আমরা জমি, ফ্ল্যাট, স্থায়ী আমানত বা এফডিআর, সঞ্চয়পত্র, ইত্যাদির দলিল বা নথি যেভাবে সংরক্ষণ করি, অনেকে আয়কর রিটার্ন সেভাবে সংরক্ষণ করেন না। আয়কর রিটার্ন সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা কর ব্যবস্থাপনার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

আবার অনেকের পক্ষেই আয়কর অধ্যাদেশ, প্রজ্ঞাপন, অর্থ আইন, আয়কর পরিপত্র বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করা খুবই কঠিন। আয়কর আইন প্রতিবছর সংশোধন ও পরিমার্জন হয়। তবে ব্যক্তিশ্রেণির করদাতা, যাঁরা চাকরিজীবী বা ছোটখাটো ব্যবসা করেন, তাঁদের জন্য খুব একটা অসুবিধা হয় না। এ ক্ষেত্রে অবশ্যই একটু সচেতন হতে হবে।

এ বছর ৩০ জুনের আগে যাঁরা টিআইএন নিয়েছেন, তাঁদের আয়কর রিটার্ন জমা দিতে হবে। আবার এ বছর ব্যক্তিশ্রেণির করদাতার জন্য অনলাইনে আয়কর জমা দেওয়ার ব্যবস্থা চালু আছে। যাঁদের মোট পরিসম্পদ ৪০ লাখ টাকার নিচে, কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া তাঁরা এক পাতার ফরম পূরণ করে আয়কর রিটার্ন জমা দিতে পারবেন। 

এখনো পুরো নভেম্বর মাস বাকি। ৩০ নভেম্বরের মধ্যে যাঁরা আয়কর রিটার্ন জমা দিতে পারবেন না, তাঁরা জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) নির্ধারিত ফরমে সময় বাড়ানোর আবেদন করতে পারবেন। এ জন্য ২ শতাংশ হারে বিলম্ব সুদ আরোপ হবে। এ ক্ষেত্রে উপকর কমিশনার দুই মাস এবং পরবর্তী সময়ে যুগ্ম বা অতিরিক্ত কর কমিশনার আরও দুই মাস সময় মঞ্জুর করতে পারবেন। তবে অবশ্যই করদাতাকে এ বিলম্বের জন্য যুক্তিসংগত কারণ দেখাতে হবে। ব্যক্তিশ্রেণির করদাতার ক্ষেত্রে পুরুষ করদাতার বার্ষিক আয় ৩ লাখ টাকা, মহিলা অথবা ৬৫ বছরের বেশি পুরুষ করদাতার ক্ষেত্রে সাড়ে ৩ লাখ টাকা, প্রতিবন্ধী করদাতার ক্ষেত্রে সাড়ে ৪ লাখ টাকা, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধার বার্ষিক আয় ৪ লাখ ৭৫ হাজার টাকা করমুক্ত। আবার কোনো প্রতিবন্ধী ব্যক্তির পিতা–মাতা বা আইনানুগ অভিভাবকের করমুক্ত আয়সীমা ৫০ হাজার টাকা বেশি হবে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তির পিতা ও মাতা উভয়েই করদাতা হলে যেকোনো একজন এ সুবিধা পাবেন। 

আয় নির্ধারিত সীমার নিচে থাকলে করদাতাকে শুধু আয়কর রিটার্ন দিতে হবে, কোনো কর দিতে হবে না। বার্ষিক আয় নির্ধারিত করসীমা অতিক্রম করলেই শুধু আয়কর দিতে হবে। অর্থাৎ করসীমার ওপর ১ টাকার বেশি আয় থাকলেও তাঁকে ন্যূনতম আয়কর দিতে হবে।

ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন এলাকায় অবস্থিত করদাতার ন্যূনতম করের হার ৫ হাজার টাকা। অন্যান্য সিটি করপোরেশন এলাকায় অবস্থিত করদাতার ন্যূনতম করের হার ৪ হাজার টাকা। আর সিটি করপোরেশন ছাড়া অন্যান্য এলাকায় অবস্থিত করদাতার ন্যূনতম করের হার ৩ হাজার টাকা।

