রেডি ফ্ল্যাট নাকি নির্মাণাধীন প্রকল্প: কোথায় সুবিধা ও ঝুঁকি কেমন
ফ্ল্যাট কেনা অনেকের কাছেই জীবনের বড় সিদ্ধান্তগুলোর একটি। যেখানে পরিবার নিয়ে নিশ্চিন্তে থাকা যাবে, সাজানো যাবে নিজের মতো করে। তবে এ রকম বড় একটি আর্থিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে শুধু পছন্দের ফ্ল্যাটটি দেখলেই হয় না; নিজের সামর্থ্য, প্রয়োজন এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথাও ভাবতে হয়।
ফ্ল্যাট কেনার ক্ষেত্রে তাই সামনে আসে নানা প্রশ্ন। রেডি ফ্ল্যাট কিনে দ্রুত নিজের বাসায় উঠবেন? নাকি নির্মাণাধীন প্রকল্পে বুকিং দিয়ে কিছুটা সময় অপেক্ষা করবেন? কোনটিতে অর্থ পরিশোধের চাপ কম, কোথায় ঝুঁকি বেশি আবার কোনটিতে নিজের পছন্দ অনুযায়ী পরিবর্তনের সুযোগ রয়েছে? আসুন, জানা যাক প্রশ্নগুলোর উত্তর।
রেডি ফ্ল্যাটে কী সুবিধা
রেডি ফ্ল্যাটের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো ফ্ল্যাটের আয়তন, আলো-বাতাস, বারান্দা, রান্নাঘর, বাথরুম কিংবা ঘরের বিন্যাস—সবকিছু চোখের সামনে থাকে। শুধু ফ্ল্যাট নয়, ভবনের লিফট, সিঁড়ি, পার্কিং, প্রবেশপথ এবং আশপাশের পরিবেশও দেখে নেওয়া সম্ভব। বিশেষ করে ঢাকার মতো শহরে ফ্ল্যাটের অবস্থান একটি বড় বিষয়।
অফিসে যাতায়াতে কতটা সময় লাগবে; কাছাকাছি বাজার, স্কুল, হাসপাতাল বা অন্যান্য প্রয়োজনীয় সুবিধা আছে কি না, এসব বিষয় বাস্তবে যাচাই করা যায়। নির্মাণাধীন প্রকল্পের ক্ষেত্রে যেসব বিষয় ভবিষ্যতের ওপর নির্ভর করে, রেডি ফ্ল্যাটে তার অনেকটাই আগে থেকে বোঝা সম্ভব।
আরেকটি বড় সুবিধা হলো হস্তান্তরের জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয় না। যাঁরা বর্তমানে ভাড়া বাসায় থাকেন এবং দ্রুত নিজের বাসায় উঠতে চান, তাঁদের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ। বিনিয়োগের উদ্দেশে ফ্ল্যাট কিনলে হস্তান্তরের পর ভাড়া দেওয়ার সুযোগও তৈরি হয়। তবে রেডি ফ্ল্যাট মানেই সব ক্ষেত্রে সহজ সিদ্ধান্ত নয়।
অনেক সময় একসঙ্গে বড় অঙ্কের অর্থের প্রয়োজন হতে পারে। এর সঙ্গে নিবন্ধন, পার্কিং, ইউটিলিটি সংযোগ বা অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচও থাকতে পারে। ফলে শুধু বিজ্ঞাপনে দেওয়া ফ্ল্যাটের দাম দেখলে হবে না, মোট কত টাকা খরচ হবে, সেটিও হিসাব করতে হবে।
নির্মাণাধীন প্রকল্পে কেন আগ্রহ
নির্মাণাধীন প্রকল্পে ফ্ল্যাট কিনলে হস্তান্তরের জন্য অপেক্ষা করতে হয়। তবে অনেক ক্রেতার কাছে এর আকর্ষণ হলো তুলনামূলক নমনীয় অর্থ পরিশোধের সুযোগ। বুকিংয়ের সময় একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ দেওয়ার পর প্রকল্পের অগ্রগতির সঙ্গে নির্ধারিত সময়ে কিস্তিতে টাকা পরিশোধ করা যায়।
চাকরি বা ব্যবসা থেকে নিয়মিত আয় আছে কিন্তু এখনই পুরো অর্থ হাতে নেই—এমন ক্রেতার জন্য এই ব্যবস্থা সুবিধাজনক হতে পারে। তবে কিস্তির অঙ্ক দেখেই সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়। পুরো প্রকল্পে ক্রেতাকে শেষ পর্যন্ত কত টাকা দিতে হবে, পার্কিং বা অন্যান্য সুবিধার জন্য আলাদা অর্থ লাগবে কি না, নিবন্ধন ও অন্যান্য খরচ কত—সবকিছু মিলিয়ে হিসাব করা প্রয়োজন।
নিজের মতো পরিবর্তনের সুযোগ কতটা
