মান ও বৈচিত্র্য জয় করেছে আইসক্রিমের দেশি ব্র্যান্ড
দেশের বাজারে একসময় নামীদামি বিদেশি ব্র্যান্ডের উন্নত মানের আইসক্রিম ও গ্রামবাংলার সাধারণ মানের কুলফি মালাই জনপ্রিয় ছিল। বিদেশি ব্র্যান্ডগুলো যেমন সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে ছিল, তেমনি দেশি কুলফি মালাইয়ে ছিল স্বাস্থ্যঝুঁকি। এমনকি সীমান্ত–সংলগ্ন এলাকাগুলোতে প্রতিবেশী দেশের ব্র্যান্ডের একচেটিয়া আধিপত্য ছিল। এসব বিদেশি ব্র্যান্ডের চাপে দেশি আইসক্রিম শিল্প ছিল অনেকটা কোণঠাসা। গত এক দশকে দৃশ্যপট সম্পূর্ণ বদলে গেছে। প্রযুক্তির কল্যাণে গুণগত মান উন্নয়ন, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি ও বিপণন কৌশলের কারণে দেশি প্রতিষ্ঠান এগিয়ে গেছে। বর্তমানে দেশের আইসক্রিম বাজারের ৯৫ শতাংশের বেশি নিয়ন্ত্রণ করছে দেশি ব্র্যান্ডগুলো।
দেশি কোম্পানিগুলোর এই বিপুল সাফল্যের কারণ হলো বিশ্বমানের উৎপাদন ব্যবস্থা, নিরবচ্ছিন্ন কোল্ড চেইন ব্যবস্থাপনা এবং ক্রেতাদের স্বাদ ও চাহিদার সঠিক মূল্যায়ন। সেভয়, ইগলু, পোলার, লাভেলো ও বেলিসিমোর মতো ব্র্যান্ডগুলো দেশে আন্তর্জাতিক মানের আইসক্রিম তৈরি করে এখন প্রতিযোগিতা সক্ষমতার প্রমাণ দিচ্ছে। সাশ্রয়ী মূল্যের পাশাপাশি প্রিমিয়াম মানের নিশ্চয়তা দিয়ে দেশের মানুষের পছন্দের শীর্ষে পৌঁছে গেছে। শহর থেকে প্রত্যন্ত গ্রাম—সব জায়গায় দেশি ব্র্যান্ডের রিটেইল ফ্রিজার পৌঁছে গেছে, যা একসময় কল্পনাতীত ছিল।
আধুনিক প্রযুক্তি ও শিল্পের সমন্বয় ঘটিয়ে সেভয় আইসক্রিম অ্যান্ড ফ্যাক্টরি লিমিটেডের প্রিমিয়াম ব্র্যান্ড ‘সেভয়’–এর অভাবনীয় অগ্রগতি হয়েছে। সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় প্রক্রিয়ায় উৎপাদিত সেভয়ের আইসক্রিমে উচ্চ মানের মিল্ক সলিড, প্রাকৃতিক ফলের পাল্প এবং রিচ ইনক্লুশন ব্যবহার করা হয়। কারখানার স্বয়ংক্রিয় মিক্সিং থেকে রিটেইল ফ্রিজার পর্যন্ত সেভয় সাব-জিরো কোল্ড চেইন কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করে। ফলে আইসক্রিমের মাইক্রো-ক্রিস্টাল মসৃণতা গ্রাহকের হাতে পৌঁছানো পর্যন্ত অটুট থাকে। তরুণদের মধ্যে সেভয়ের ‘ডিসকোন’ ও ‘আইকোন’ সিরিজের আইসক্রিম দারুণ জনপ্রিয়। বিশেষ করে ১১০ মিলির ‘কফি উইথ চকলেট ফাজ’ এবং ‘ভ্যানিলা চকো ব্রাউনি’ ডিসকোন ডার্ক চকলেট ডিস্ক ও ক্রাঞ্চি হানিকম্বের কারণে অনন্য। বিভিন্ন উৎসব ও অনুষ্ঠান উদ্যাপনে তাদের ১ লিটারের ‘রেড ভেলভেট টেম্পটেশন’, ‘গোল্ডেন ডিলাইট’ ও ‘ডার্ক ডিজায়ার’ আইসক্রিম কেক প্রিমিয়াম ডেজার্টের চাহিদা মেটাচ্ছে।
