বন্যা-ভূমিকম্পের ঝুঁকি: ভবন নির্মাণে কতটা প্রস্তুত বাংলাদেশ

নিরাপদ আবাসন মানে শুধু শক্ত ভবন নয়, বরং সেখানে বসবাসকারী মানুষের জীবন রক্ষার জন্য আগাম প্রস্তুতিও বটে। তবে আবাসন বাছাইয়ের আগে নিরাপত্তা, নির্মাণমান ও ভবিষ্যৎ ঝুঁকি সম্পর্কে জানা জরুরিছবি: এআই/ফ্রিপিক

নেপালে সম্প্রতি আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে হাজারো ঘরবাড়ি, সড়কসহ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো। এ ধরনের দুর্যোগ আবারও সামনে এনেছে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি বিবেচনায় বাংলাদেশের ভবন ও নগর অবকাঠামো কতটা প্রস্তুত?

গত বছর নভেম্বরে নরসিংদীর কাছে ৫ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্পের পর এ বছর ফেব্রুয়ারিতেও একাধিক ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথম ২৭ দিনে ১২টি ভূমিকম্প রেকর্ডের তথ্য দিয়েছে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর। ফলে দেশের ভবনগুলোর ভূমিকম্পসহনশীলতা ও দুর্যোগের সময় নিরাপদে বের হওয়ার ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

দ্রুত নগরায়ণের সঙ্গে বাংলাদেশে বাড়ছে বহুতল ভবন ও আবাসিক প্রকল্প। এসব ভবন নির্মাণে জমির অবস্থান, নকশা ও নির্মাণসামগ্রীর মানের পাশাপাশি মাটির ধরন, দুর্যোগের ঝুঁকি, কাঠামোগত সক্ষমতা এবং জাতীয় বিল্ডিং কোড মেনে ভবনগুলো গড়ে উঠছে কি না—বিষয়গুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

নির্মাণের শুরু থেকেই নিরাপত্তা

জেসিএক্স ডেভেলপমেন্টস লিমিটেডের প্রধান স্থপতি মো. আবুল কালাম আজাদ প্রথম আলোকে বলেন, ভূমিকম্পের ঝুঁকি বিবেচনায় একটি ভবনের নিরাপত্তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সঠিক স্ট্রাকচারাল ডিজাইন। আর এর অন্যতম প্রধান ভিত্তি হলো ফাউন্ডেশন। কাঠামোগত নকশার শুরুতেই যথাযথ জিওটেকনিক্যাল ইনভেস্টিগেশন বা সয়েল টেস্ট করে মাটির বৈশিষ্ট্য ও বিয়ারিং ক্যাপাসিটি নির্ধারণ করা হয়। তাঁর মতে, এরপর ভবনের ফ্লোর এরিয়া, উচ্চতা ও ব্যবহার অনুযায়ী স্ট্রাকচারাল লোড বা গ্র্যাভিটি লোড হিসাবের পাশাপাশি উইন্ড প্রেশার ও ভূমিকম্পের মতো বিভিন্ন ল্যাটারাল লোড বিবেচনা করা হয়। এসব তথ্যের ভিত্তিতে উপযুক্ত স্ট্রাকচারাল সিস্টেম নির্বাচন ও ডিজাইন এবং মাটির ধারণক্ষমতা অনুযায়ী ফাউন্ডেশন ডিজাইন সম্পন্ন করা উচিত।

একই সঙ্গে জাতীয় বিল্ডিং কোড অনুসরণ করার অপরিহার্যতার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। অনুমোদিত নকশার বাইরে ভবনের তলা বা আয়তন বাড়ানো, কাঠামোগত পরিবর্তন করা কিংবা নির্মাণসামগ্রীর মানে ছাড় দেওয়া ভবনের নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে। তাই শুধু নকশা প্রণয়ন নয়, নির্মাণকাজের প্রতিটি ধাপে প্রকৌশলগত তদারকি প্রয়োজন।

দুর্যোগের সময় নির্গমনব্যবস্থা

ভবন শক্তিশালী হলেই নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না। ভূমিকম্প, অগ্নিকাণ্ড বা অন্য কোনো জরুরি পরিস্থিতিতে মানুষ কীভাবে ভবন থেকে বের হবেন, সেটিও নির্মাণ পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পর্যাপ্ত ও নিরাপদ সিঁড়ি, জরুরি নির্গমনপথ, বাধামুক্ত চলাচলের জায়গা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে ব্যবহারযোগ্য প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ থাকা প্রয়োজন।

