পলিথিনকে সঙ্গে নিয়ে পাট খাতের উন্নয়ন কীভাবে সম্ভব

ফাইল ছবি

জাতীয় পাট দিবস উদ্‌যাপন ২০২৩ অনুষ্ঠান ছিল ঢাকার ওসমানি স্মৃতি মিলনায়তনে। সোমবার এ অনুষ্ঠানের মঞ্চে দুজন মন্ত্রী, একজন প্রতিমন্ত্রী ও একজন সচিব ছিলেন। মিলনায়তনের মেঝে ও মঞ্চের মেঝে—উভয় জায়গাতেই বিছানো ছিল সিনথেটিক কার্পেট। বিষয়টি নিজের বক্তৃতায় উল্লেখ করেন বাংলাদেশ বহুমুখী পাটপণ্য উৎপাদক ও রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি শাহিদুল ইসলাম ওরফে হেলাল।

শাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা সবাই পাট খাতের ভালো চাই। কিন্তু দেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রায় সব জায়গাতেই পাটপণ্যের ব্যবহার অনুপস্থিত। রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ে যেমন এর ব্যবহার নেই, নেই এমনকি পরিবেশ মন্ত্রণালয়েও।’

পাটপণ্যের প্রতি সরকারের এমন মনোভাব নিয়ে তাঁর কথা বলার সময় মন্ত্রী ও সচিব মুখ চাওয়া-চাওয়ি করছিলেন।

অনুষ্ঠানে সেরা ১১ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে পুরস্কার দিয়েছে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়। পাট ও পাটজাত পণ্যের উৎপাদন ও রপ্তানি বাড়াতে অবদানের জন্য তাঁদের এ পুরস্কার দেওয়া হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন শিল্পমন্ত্রী নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ুন। বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজীর সভাপতিত্বে এতে বিশেষ অতিথি ছিলেন শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মন্নুজান সুফিয়ান। পাটসচিব মো. আবদুর রউফ স্বাগত বক্তব্য দেন।

পাটপণ্য রপ্তানিতে দেশসেরা পুরস্কার পাওয়া আরেক রপ্তানিকারক আকিজ জুট মিলসের চেয়ারম্যান সেখ নাসির উদ্দিন পাটের সুতা উৎপাদকদের সংগঠন বাংলাদেশ জুট স্পিনার্স অ্যাসোসিয়েশনেরও (বিজেএসএ) চেয়ারম্যান। অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, পরিবেশবান্ধব পাট ও পরিবেশবিরোধী পলিথিন একসঙ্গে চলছে। দুটিকে একসঙ্গে চলতে দেওয়া যাবে না। একসঙ্গে চললে পাট খাতের উন্নয়ন সম্ভব নয়।

পাট খাতের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পাটপণ্যের ব্যবহার আইন করে বাধ্যতামূলক করা হলেও প্রয়োগের অভাবে তা অতটা কার্যকর নয়। সরকার সারা বছর এ আইনের প্রয়োগের বিষয়ে নিষ্ক্রিয় থাকলেও পাট দিবস অনুষ্ঠানের আগে সম্প্রতি ঢাকার মোহাম্মদপুরে পাটের বস্তা ব্যবহার না করায় কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করা হয়েছে। একসময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ট্রাক পরীক্ষা করত; এখনো করে, তবে নামমাত্র।

পণ্যে পাটজাত মোড়কের বাধ্যতামূলক ব্যবহার আইন, ২০১০–এর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে সেখ নাসির উদ্দিন বলেন, ‘ শুধু ট্রাকের প্রথম সারিতে পাটের বস্তা ও শেষের সারিতে পাটের বস্তা—এটা আমরা আর দেখতে চাই না। ভেতরেও তা থাকতে হবে। বাজেট বই সংসদে উপস্থাপনের সময় পাটের ব্যাগ ব্যবহার করলে এ খাতের আর কতটুকু হয়? ১৯ পাটপণ্য ব্যবহারে জেলা প্রশাসকদের উদ্যোগী করতে হবে।’ পাটবীজ নিয়ে তিনি বলেন, ‘দুঃখজনক যে স্বাধীনতার ৫০ বছর পার হলেও বীজে আমরা ভারতের ওপর নির্ভরশীল। এ বিষয়ে দুই বছরের পথনকশা চাই।’

পলিথিনকে ‘না’ বলতে হবে

পুরস্কার পাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে পাটবীজ, পাট ও পাটজাত পণ্যের গবেষণায় সেরা গবেষক শ্রেণিতে পুরস্কার পাওয়া বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিজেআরআই) মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মাহমুদ আল হোসেন বলেন, সবার আগে পলিথিনকে ‘না’ বলতে হবে। পাটে ভালো কিছু করতে না পারার কারণ হিসেবে ২০২২ সালের পাট দিবসে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো কেন পূরণ হয়নি, তা পর্যালোচনা করলেই বোঝা যাবে।

বহুমুখী পাটজাত পণ্য রপ্তানিকারক সেরা প্রতিষ্ঠান ক্রিয়েশন প্রাইভেট লিমিটেডের চেয়ারম্যান রাশেদুল করিম বলেন, পাট নিয়ে গবেষণা হচ্ছে, কিন্তু চাহিদাভিত্তিক গবেষণা হচ্ছে না। দেখতে হবে, আন্তর্জাতিক বাজারে কোন পণ্যের চাহিদা আছে। তা ছাড়া সময় এসেছে, এখন পাটকলগুলোকে ভালো কর্মপরিবেশ তৈরি ও নিয়মকানুন মেনে চলতে হবে, নইলে ব্যবসা করা যাবে না।