নির্মাণাধীন ফ্ল্যাটের ক্ষেত্রে কিছু বিষয়ে নিজের পছন্দ জানানোর সুযোগ থাকতে পারে। প্রকল্পের পর্যায় ও ডেভেলপারের নীতিমালা অনুযায়ী রান্নাঘরের কিছু বিন্যাস, টাইলস, রং বা অভ্যন্তরীণ কাজের ক্ষেত্রে পরিবর্তনের সুযোগ পাওয়া যেতে পারে। তবে সব প্রকল্পে সব ধরনের পরিবর্তন করা যায় না। কোনো পরিবর্তনের জন্য অতিরিক্ত অর্থও দিতে হতে পারে।
তাই বুকিংয়ের সময় শুধু মৌখিক আশ্বাসের ওপর নির্ভর না করে কোন কোন পরিবর্তনের সুযোগ রয়েছে এবং এর জন্য অতিরিক্ত খরচ কত, তা পরিষ্কারভাবে জেনে নেওয়া ভালো। রেডি ফ্ল্যাটে অবশ্য এসব পরিবর্তনের সুযোগ তুলনামূলক সীমিত। ফ্ল্যাটটি যেভাবে তৈরি হয়েছে, মূলত সেভাবেই নিতে হয়। পরে পরিবর্তন করতে চাইলে আলাদা সময় ও খরচ প্রয়োজন হয়।
ঝুঁকি শুধু নির্মাণাধীন প্রকল্পে নয়
নির্মাণাধীন প্রকল্পে হস্তান্তর পিছিয়ে যাওয়া বা নির্মাণের অগ্রগতি নিয়ে অনিশ্চয়তার কথা বেশি বলা হলেও রেডি ফ্ল্যাটও ঝুঁকিমুক্ত নয়। রেডি ফ্ল্যাট কেনার আগে জমির মালিকানা, ভবনের অনুমোদন, নির্মাণের মান, ইউটিলিটি সংযোগ, নিবন্ধনের সুযোগ এবং কোনো আইনি জটিলতা আছে কি না—এসব যাচাই করা জরুরি। ভবন তৈরি হয়ে গেছে বলেই সব কাগজপত্র ঠিক আছে, এমনটি ধরে নেওয়া ঠিক নয়। নির্মাণাধীন প্রকল্পের ক্ষেত্রে এসব বিষয়ের পাশাপাশি ডেভেলপারের সক্ষমতা, প্রকল্পের অগ্রগতি এবং নির্ধারিত সময়ে হস্তান্তরের বিষয়ও দেখতে হয়।
রেডি ফ্ল্যাট ও নির্মাণাধীন প্রকল্প: কোনটি ভালো
জেসিএক্স ডেভেলপমেন্টস লিমিটেডের ব্র্যান্ড ও মার্কেটিং বিভাগের সিনিয়র ম্যানেজার আশিক আহমেদ বলেন, ‘রেডি ফ্ল্যাট আর নির্মাণাধীন প্রকল্পের সবচেয়ে বড় পার্থক্য হলো একটিতে আপনি তৈরি একটি পণ্য দেখছেন, অন্যটিতে কিনছেন ভবিষ্যতের একটি প্রতিশ্রুতি। রেডি ফ্ল্যাটের ক্ষেত্রে ঘরের মাপ, আলো-বাতাস, ফিনিশিং, লিফট, পার্কিং, কমন স্পেস এমনকি পাশের ফ্ল্যাটে কারা থাকছেন, সেটিও অনেকটা দেখে-বুঝে সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়।’
নকশা, স্পেসিফিকেশন, ডেভেলপারের আগের কাজের অভিজ্ঞতা এবং চুক্তির শর্তের ওপর ভরসা করে নির্মাণাধীন প্রকল্পে সিদ্ধান্ত নিতে হয় উল্লেখ করে আশিক আহমেদ বলেন, ‘নির্মাণাধীন প্রকল্পের একটি বড় সুবিধা হলো নিজের পছন্দ অনুযায়ী ইউনিট বেছে নেওয়ার সুযোগ তুলনামূলক বেশি থাকে। প্রকল্পের শুরুর দিকে গেলে ফ্লোর, দিক, ভিউ কিংবা কর্নার ইউনিট—সব ক্ষেত্রেই বিকল্প বেশি পাওয়া যায়। রেডি প্রকল্পে অনেক সময় পছন্দের ইউনিটগুলো আগেই বিক্রি হয়ে যায়।’
তাই রেডি ফ্ল্যাট নাকি নির্মাণাধীন প্রকল্প—এর একক কোনো উত্তর নেই। সিদ্ধান্তটি নির্ভর করে ক্রেতার হাতে থাকা অর্থ, নিয়মিত আয়, অপেক্ষা করার সক্ষমতা এবং ফ্ল্যাটটি কেনার উদ্দেশ্যের ওপর। তাই নিজের সামর্থ্য ও প্রয়োজনের সঙ্গে কোনটি বেশি মানানসই, সেটিই ঠিক করা জরুরি। এ ক্ষেত্রে অনলাইন আবাসন মেলা ক্রেতাদের জন্য তুলনা করার একটি সুযোগ তৈরি করতে পারে।
একই জায়গায় বিভিন্ন আবাসন প্রতিষ্ঠানের প্রকল্প সম্পর্কে জানার পাশাপাশি রেডি ও নির্মাণাধীন ফ্ল্যাটের দাম, অবস্থান, কিস্তির সুযোগ ও সুযোগ-সুবিধা সম্পর্কে সরাসরি কথা বলার সুযোগ থাকে। ফলে নিজের বাজেট ও প্রয়োজন অনুযায়ী কোন ধরনের ফ্ল্যাট উপযোগী হতে পারে, সে বিষয়ে ধারণা নেওয়া সহজ হয়।