এ ছাড়া স্বল্প ও মধ্য মেয়াদে রাজস্ব ও ব্যাংক খাতে সংস্কার করতে হবে। ব্যাংকের সুদহার ও ডলারের বিনিময় হার ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন প্রয়োজন। এ ছাড়া সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে নিয়ে উচ্চপর্যায়ের কমিটি করা দরকার। সেই কমিটির পরামর্শ অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।

অনলাইন প্ল্যাটফর্মে গতকাল বৃহস্পতিবার সানেমের আয়োজনে ‘বাংলাদেশের অর্থনীতি: উদ্বেগের জায়গা ও করণীয়’ শীর্ষক সেমিনারে এসব কথা বলেন সানেমের নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান। আরও বক্তব্য দেন সানেমের চেয়ারম্যান বজলুল হক খন্দকার।

মাসে রিজার্ভ কমছে ১ বিলিয়ন

বিদায়ী ২০২০-২১ অর্থবছরে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বা মজুত ছিল ৪ হাজার ৬৪০ কোটি ডলার (৪৬ দশমিক ৪ বিলিয়ন)। গত জানুয়ারিতেও রিজার্ভ ছিল ৪ হাজার ৪৯৫ কোটি ডলার। এর পর থেকে চলতি নভেম্বর পর্যন্ত ১১ মাসে গড়ে ১০০ কোটি ডলার (১ বিলিয়ন) করে কমেছে। বর্তমানে রিজার্ভের পরিমাণ ৩ হাজার ৪৪৭ কোটি ডলার।

সেলিম রায়হান বলেন, রিজার্ভের পরিমাণে বাংলাদেশ যে খুব খারাপ অবস্থায় আছে, তা নয়। তবে রিজার্ভ থেকে প্রতি মাসে যে পরিমাণ ডলার কমছে, সেটি থামাতে না পারলে বিপদ আছে। তিনি আরও বলেন, ‘করোনাকালে কোনো কোনো দেশ রিজার্ভ অনেক বাড়িয়েছে। সে কারণে তারা বর্তমানে সংকটেও বেশ নির্ভার রয়েছে। আমাদেরও রিজার্ভ নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে। রিজার্ভ এমন জায়গায় নিয়ে যেতে হবে, যাতে ৮-১০ মাসের আমদানি দায় মেটানো যায়।’

বজলুল হক খন্দকার বলেন, রিজার্ভের ধারাবাহিক পতন বন্ধ করতে হবে। না হলে সবার মধ্যে আত্মবিশ্বাস কমে যেতে পারে। সেটি হলে সামাজিক অস্থিরতা দেখা দেবে।

হুন্ডি বন্ধে যা লাগবে

অবৈধ হুন্ডির কারণে প্রবাসী আয় বাড়ানো যাচ্ছে না। হুন্ডির জন্য দেশে-বিদেশে একই সঙ্গে চাহিদা ও জোগানের বিষয়টি জড়িত। হুন্ডি বন্ধ করতে হলে ডলারের বিনিময় হার ঠিক করতে হবে। একই সঙ্গে দেশ থেকে টাকা পাচার বন্ধ করতে হবে। যতক্ষণ অর্থ পাচার বন্ধ না হচ্ছে, ততক্ষণ হুন্ডি বন্ধ হবে না। এ জন্য রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রয়োজন আছে বলে মনে করেন সেলিম রায়হান।

এ ছাড়া ডলারের বিনিময় হার নিয়ে সেলিম রায়হান বলেন, ভারত সময়-সময় ডলারের বিপরীতে তাদের মুদ্রার বিনিময় হার সমন্বয় করেছে। তবে বাংলাদেশে দীর্ঘদিন সেটি করা হয়নি। এ জন্য হঠাৎ করে অনেক বেশি টাকার অবমূল্যায়ন করতে হয়েছে। আবার আমদানি, রপ্তানি ও প্রবাসী আয় বিনিময়ে ভিন্ন হারও নির্ধারণ করার কারণে কেউ এটাকে আস্থায় নিতে পারছে না।