বিনিয়োগের সর্বোচ্চ সীমা হবে করযোগ্য মোট আয়ের (কর অব্যাহতিপ্রাপ্ত বা হ্রাসকৃত করহারের আয় ছাড়া) ২০% বা প্রকৃত বিনিয়োগ; অথবা এক কোটি টাকা—এই তিনটির মধ্যে যেটি কম। রেয়াতের পরিমাণ নির্ধারিত হবে মোট আয়ের ১৫% হারে। 

করদাতার মোট পরিসম্পদ যদি তিন কোটির বেশি বা একের অধিক মোটরগাড়ি বা ৮ হাজার বর্গফুটের অধিক আয়তনের গৃহসম্পত্তি থাকে, তাঁকে ১০ শতাংশ থেকে ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত সারচার্জ দিতে হবে। 

বর্তমানে আয়করের হার হচ্ছে: প্রথম ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত আয়ের ওপর শূন্য, তিন লাখ টাকার পরবর্তী ১ লাখ টাকা পর্যন্ত আয়ের ক্ষেত্রে মোট আয়ের ওপর ৫ শতাংশ, পরবর্তী ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত আয়ের ক্ষেত্রে মোট আয়ের ওপর ১০ শতাংশ, পরবর্তী ৪ লাখ টাকা পর্যন্ত আয়ের ক্ষেত্রে মোট আয়ের ওপর ১৫ শতাংশ, পরবর্তী ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত আয়ের ক্ষেত্রে মোট আয়ের ওপর ২০ শতাংশ এবং অবশিষ্ট মোট আয়ের ওপর ২৫ শতাংশ।

আয়কর বিষয়ে কয়েকটি টিপস

১. গত বছরের রিটার্নের ফটোকপি সঙ্গে রাখুন।

২. প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের একটি তালিকা তৈরি করুন।

৩. প্রয়োজনীয় কাগজগুলো ভালোভাবে পরীক্ষা করে নিশ্চিত হন তা নির্দিষ্ট সময়ের কি না। কাগজগুলো ২০২১ সালের জুলাই থেকে ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত সময়ের হতে হবে।

৪. রিটার্নের একটি ফটোকপি করুন এবং গত বছরের রিটার্ন দেখে খসড়া রিটার্ন তৈরি করুন।

৫. প্রতিটি কাগজের দুটি করে কপি করুন।

৬. স্বাক্ষর করার আগে কমপক্ষে দুবার চেক করুন।

৭. যাঁরা নিজে রিটার্ন পূরণ না করে অন্যদের ওপর নির্ভরশীল, তাঁরা সুপ্রশিক্ষিত এবং দায়িত্বশীল ব্যক্তি ছাড়া কোনোমতেই খালি বা সাদা রিটার্নে স্বাক্ষর করবেন না।

৮. স্বাক্ষর করার আগে গত বছরের সম্পদগুলো যথাযথভাবে যাচাই করুন এবং এ বছরে নতুন কোনো সম্পদ থাকলে তা ভালোভাবে পরীক্ষা করুন।

৯. মনে রাখবেন, আয়নার সামনে দাঁড়ালে আপনার চেহারা যেমন দেখা যাবে, তেমনি রিটার্নে আপনার সম্পদ ও আয়-ব্যয়ের সম্পূর্ণ চিত্র তুলে ধরতে হবে।

১০. স্বাক্ষর করার পর একটি সেট আপনার ট্যাক্স ফাইলে সংরক্ষণ করুন।

১১. রিটার্ন জমা হওয়ার পর রিটার্ন জমা দেওয়ার স্লিপ সংগ্রহ করুন।

লেখক: নির্বাহী পরিচালক, গোল্ডেন বাংলাদেশ