ইপিএর জন্য দরকার শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান

জাপানের সঙ্গে করা অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তির ওপর এ সেমিনার আয়োজন করে গবেষণা সংস্থা সিপিডি। সহযোগিতায় ছিল জাপান দূতাবাস।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) আয়োজিত ‘বাংলাদেশ–জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তির (ইপিএ) সুযোগ সর্বোচ্চ কাজে লাগানো’ শীর্ষক সেমিনারের প্যানেল আলোচনায় উপস্থিত অতিথিরা। আজ সোমবার রাজধানীর বারিধারায় জাপানি দূতাবাসেছবি: সিপিডি

স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণ–পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় জাপানের সঙ্গে করা অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) সহায়ক হবে। কিন্তু ইপিএ বাস্তবায়নে যথাযথ কর্মপন্থা নিতে হবে এবং শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান তৈরি করতে হবে।

গতকাল সোমবার রাজধানীর বারিধারায় জাপান দূতাবাসে আয়োজিত ‘বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তির (ইপিএ) সুযোগ সর্বোচ্চ কাজে লাগানো’ শীর্ষক এক সেমিনারে এ কথা বলেন বক্তারা। জাপান দূতাবাসের সহযোগিতায় এ সেমিনার আয়োজন করে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুনের সভাপতিত্বে সেমিনারে বিশেষ অতিথি ছিলেন জাপানের রাষ্ট্রদূত সাইদা শিনিচি।

গত ৬ ফেব্রুয়ারি জাপানের সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি সই করেছে বাংলাদেশ। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো কোনো দেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি সই করেছে। এই প্রসঙ্গ টেনে অনুষ্ঠানে জাপানের রাষ্ট্রদূত সাইদা শিনিচি বলেন, জাপানের পক্ষ থেকে কোনো স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) সঙ্গে এটি প্রথম ইপিএ। এই চুক্তি বাংলাদেশের মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার পথে একটি বড় পদক্ষেপ। তবে ইপিএ কেবল শুল্ক কমানোর বিষয় নয়। এর মধ্যে শুল্কপদ্ধতি, বাণিজ্য-সম্পর্কিত বিভিন্ন নিয়মকানুন এবং সেবা খাতের বিধানসহ বিস্তৃত নীতিমালা ও শৃঙ্খলা অন্তর্ভুক্ত থাকে। ফলে পূর্ণ সুফল পেতে ইপিএর কার্যকর বাস্তবায়ন অত্যন্ত জরুরি।

বাংলাদেশ ক্রমেই জাপানি কোম্পানিগুলোর জন্য আকর্ষণীয় বিনিয়োগ গন্তব্যে পরিণত হচ্ছে জানিয়ে রাষ্ট্রদূত সাইদা শিনিচি আরও বলেন, বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত জাপানি প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) খুব কম। তবে ইপিএ এফডিআই বাড়াতে অনুঘটক হিসেবে কাজ করবে। এ ছাড়া দেশে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরির ক্ষেত্রে নতুন সরকারের ইতিবাচক বার্তা জাপানি বিনিয়োগকারীদের উৎসাহিত করছে বলে জানান তিনি।

বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত জাপানি প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) খুব কম। তবে ইপিএ এফডিআই বাড়াতে অনুঘটক হিসেবে কাজ করবে।
সাইদা শিনিচি, রাষ্ট্রদূত, জাপান দূতাবাস

রপ্তানিবিরোধী মনোভাবে সমস্যা

অনুষ্ঠানে আলাদা আলাদা চারটি প্রবন্ধ উপস্থাপন করা হয়। এর মধ্যে একটি প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, এলডিসি থেকে উত্তরণের পর উন্নত দেশগুলোর বাজারে বিশেষ বাণিজ্যসুবিধা হারাবে বাংলাদেশ। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ-জাপান ইপিএ চুক্তি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এ চুক্তি দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা টেকসইভাবে বজায় রাখতে সহায়তা করতে পারে। তবে ইপিএর সাফল্য নির্ভর করবে বাংলাদেশ কতটা দ্রুত প্রয়োজনীয় সংস্কার বাস্তবায়ন, প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানো এবং বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নত করতে পারে তার ওপর।

