রাজকীয় আভিজাত্য থেকে আইসক্রিমের বিশ্ব দিবস

ছবি: এআই/ প্রথম আলো

তীব্র গরমে এক স্কুপ ঠান্ডা আইসক্রিম যেন মুহূর্তেই শরীরে প্রশান্তি এনে দেয়। ছোট থেকে বড়—সবার কাছেই আইসক্রিম এক প্রিয় নাম। তবে আজকের এই সহজলভ্য ও মজাদার আইসক্রিমের পেছনে লুকিয়ে আছে হাজার বছরের এক রোমাঞ্চকর ইতিহাস। রাজপ্রাসাদের অন্দরমহল থেকে শুরু করে আধুনিক যুগের বাণিজ্যিক রূপ লাভ করার এই পথচলা সত্যিই বিস্ময়কর।

প্রাচীন ইতিহাস: রাজাদের বিলাসী খাবার

আইসক্রিমের আদি রূপটি কিন্তু আজকের মতো দুধ ও ক্রিমের মিশ্রণ ছিল না। ইতিহাসবিদদের মতে, খ্রিষ্টপূর্ব দ্বিতীয় শতকে প্রাচীন চীনে বরফের সঙ্গে দুধ ও কর্পূর মিশিয়ে একধরনের ডেজার্ট তৈরি করা হতো। অন্যদিকে রোমান সম্রাট নিরোর রাজত্বকালে পাহাড় থেকে বরফ এনে তাতে ফলের রস, মধু ও বাদাম মিশিয়ে পরিবেশন করার প্রচলন ছিল। ত্রয়োদশ শতাব্দীতে বিখ্যাত পর্যটক মার্কো পোলো চীন থেকে এই রেসিপি ইতালিতে নিয়ে আসেন, যা পরে ফ্রান্সসহ পুরো ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে। সে সময় আইসক্রিম ছিল কেবল রাজপরিবার ও অভিজাতদের খাবার। সাধারণ মানুষের কাছে এটি ছিল রীতিমতো অধরা এক স্বপ্ন।

যন্ত্রের আবিষ্কার ও বাণিজ্যিক উৎপাদন

উনিশ শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত আইসক্রিম তৈরি করা ছিল অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ ও কষ্টসাধ্য ব্যাপার। ১৮৪৬ সালে মার্কিন নারী ন্যান্সি জনসন হাতল ঘোরানো ‘আইসক্রিম মেকার’ বা ফ্রিজার আবিষ্কার করলে আইসক্রিম তৈরির পদ্ধতি সহজ হতে শুরু করে। এরপর ১৮৫১ সালে জ্যাকব ফুসেল বাল্টিমোর শহরে বিশ্বের প্রথম বাণিজ্যিক আইসক্রিম কারখানা স্থাপন করেন। রেফ্রিজারেশন ও আধুনিক কোল্ড স্টোরেজ প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে আইসক্রিম সাধারণ মানুষের নাগালে চলে আসে এবং বিংশ শতাব্দীতে এসে বিশ্বজুড়ে এর ব্যাপক জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পায়।

বিশ্ব আইসক্রিম দিবস

আইসক্রিমের এই বিশ্বজোড়া জনপ্রিয়তাকে উদ্‌যাপন করতেই চালু হয় ‘বিশ্ব আইসক্রিম দিবস’। ১৯৮৪ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যান আনুষ্ঠানিকভাবে জুলাই মাসকে ‘ন্যাশনাল আইসক্রিম মান্থ’ এবং জুলাই মাসের তৃতীয় রোববারকে ‘জাতীয় আইসক্রিম দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করেন। পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের গণ্ডি পেরিয়ে এটি বিশ্ব আইসক্রিম দিবস হিসেবে বিশ্বজুড়ে সমাদৃত হয়। দিনটির মূল তাৎপর্য হলো পরিবার, বন্ধু ও প্রিয়জনদের সঙ্গে মিলে আইসক্রিমের স্বাদ উপভোগ করা এবং এই শিল্পের সঙ্গে জড়িতদের সম্মান জানানো।

বাংলাদেশে আইসক্রিম ব্যবসা

বাংলাদেশে আইসক্রিমের ইতিহাস শুরু হয় মূলত দেশি প্রযুক্তিতে তৈরি কুলফি, মালাই বরফ ও আইসপপের (কাঠির বরফ) হাত ধরে। টিনের বাক্সে বা ভ্যানে করে ঘণ্টার শব্দ বাজিয়ে পাড়ায় পাড়ায় আইসক্রিম বিক্রির দৃশ্য এ দেশের মানুষের এক নস্টালজিক স্মৃতি। তবে ১৯৬০-এর দশকে ‘ইগলু’র মাধ্যমে দেশে প্রথম বাণিজ্যিকভাবে আইসক্রিম উৎপাদন শুরু হয়। স্বাধীনতার পর ১৯৮৭ সালে ‘পোলার’ বাজারে এলে আইসক্রিম শিল্পে এক নতুন প্রতিযোগিতার সৃষ্টি হয়।

নব্বইয়ের দশক থেকে আইসক্রিমের মান ও স্বাদে ব্যাপক পরিবর্তন আসতে থাকে। বর্তমানে দেশের আইসক্রিম বাজার অত্যন্ত সম্ভাবনাময় ও প্রতিযোগিতাপূর্ণ। রাজাদের বিলাসী পানীয় থেকে শুরু করে আজকের এই বিশাল শিল্প—আইসক্রিমের বিবর্তন এক চমৎকার রূপকথা। আর বিশ্ব আইসক্রিম দিবস যেন সেই রূপকথারই এক মিষ্টি উদ্‌যাপন।