যশোর–ঝিনাইদহের সিটি গোল্ড
নির্ধারিত দামে গয়না না বেচলে জরিমানার বিধান
যশোর শহর ও ঝিনাইদহের মহেশপুরে কালার কারখানা আছে ৫০টি।
ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার অন্তত ৪০টি গ্রামে ১০ হাজারের বেশি নারী-পুরুষ ‘সিটি গোল্ড’ নামের গয়না তৈরি করেন।
সোনা-রুপার বিকল্প হিসেবে রুপা, তামা, পিতল (কপার) দিয়ে তৈরি গয়না সিটি গোল্ডের কদর বাড়ছে। কিন্তু কাঁচামালের দাম দফায় দফায় বাড়লেও সে তুলনায় পণ্যটির দাম বাড়েনি। এতে উদ্যোক্তা ও কারিগরেরা বিপদে পড়েন। তাই সিটি গোল্ডের দাম বাড়ানোর দাবিতে সম্প্রতি ১২ দিন কারখানা বন্ধ রাখা হয়। দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হওয়ায় গত শনিবার থেকে আবার কারখানাগুলো চালু করা হয়।
যশোর ও ঝিনাইদহের সিটি গোল্ড মালিক সমিতি সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সমিতির বেঁধে দেওয়া পাইকারি দামেই সিটি গোল্ড বেচাকেনা করতে হবে। সে অনুযায়ী এখন থেকে প্রতি জোড়া কানের দুল সর্বনিম্ন ১১ টাকায় বিক্রি করতে হবে, যা আগে ছিল ৯ টাকা। সমিতির কোনো সদস্য বেঁধে দেওয়া দামের চেয়ে কমে বিক্রি করলে তাঁকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা গুনতে হবে। এদিকে কালার কারখানার মালিক এবং সিটি গোল্ডের কাঁচা ও পাকা মালা কেনাবেচার সঙ্গে জড়িত ব্যবসায়ীদের নিয়ে যশোর ও মহেশপুরের সিটি গোল্ড মালিক সমিতি ঐক্যবদ্ধ হয়েছে।
পুনর্গঠিত সিটি গোল্ড মালিক সমিতির সভাপতি রেজাউল ইসলাম রিপন প্রথম আলোকে বলেন, ‘দাম নির্ধারিত না থাকায় আমাদের এত দিন লোকসান গুনতে হচ্ছিল। তাই দাম বেঁধে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সমিতির বেঁধে দেওয়া দামের চেয়ে কম দামে বিক্রি করলে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হবে। আর কেউ এ রকম ঘটনা ধরিয়ে দিলে তাকে ১০ হাজার টাকা পুরস্কার দেওয়া হবে।’
আলাপকালে সিটি গোল্ডের ব্যবসায়ী ও কারিগরেরা বলেন, বাজারে আসল সোনার দাম এখন আকাশছোঁয়া। রুপার দামও লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। এই গয়না তৈরির কাঁচামাল রুপা, তামা–পিতলসহ অন্যান্য উপাদানের দাম গত তিন মাসে কয়েক দফায় বেড়ে এখন দ্বিগুণের বেশি হয়েছে। কিন্তু সে তুলনায় তৈরি গয়নার দাম বাড়েনি। এতে এই শিল্পের উদ্যোক্তারা লোকসানের মুখে পড়েন। তাতে কারিগরদের আয় অনিশ্চিত হয়ে যায়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার অন্তত ৪০টি গ্রামে ১০ হাজারের বেশি নারী-পুরুষ ‘সিটি গোল্ড’ নামের গয়না তৈরি করেন, যা ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেটসহ সারা দেশের পাইকারি ও খুচরা বাজারগুলোতে পাঠানো হয়।
সরেজমিনে যশোর এবং মহেশপুর ঘুরে ব্যবসায়ী ও কারিগরদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পাইকারেরা দাম বাড়াতে চান না। এনজিওর কিস্তি শোধের জন্য গয়না কম দামে বিক্রি করতে হয়। যেমন প্রতি জোড়া কানের দুল পাইকারি বিক্রি করে এক থেকে দেড় টাকা লাভ হয় উদ্যোক্তাদের। এই লাভে তাঁদের পোষায় না। ফলে সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও এই শিল্প গতি হারাচ্ছে!