আশার বাণী শোনালেন না মন্ত্রীরা

বাংলাদেশ জুট মিলস অ্যাসিয়েশনের (বিজেএমএ) সভাপতি আবুল হোসেন বলেন, পুরোনো যন্ত্রপাতি দিয়ে পাট খাতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা যাবে না। সরকার ইতিবাচক থাকলে ও পদক্ষেপ নিলে পাট খাত থেকে বছরে ৮০০ থেকে ১ হাজার কোটি ডলার বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব।

শিল্পমন্ত্রী, বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী—কেউই কারখানামালিক, গবেষক, চাষি ও রপ্তানিকারকদের উত্থাপন করা বিষয়ের যথাযথ জবাব দিলেন না।
শিল্পমন্ত্রী বলেন, বিশ্বের অনেক দেশ পলিথিনের ব্যবহার নিষিদ্ধ করে প্রাকৃতিক তন্তু ব্যবহারে মনোযোগ দিয়েছে। সে হিসেবে পাটের ব্যাপক সম্ভাবনা আছে।

অনুষ্ঠানে সেরা পাটবীজ উৎপাদনে পুরস্কার পাওয়া কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জের আবু হানিফ জানান, তাঁর খামারে বছরে ১০ টন পাটবীজ উৎপন্ন হয়। আর সেরা পাট উৎপাদনকারী চাষি পাবনার ঈশ্বরদীর এনামুল হক জানান, ২২৫ বিঘা জমিতে তিনি পাট চাষ করে সাফল্য পেয়েছেন।

বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজী তাঁদের কথা শুনে উচ্ছ্বসিত হয়ে বলেন, ‘পাটের মতো পরিবেশবান্ধব পণ্য আর নেই। সবার বক্তব্য শুনে মনে হলো, আমি মন্ত্রী না হয়ে পাটচাষি হলে ভালো হতো।’ দেশে পাটবীজের ঘাটতি থাকা এবং পাটের ব্যাগের ব্যবহার ঠিকমতো না হওয়ার কথা অবশ্য স্বীকার করেন বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী।

শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মন্নুজান সুফিয়ান অবশ্য অনুষ্ঠানে পাটের পরিবর্তে রাজনৈতিক কথাবার্তাই বেশি বলেছেন।

আর কে, কী বললেন

পুরস্কার পাওয়া বহুমুখী পাটপণ্যের সেরা উদ্যোক্তা (পুরুষ) হাকিম আলী সরদার বলেন, দেশে চাল, আটা, মসুর ডাল ইত্যাদির জন্য দৈনিক ২০ লাখ পিস বস্তা দরকার। যে পরিমাণ শপিং ব্যাগ দরকার, শুধু তা পূরণ করতেই যে পরিমাণ পাটকল বন্ধ হয়ে গেছে, তার তিন গুণ কারখানা নতুন করে স্থাপন করতে হবে। সরকার সামান্য দৃষ্টি দিলেই পাট খাত উজ্জীবিত হতে পারে।

বহুমুখী পাটপণ্যের সেরা উদ্যোক্তা (নারী) কোহিনূর ইয়াসমিন বলেন, পাটপণ্য দিয়ে বিশ্বকে মাত করে দেওয়া সম্ভব।

অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন বাংলাদেশ পাটপণ্য রপ্তানিকারক সমিতির (বিজেজিইএ) চেয়ারম্যান শফিকুল ইসলাম, ক্ষুদ্র পাট ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবদুল আজিজ, উত্তরা জুট ফাইবার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের পরিচালক শাওন কুমার মোদি প্রমুখ।

২০১৬ সাল থেকে ৬ মার্চ জাতীয় পাট দিবস পালিত হয়ে আসছে। এবারের প্রতিপাদ্য পাটশিল্পের অবদান, স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণ। পাট খাতকে উৎসাহিত করতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একবার পাট দিবসের অনুষ্ঠানে জানিয়েছিলেন, তাঁর পরনের শাড়ি, ব্যাগ, এমনকি জুতাও পাটের তৈরি ছিল। এরপর এ ধরনের উদাহরণ আর তৈরি করেননি অন্য কোনো মন্ত্রী।

পাট দিবসের অনুষ্ঠানে প্রকাশিত স্মরণিকায় ১৯৭০ সালের ২৮ অক্টোবর বেতার ও টিভি ভাষণে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একটি উদ্ধৃতি ব্যবহার করা হয়।

পাকিস্তানিদের উদ্দেশে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘এযাবৎ বাংলার সোনালি আঁশ পাটের প্রতি ক্ষমাহীন অবজ্ঞা প্রদর্শন করা হয়েছে।’

পাট দিবসের অনুষ্ঠানে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সেই অবজ্ঞা এখনো দেখানো হচ্ছে। কৃত্রিম তন্তুর পরিবর্তে প্রাকৃতিক তন্তু ব্যবহারের বৈশ্বিক চাহিদা থাকলেও নীতি পরিকল্পনার অভাবে বাংলাদেশ তা ধরতে পারছে না।