‘রপ্তানিবিরোধী মনোভাবকে’ আমদানি-রপ্তানি নীতির একটি বড় সমস্যা বলে মন্তব্য করেন পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য মনজুর হোসেন। তিনি বলেন, অনেক ক্ষেত্রে দেশীয় বাজারে পণ্য বিক্রি করা রপ্তানির চেয়ে বেশি লাভজনক। এ ছাড়া এলডিসি উত্তরণের পর রপ্তানি প্রণোদনা চালিয়ে যাওয়া কঠিন হবে। ফলে রপ্তানিতে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে নতুন নীতি প্রয়োজন।

জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশনের (জেট্রো) কান্ট্রি রিপ্রেজেনটেটিভ কাজুইকি কাতাওকা জানান, জাপান থেকে আরও বিনিয়োগ আনার জন্য ব্যবসার পরিবেশের উন্নতি করতে হবে। ইপিএতে শুধু শুল্ক–সংক্রান্ত ধারা নয়, বরং মেধাস্বত্বের মতো বিভিন্ন নিয়মও রয়েছে। ইপিএ কার্যকরের পর এই ধরনের নিয়ম প্রণয়ন বিনিয়োগ আকর্ষণে সহায়ক হতে পারে। তবে জাপানি বিনিয়োগকারীরা ভিসা, মুনাফা স্থানান্তর, শুল্কসহ বিভিন্ন সমস্যার মুখে পড়েন।

সঠিক বেঞ্চমার্ক দেশ নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ

অনুষ্ঠানের প্রথম পর্বে ‘বাংলাদেশে উন্নয়ন ও শিল্পনীতির পুনর্বিবেচনা’ বিষয়ে প্যানেল আলোচনায় লেদারগুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (এলএফএমইএবি) সভাপতি সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর বলেন, দেশে ইতিমধ্যেই অনেক নীতি হয়েছে; অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণও রয়েছে। আর নতুন নীতির দরকার নেই। বরং অর্থনৈতিক নীতির ক্ষেত্রে বিভিন্ন খাতের জন্য সঠিক বেঞ্চমার্ক দেশ নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো দেশকে ঢালাও অনুসরণ ঠিক নয়।

এ প্রসঙ্গে জাপানের ন্যাশনাল গ্র্যাজুয়েট ইনস্টিটিউট ফর পলিসি স্টাডিজের ইমেরিটাস অধ্যাপক কেনিচি ওহনো বলেন, ‘আপনাকে বিভিন্ন দেশ থেকে শিখতে হবে। এমনকি যদি আপনার একটি বেঞ্চমার্ক দেশও থাকে, তবু বিদেশি মডেলগুলো সরাসরি কপি-পেস্ট করবেন না। কারণ, সব দেশই ভিন্ন। সেগুলো আপনার দেশের বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হবে।’

অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় পর্বে প্যানেল আলোচনায় বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান পলিসি এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, বর্তমান ইপিএতে জুতা ও চামড়াপণ্য অন্তর্ভুক্ত নেই। অথচ এটি দেশের দ্বিতীয় বা তৃতীয় বৃহত্তম রপ্তানি খাত। জাপান ৬৬ শতাংশ জুতা চীনের কাছ থেকে নেয়। তাই বাংলাদেশকে এই পণ্যগুলো অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ তৈরি করতে হবে। অর্থাৎ ইপিএর সুফল অর্জন করাটাই প্রকৃত চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশের সক্ষমতা জাপানের মতো নয়। এ জন্য ইপিএ বাস্তবায়ন পরিকল্পনা নিতে হবে।

নিট পোশাকমালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সাবেক সভাপতি মো. ফজলুল হক বলেন, ‘জাপানের সঙ্গে ইপিএ আমাদের সামনে বিশাল সুযোগ এনে দিয়েছে। সেই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে পরিকল্পিত ও ধারাবাহিক উদ্যোগ নিতে হবে।’