কিছুদিন আগেও আইসক্রিম মানেই ছিল ভ্যানিলা, চকলেট বা স্ট্রবেরি। দেশি ব্র্যান্ডগুলো এই বৃত্ত থেকে বেরিয়ে এসে ফ্লেবারে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে। এখন আইসক্রিমে দেশি ঐতিহ্যের ছোঁয়া স্পষ্ট। নলেন গুড়, ক্ষীর মালাই, শাহি খেজুর মালাই, দই এবং জলপাইয়ের মতো ফ্লেভার ভোক্তাদের শিকড়ের স্বাদ দিচ্ছে। সেভয়ের শাহি ক্ষীর, মাওয়া কুলফি, দই এবং টক-মিষ্টি ‘জলপাই’ কাপ আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। একইভাবে লাভেলোর ‘শাহি খেজুর মালাই’, ইগলুর ‘দুধ মালাই’ বা কোয়ালিটির ‘নলেন গুড়’ কাপ এর উৎকৃষ্ট উদাহরণ। পাশাপাশি বাটারস্কচ উইথ ক্যাশিউ ক্র্যাকেলস, ক্যারামেল চকো ক্রাঞ্চ, ব্ল্যাক ফরেস্ট কাপ এবং সুন্দাই সিরিজের ফিউশন আইসক্রিমও বিপুল জনপ্রিয়তা পেয়েছে।
অন্যান্য ব্র্যান্ডের মাঝে ইগলুর ইগো বার, মাচো, দুধ মালাই এবং কর্নেলি ও ১ থেকে ৫ লিটারের প্যাক রয়েছে। লাভেলো তাদের ইকো-ফ্রেন্ডলি কারখানায় উৎপাদিত পণ্য বাজারজাত করছে। বেলিসিমো ১০ শতাংশ মিল্ক ফ্যাট ব্যবহার করে প্রিমিয়াম ক্যাটাগরিতে নিজেদের অবস্থান টিকিয়ে রেখেছে। এ ছাড়া পোলার, ব্লুপ, জা এন জি ও কোয়ালিটি সাশ্রয়ী মূল্যে দারুণ ফ্লেভার দিচ্ছে; সরকারি প্রতিষ্ঠান মিল্ক ভিটাও এই শিল্পে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।
আধুনিক ও তরুণমুখী বিপণন
দেশি আইসক্রিম শিল্পে বিপণন কৌশল এখন অনেক বেশি আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর ও উদ্ভাবনী। তরুণ প্রজন্মকে আকৃষ্ট করতে প্রচারে নানা পদক্ষেপ নিচ্ছে কোম্পানিগুলো। তবে প্রচার কৌশল অনেকটা নির্ভর করছে উৎসবের ওপর। ঈদ–পূজা–পার্বণ, পয়লা বৈশাখ ও ভ্যালেন্টাইনস ডের মতো উৎসবগুলোতে কোম্পানিগুলো বিশেষ ক্যাম্পেইন করছে। আনন্দ ভাগাভাগি করার আবেগঘন বার্তা দিয়ে তৈরি বিজ্ঞাপন খুব সহজেই ক্রেতাদের মন ছুঁয়ে যাচ্ছে।
বর্তমানে আইসক্রিম শুধু বিলাসী ডেজার্ট নয়, এটি দেশের প্রক্রিয়াজাত খাদ্যের সম্ভাবনাময় শিল্প। এটি দেশে নয়, বিদেশেও নিজস্ব স্বাদের আইসক্রিমের এক বিশাল সম্ভাব্য বাজার হতে পারে। এ সম্ভাবনাকে বাস্তবায়নে সরকারের নীতিগত সহায়তা প্রয়োজন। উচ্চমানের আইসক্রিম তৈরির জন্য কিছু প্রিমিয়াম কাঁচামাল বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। এসব কাঁচামাল আমদানিতে শুল্কছাড়, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং রপ্তানি প্রণোদনা প্রদান করা হলে খাতটি বড় অবদান রাখতে পারবে।
কোল্ড চেইন লজিস্টিকস ও সাপ্লাই চেইন
ব্যবস্থাপনায় করপোরেট ভিশনকে আরও সুদূরপ্রসারী হতে হবে। বিদেশি ব্র্যান্ড টপকে দেশি শিল্পের এই একচেটিয়া বাজার গ্রহণযোগ্যতা প্রমাণ করে যে সঠিক দিকনির্দেশনা ও গুণগত মান বজায় রেখে ব্যবসার পরিচালন ব্যয় কমাতে পারলে এ শিল্পের আরও সমৃদ্ধি হবে। সরকারের নীতিসহায়তা পেলে এ খাতে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়বে।