ফলেও একই সমস্যা দেখা যায়। লবণাক্ততার কারণে এসির তাপ বিনিময় (হিট এক্সচেঞ্জ) যন্ত্র ক্ষয় হয়ে যায়। এতে এসির স্থায়িত্ব কমে।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রায় দুই বছরের চেষ্টায় বিশেষ কোটিং প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে দেশি প্রতিষ্ঠান ওয়ালটন। এই কোটিং প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করেছে ওয়ালটন এয়ার কন্ডিশনারের গবেষণা ও উন্নয়ন বিভাগ। ২০২৪ সালে ওয়ালটন এই প্রযুক্তির পেটেন্টের আবেদন করে। পরের বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালে পেটেন্ট, শিল্প নকশা ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তর এই প্রযুক্তি নিবন্ধন করে। চলতি বছরে আনুষ্ঠানিকভাবে এই প্রযুক্তির পেটেন্ট পায় ওয়ালটন।
ওয়ালটন জানায়, লবণাক্ততার কারণে কক্সবাজারে ২০১৯ সালে এই বিশেষ কোটিং প্রযুক্তি নিয়ে কাজ শুরু করে ওয়ালটন। লবণাক্ত পরিবেশে বড় সময় ধরে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে ক্ষয়ের ধরন পর্যবেক্ষণ করে প্রতিষ্ঠানটি। এতে একসময় সফলতা পায় ওয়ালটন। গবেষণায় বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সহযোগিতা নেওয়া হয়। নিরীক্ষার ফলাফলে দেখা যায়, সাধারণ এসির তুলনায় এই প্রযুক্তির এসি প্রায় ৩৫ শতাংশ বেশি সময় টেকসই থাকতে পারে।
এ বিষয়ে ওয়ালটন এসির গবেষণা ও উন্নয়ন বিভাগের প্রধান আরিফুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, বর্তমানে বেশির ভাগ এসিতে অ্যালুমিনিয়াম ফিনের সাধারণ কোটিং থাকে। তবে কপার টিউবগুলোর বড় অংশ উন্মুক্ত থাকে। ওয়ালটনের প্রযুক্তিতে এই উন্মুক্ত কপার অংশেই বিশেষ কোটিং প্রয়োগ করা হয়েছে। যেখানে সাধারণত লিকেজের ঝুঁকি বেশি থাকে। এর মাধ্যমে কনডেনসার, ইভাপোরেটরসহ পুরো হিট এক্সচেঞ্জার ইউনিট সুরক্ষিত থাকে।
ওয়ালটনের কর্মকর্তারা জানান, ২০১৯ সালে কক্সবাজারে প্রযুক্তিটির সফল পরীক্ষামূলক ব্যবহার শেষে ২০২২ সালে গাজীপুরের বান জিন জিও টেক্সটাইলের কারখানায় পরীক্ষামূলকভাবে পাঁচটি এসি স্থাপন করা হয়। সাধারণত ওই পরিবেশে এসিগুলো এক থেকে দেড় বছরের বেশি টেকসই হতো না। তবে নতুন প্রযুক্তি ব্যবহৃত এসিগুলোর মধ্যে দুটি চার বছর পর্যন্ত কার্যকর ছিল। বাকি তিনটি এখনো চালু রয়েছে।
বান জিন গ্রুপের উপমহাব্যবস্থাপক মো. আবু আসলাম রিয়াজ খান বলেন, শিল্পকারখানাগুলোতে এসি প্রায় ২৪ ঘণ্টাই চালু রাখতে হয়। তবে দূষিত পরিবেশের কারণে সাধারণ এসি এক থেকে দেড় বছরের মধ্যেই নষ্ট হয়ে যায়। এ ছাড়া কারখানার পাশ দিয়ে একটি খাল বয়ে গেছে। যেখানে বিভিন্ন কারখানার ডায়িংয়ের বর্জ্য ফেলা হয়। এর প্রভাবে বাতাসে দূষণের মাত্রা বাড়ছে। এতে ধাতব যন্ত্রাংশে দ্রুত মরিচা ধরে। তবে ওয়ালটনের নতুন প্রযুক্তির এসি ব্যবহারে এ সমস্যা কমেছে।
পেটেন্ট, শিল্প নকশা ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই বিশেষ ধরনের অ্যান্টি–করোসিভ ইন্ডাস্ট্রিয়াল কোটিং তিনটি পৃথক কৌশলে প্রয়োগ করা হয়। এগুলো এসির কপার টিউব, অ্যালুমিনিয়াম মাইক্রো চ্যানেল উপাদান ও ব্রেজড জয়েন্টের ওপর প্রয়োগ করে স্থায়িত্ব বাড়ানো হয়। প্রথমে ধাতব পৃষ্ঠ পরিষ্কার করে দূষিত উপাদান অপসারণ করা হয়। এরপর কোটেক নামের বিশেষ কোটিং তিনটি পৃথক কৌশলে প্রয়োগ করা হয়। কপার টিউবের ক্ষেত্রে ডিপিং পদ্ধতিতে ইপোক্সি পেইন্ট ও থিনারের ৪-১ অনুপাতে তৈরি মিশ্রণ ব্যবহার করা হয়। অ্যালুমিনিয়াম মাইক্রো চ্যানেল অংশে ২-১ অনুপাতে পেইন্ট ও প্রাইমারের মিশ্রণ স্প্রে করা হয়। অন্যদিকে ব্রেজড জয়েন্টে ২-১ অনুপাতে পেইন্ট ও হার্ডেনারের মিশ্রণ লাগানো হয়।
ওয়ালটন হাইটেক ইন্ডাস্ট্রিজের এসি সার্ভিস ইনচার্জ মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, এসিতে মূলত মাইক্রো চ্যানেল ও কপার এই দুই ধরনের কনডেনসার ব্যবহার করা হয়। তবে দূষিত পানি ও কেমিক্যালযুক্ত পরিবেশে এসব কনডেনসার দীর্ঘদিন স্থায়ী হয় না। এ কারণে এসির স্থায়িত্ব বাড়াতে বিশেষ কোটিং প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে।