মেলায় কারাপণ্যের স্টলে তিন শতাধিক পণ্য বিক্রি হচ্ছে। এর মধ্যে বাঁশ, বেত, কাঠ, পাট, চামড়া ও পুঁতির তৈরি পণ্য, তৈরি পোশাক ও শুকনা খাবার আছে। বেত ও বাঁশের তৈরি পণ্যের মধ্যে মোড়া, চেয়ার, দোলনা, ফলের ডালা, ঢাকনা, কুলা, কাঠের চেয়ার, ড্রেসিং টেবিল, বুকশেলফ ইত্যাদিও বিক্রি হচ্ছে। এসব পণ্যের দাম ২০০ থেকে ১১ হাজার টাকা পর্যন্ত।

অন্যদিকে বিভিন্ন ধরনের শোপিস, পুঁতির ব্যাগ, টিস্যু বক্স, শলার ঝাড়ু পাওয়া যাচ্ছে কারাপণ্যের স্টলে। পোশাকের মধ্যে জামদানি শাড়ি, নকশি কাঁথা, থ্রি–পিস, কটি, গেঞ্জি, লুঙ্গি, গামছা ইত্যাদি পাওয়া যায় সেখানে। এ ছাড়া বিস্কুট, ড্রাই কেকসহ বিভিন্ন ধরনের শুকনা খাবারও বিক্রি হয়।

স্টলে দায়িত্ব পালন করা ডেপুটি জেলার জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, সারা দেশের প্রায় ৩৬টি কারাগার থেকে সশ্রম দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের তৈরি এসব পণ্য মেলায় আনা হয়েছে।

কারাগারগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো কেরানীগঞ্জের ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার, কাশিমপুর ১, ২ ও ৩ কারাগার, ময়মনসিংহ, রাজশাহী, নাটোর, রংপুর, দিনাজপুর, যশোর, কুষ্টিয়া, কুমিল্লা, সিলেট, ফরিদপুর, বরিশাল ইত্যাদি।

এ ছাড়া প্রায় প্রতিটি কারাগারের সামনেই বিক্রয় ও প্রদর্শনী কেন্দ্র আছে। সেখান থেকে যে কেউ চাইলে পণ্য কিনতে পারবেন বলে জানান কারা কর্মকর্তারা।

লভ্যাংশের অর্থ পান কয়েদিরা

ডেপুটি জেলার মো. জাকির হোসেন জানান, এসব পণ্য বিক্রি থেকে যে লভ্যাংশ পাওয়া যায়, তার ৫০ শতাংশ কয়েদিদের দেওয়া হয়। এসব অর্থ তাঁরা নিজেদের জন্য খরচ করতে কিংবা পরিবারকে দিতে পারেন। বাকি ৫০ শতাংশ সরকারি কোষাগারে জমা হয়। এবারের মেলায় ইতিমধ্যে প্রায় ২০ লাখ টাকার পণ্য বিক্রি হয়েছে এ স্টল থেকে।

জাকির হোসেন বলেন, কয়েদি দের মাধ্যমে পণ্য তৈরির এই প্রকল্পের মাধ্যমে সাজাপ্রাপ্ত বন্দীদের সমাজের মূল ধারায় ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া সহজ হয়। ফলে কাজ জানা কেউ মুক্তি পেলে তিনি আত্মনির্ভরশীলভাবে চলতে পারেন।

পণ্যে আছে স্থানিক বৈচিত্র্য

কিশোরগঞ্জের ভৈরব ও ঢাকার কেরানীগঞ্জ এলাকা দেশে চামড়ার জুতা তৈরির জন্য বিখ্যাত। কেরানীগঞ্জে অবস্থিত ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার ও কিশোরগঞ্জ জেলা কারাগারের কয়েদিরাও চামড়ার জুতা বানান।

নারায়ণগঞ্জ, কেরানীগঞ্জ ও গাজীপুরের কারাগারগুলোয় কয়েদিদের জন্য আলাদা তৈরি পোশাকের কারখানা রয়েছে। সেখানে কয়েদিরা গেঞ্জি, কটিসহ বিভিন্ন পণ্য বানান। পাশাপাশি জামদানিও বানান এ দুটি কারাগারের কয়েদিরা।

এ ছাড়া কুষ্টিয়ার কারাগারে গামছা, লুঙ্গি, একতারা ও ডুগডুগি; রংপুরের কারাগারে শতরঞ্জি ও কার্পেট; কাশিমপুর, কুমিল্লা, রাজশাহী, যশোর, ফরিদপুরসহ বেশ কিছু কারাগারে নকশি কাঁথা এবং প্রায় অধিকাংশ কারাগারে বাঁশ ও বেতের বিভিন্ন পণ্য তৈরি হয়।

ডেপুটি জেলার মো. তানজিল হোসেন বলেন, ‘বন্দীদের হাত হবে কর্মীর হাত’ এবং ‘কারাগার হবে সংশোধনাগার’—এই দুই স্লোগান সামনে রেখে কয়েদিদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কর্মদক্ষ করা হচ্ছে।

তানজিল হোসেন জানান, ২০১৪ সাল থেকে এখন পর্যন্ত ৬৯ হাজার কয়েদিকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে ১৮ হাজারের বেশি কয়েদি বিভিন্ন ধরনের পণ্য তৈরি করছেন।

কয়েদিদের মধ্যে যাঁরা কাজ জানেন, তাঁরা অন্যদের প্রশিক্ষণ দেন। পাশাপাশি সমাজসেবা অধিদপ্তরও তাঁদের সহায়তা দেয়। কাঁচামাল সংগ্রহ থেকে যন্ত্রপাতির ব্যবস্থা করে দেয় কারা কর্তৃপক্ষ।

গত বুধবার ময়মনসিংহ কেন্দ্রীয় কারাগারের প্রধান কারারক্ষী হাবীবুর রহমান উপস্থিত ছিলেন কারাপণ্যের স্টলে। তিনি জানান, ময়মনসিংহ কারাগারে প্রায় ৩০০ বন্দী বিভিন্ন ধরনের পণ্য তৈরি করছেন। হাবীবুর রহমান বলেন, এ কাজের মাধ্যমে কয়েদিরা তাঁদের বন্দী অবস্থা ও পরিবার থেকে দূরে থাকার কষ্ট ভুলে থাকেন।

মেলায় কারাপণ্যের স্টল থেকে পণ্য কেনেন রাজধানীর খামারবাড়ি এলাকার বাসিন্দা নাসরিন সুলতানা। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, কয়েদিদের বানানো পণ্য সাধারণত ভালো হয়। কারণ, তাঁরা দীর্ঘ সময় ও মনোযোগ দিয়ে যত্নসহকারে এসব পণ্য বানান। পাশাপাশি এখান থেকে পণ্য কিনলে এর একটা লভ্যাংশ হিসেবে বন্দী কয়েদিরা পাবেন, সেটাও একটা ভালো লাগার বিষয়।