ব্যাংক খাতের সংস্কারের ওপর জোর দিয়ে সেলিম রায়হান বলেন, ব্যাংক খাতের সুশাসন না থাকায় অর্থনীতিতে নানা রকম সমস্যা তৈরি হচ্ছে। ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিরা অসম্ভব প্রভাবশালী হওয়ায় তাঁদের নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। বর্তমান অর্থমন্ত্রী দায়িত্ব নেওয়ার এক সপ্তাহের মাথায় বললেন, খেলাপি ঋণ আর বাড়বে না। তারপর খেলাপি ঋণ আরও ৩০ শতাংশ বেড়েছে।

ব্যাংক খাত নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে নানান গুজব ছড়ানো হচ্ছে—এ বিষয়ে সেলিম রায়হান বলেন, গুজব সব সময়ই গুজব। তার কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই। নিয়মিত যত বেশি সঠিক তথ্য দেওয়া যাবে, ততই মানুষের বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়বে। একই সঙ্গে যাঁরা গুজব ছড়ান, তাঁরা নিরুৎসাহিত হবেন।

ব্যাংকের পাশাপাশি রাজস্ব খাতের সংস্কারের প্রসঙ্গও তোলেন সেলিম রায়হান। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের কর জিডিপির অনুপাত বর্তমানের তুলনায় দ্বিগুণ হওয়ার দরকার ছিল। তাতে আমাদের খরচের সক্ষমতা বৃদ্ধি পেত। রাজস্ব আদায় বাড়াতে সংস্কারের বিকল্প নেই।’

এ সময় আইএমএফের ৪৫০ কোটি ডলারের ঋণ পেতে ব্যাংক ও রাজস্ব খাতের সংস্কারের শর্তের বিষয়ে সানেমের নির্বাহী পরিচালক বলেন, আইএমএফের শর্তগুলো কোনোটিই নতুন কিছু নয়। সরকার আগেই সব কটি সংস্কার করার অঙ্গীকার করেছে। ষষ্ঠ থেকে অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় এসব সংস্কারের কথা রয়েছে। ফলে দৃঢ় রাজনৈতিক অঙ্গীকার ছাড়া এসব সংস্কার সম্ভব নয়।

দুর্ভিক্ষ হবে, নাকি না

২০১৫-১৬ অর্থবছরে মোট বিদেশি ঋণ ছিল ৪ হাজার ১১৭ কোটি ডলার। বিদায়ী অর্থবছরে সেটি বেড়ে ৯ হাজার ৫৮৬ কোটি ডলার হয়। তবে বিদেশি ঋণের কাঠামোগত কিছু পরিবর্তন হচ্ছে। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে স্বল্পমেয়াদি ঋণ ছিল ১৭ শতাংশ, যা বিদায়ী অর্থবছরে বেড়ে সাড়ে ২১ শতাংশ দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে বিদেশি ঋণের মধ্যে বেসরকারি হিস্যাও বাড়ছে।

এসব তথ্য উপস্থাপন করে সেলিম রায়হান বলেন, বর্তমানে বিদেশি ঋণ পরিশোধ উদ্বেগের জায়গায় নেই। তবে বিদেশি ঋণের কাঠামোর পরিবর্তন হচ্ছে। সামনের দিনে রপ্তানি ও প্রবাসী আয়ে সুখবর নেই। এতে রিজার্ভ ও চলতি হিসাবের মাধ্যমে বিদেশি ঋণ পরিশোধের পরিধি সংকুচিত হচ্ছে। এতে কয়েক বছরের মধ্যে অর্থনীতিতে বাড়তি চাপ তৈরি হবে।

সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে প্রায়ই দুর্ভিক্ষের আশঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে। এ বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে সেলিম রায়হান বলেন, দুর্ভিক্ষ হওয়ার আশঙ্কা কম। তবে দুর্ভিক্ষের কথা বারবার বললে আতঙ্ক তৈরি হয়। তাতে একটি গোষ্ঠী সুযোগ নিতে পারে। দুর্ভিক্ষ না হলেও সাময়িক সময়ের জন্য কোনো কোনো জায়গায় খাদ্যসংকট হতে পারে। এমন আশঙ্কা থাকলে আগে থেকেই ব্যবস্থা নিতে হবে।