সিটি গোল্ড কী
তামা বা পিতল (কপার) ধাতু দিয়ে তৈরি হয়, যার ওপর সোনার পাতলা একটি আস্তরণ বা প্রলেপ দেওয়া থাকে। ফলে এটি দেখতে আসল সোনার মতো চকচকে ও আকর্ষণীয় হয়, আধুনিক ও ঐতিহ্যবাহী নকশায় তৈরি করা হয়। দামে সস্তা হওয়ায় সবার সাধ্যের মধ্যে থাকে।
শুরুর ইতিহাস
নব্বইয়ের দশকে আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দাম বেড়ে গেলে ভারত থেকে সিটি গোল্ডের কানের দুল, হাতের চুড়ি, গলার চেইন, আংটিসহ নানা ধরনের গয়না যশোর ও ঝিনাইদহের সীমান্ত দিয়ে বৈধ-অবৈধ দুভাবেই দেশে আসতে শুরু করে। একপর্যায়ে ১৯৯৫ সালে ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার সোনার গয়নার কারিগর আবদুল হামিদ ও তাঁর ভাই আবদুর রহিম তামা ও পিতল গলিয়ে সিটি গোল্ডের গয়না তৈরি করতে শুরু করেন।
আবদুল হামিদের বর্তমান বয়স প্রায় ৭০ বছর। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, অনেক বছর আগে সোনার দাম বাড়ায় মানুষ তখন বিকল্প খুঁজছিল। ভারত থেকে আসা সিটি গোল্ডের গয়না দেখে তাঁরাও দেশে একই ধরনের গয়না তৈরি শুরু করেন। সঙ্গে কয়েকজন কর্মচারীকে শিখিয়ে নেন তাঁরা। এরপর ধীরে ধীরে কাজটি ছড়িয়ে পড়ে।
ঘরে ঘরে নারী কারিগর
মহেশপুর উপজেলার জলিলপুর, নওদাগা, বেগমপুর, দুর্গাপুর, নিমতলাপাড়া, দাঁড়াবাড়িয়া, রামচন্দ্রপুর, বাথানগাছি, পুরাপাড়া, সাহাপুরসহ অন্তত ৪০টি গ্রামের ঘরে ঘরে এখন সিটি গোল্ড গয়না তৈরি হয়। সম্প্রতি মহেশপুর উপজেলার নওদা গ্রামে গিয়ে দেখা গেছে, বাড়িতে বাড়িতে শ্রমিকেরা সিটি গোল্ডের গয়না তৈরির কাজে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন।
গয়না তৈরির দুই পদ্ধতি
দুভাবে এই গয়না তৈরি হয়। একটি হলো নিজেরা উপকরণ কিনে এনে বাড়িতে বসে গয়না বানিয়ে দোকানে পাইকারি বিক্রি করেন। অন্যটি হলো ভারত থেকে গয়নার মূল কাঠামো বা ডাইস এনে তৈরি করা হয়।
মহেশপুরের জলিলপুর বাজারের ইত্যাদি স্টোরের স্বত্বাধিকারী ও সিটি গোল্ড মালিক
সমিতির স্থানীয় সভাপতি রেজাউল ইসলাম রিপন জানান, তাঁর প্রতিষ্ঠানের তৈরি গয়না প্রায় ৪০ জন ব্যাপারী কিনে নিয়ে ঢাকার চকবাজারসহ বিভিন্ন জেলায় পাঠান।
কালার কারখানা
নারীদের তৈরি কাঁচা অলংকারে সোনার প্রলেপ দেওয়া হয় ইলেকট্রোপ্লেটিং তথা কালার কারখানায়। মহেশপুরে এ রকম ৪০টি ও যশোরে ১০টি মিলিয়ে মোট ৫০টি কারখানা রয়েছে।
যশোরের তমা কালারের স্বত্বাধিকারী ও সিটি গোল্ড মালিক সমিতির যশোর শাখার সভাপতি শাহদাত হোসেন জানান, ২০০৫ সালে তিনি কারখানা স্থাপন করেন। প্রথম ১৫ বছর রমরমা ব্যবসা হয়েছে। এ সময়ে যশোর শহরে আরও ৯টি কারখানা গড়ে উঠেছে।