বহুতল ভবনে জরুরি সময়ে বের হওয়ার জন্য লিফটকে নিরাপদ মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। তাই নিরাপদ সিঁড়ি ও বিকল্প নির্গমনব্যবস্থা থাকা জরুরি। একই সঙ্গে ভবনে বসবাসকারীদের এসব পথ সম্পর্কে জানানো এবং নিয়মিতভাবে জরুরি পরিস্থিতির প্রস্তুতি নেওয়াও প্রয়োজন।

বন্যার ঝুঁকিও বিবেচনায়

বাংলাদেশের অনেক এলাকা বন্যা ও জলাবদ্ধতার ঝুঁকিতে রয়েছে। এসব এলাকায় ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে শুধু কাঠামো নয়, ভবনের ভিত্তির উচ্চতা, পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা এবং বৈদ্যুতিক সংযোগের নিরাপত্তার বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া দরকার। ভবনের চারপাশে পানি জমে থাকলে তা দীর্ঘমেয়াদে ভবনের কাঠামো ও ব্যবহারকারীদের জন্য সমস্যা তৈরি করতে পারে।

এ ক্ষেত্রে একটি ভবনকে উঁচু করে নির্মাণের পাশাপাশি আশপাশের সড়ক, ড্রেনেজ ও পানি নিষ্কাশনব্যবস্থার সঙ্গেও পরিকল্পনার সামঞ্জস্য থাকা প্রয়োজন। কারণ দুর্যোগের সময় শুধু ভবন নিরাপদ থাকলেই হবে না, জরুরি সেবা ও উদ্ধারকারী দল যেন সেখানে পৌঁছাতে পারে, সেই ব্যবস্থাও রাখতে হবে।

নেপালসহ বিভিন্ন দেশের সাম্প্রতিক দুর্যোগের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষতি শুধু একটি ভবনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। সড়ক, বিদ্যুৎ, যোগাযোগব্যবস্থা ও অন্যান্য অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হলে উদ্ধারকাজও কঠিন হয়ে পড়ে। তাই আবাসন পরিকল্পনায় ভবনের পাশাপাশি আশপাশের অবকাঠামো ও জরুরি সেবার বিষয়টিকেও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

একজন গ্রাহকের শুধু অ্যাপার্টমেন্টের ফ্লোর প্ল্যান, পারস্পেকটিভ ভিউ বা ভবনের ফিনিশিং দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয় উল্লেখ করে স্থপতি মো. আবুল কালাম আজাদ বলেন, কোনো প্রকল্প কেনার আগে কর্তৃপক্ষ কর্তৃক অনুমোদিত স্থাপত্য নকশা, কাঠামোগত নকশা, এমইপি (মেকানিক্যাল, ইলেকট্রিক্যাল ও প্লাম্বিং) এবং অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা সম্পর্কে জানা গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি ডেভেলপার নির্বাচনের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটির আগের প্রকল্প বাস্তবায়নের অভিজ্ঞতা, নির্মাণের মান এবং নির্ধারিত সময়ে প্রকল্প হস্তান্তরের রেকর্ডও বিবেচনা করা প্রয়োজন।

মো. আবুল কালাম আজাদ আরও বলেন, বিশেষ করে নির্মাণের মান, কংক্রিটের শক্তিমাত্রা, রডের স্পেসিফিকেশন, ফিনিশিংয়ের গুণগত মান এবং সঠিক তদারকি প্রক্রিয়া সম্পর্কে ডেভেলপার কতটা স্বচ্ছ, সেটিও যাচাই করা উচিত। একটি ভবনের নিরাপত্তা, নান্দনিকতা ও স্থায়িত্বের জন্য নকশা, কর্তৃপক্ষের অনুমোদন এবং সঠিকভাবে নির্মাণকাজ সম্পন্ন করা—তিনটি বিষয়ই সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এই ধাপগুলো যথাযথ ও মানসম্মতভাবে সম্পন্ন হলে একটি ভবন শুধু দৃষ্টিনন্দনই নয়, বরং আরও নিরাপদ, টেকসই ও নির্ভরযোগ্য হয়ে ওঠে।

নিরাপদ আবাসন মানে শুধু শক্ত ভবন নয়, বরং সেখানে বসবাসকারী মানুষের জীবন রক্ষার জন্য আগাম প্রস্তুতিও বটে। তবে আবাসন বাছাইয়ের আগে নিরাপত্তা, নির্মাণমান ও ভবিষ্যৎ ঝুঁকি সম্পর্কে জানা জরুরি। এসব বিষয়ে বিভিন্ন প্রকল্প ও সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে সরাসরি তথ্য জানতে ভিজিট করতে পারেন অনলাইন আবাসন মেলা।