চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত রিজার্ভ থেকে ৪৮৯ কোটি ডলার বিক্রি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। গত অর্থবছর বিক্রি করা হয়েছিল ৭৬২ কোটি ডলার। বিক্রীত ডলারের ৯০ শতাংশ খরচ হয় জ্বালানি ও সার আমদানিতে। এর ফলে বর্তমানে রিজার্ভ কমে দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৫৮৫ কোটি ডলারে। গত বছরের আগস্টে রিজার্ভ উঠেছিল ৪ হাজার ৮০০ কোটি ডলারে।

বাংলাদেশ ব্যাংক রিজার্ভের অর্থ ডলারের পাশাপাশি বিদেশে বিভিন্ন বন্ড, মুদ্রা ও স্বর্ণে বিনিয়োগ করে রেখেছে। সবচেয়ে বেশি অর্থ রাখা হয়েছে ডলারে। আবার রিজার্ভের অর্থে দেশেও তহবিল গঠন করা হয়েছে। রিজার্ভ থেকে ৭০০ কোটি ডলার দিয়ে গঠন করা হয়েছে রপ্তানি উন্নয়ন তহবিল (ইডিএফ)। এ ছাড়া রিজার্ভের অর্থে গঠন করা হয়েছে লং টার্ম ফান্ড (এলটিএফ), গ্রিন ট্রান্সফরমেশন ফান্ড (জিটিএফ)।

উড়োজাহাজ কিনতে বাংলাদেশ বিমান ও সোনালী ব্যাংককে অর্থ দেওয়া হয়েছে রিজার্ভ থেকে। পায়রা বন্দরের রাবনাবাদ চ্যানেলের খনন কর্মসূচিতেও রিজার্ভ থেকে অর্থ খরচ করা হয়েছে। সব মিলিয়ে বিভিন্ন তহবিল ও প্রকল্পে রিজার্ভের আট বিলিয়ন ডলার দেওয়া হয়েছে। এর বাইরে শ্রীলঙ্কাকে দেওয়া হয়েছে ২০ কোটি ডলার। বর্তমানে বাংলাদেশ সফর করছে আইএমএফের একটি প্রতিনিধিদল। বাংলাদেশকে ঋণসহায়তা দেওয়ার অংশ হিসেবে সফরকারী দলটি অর্থ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংকসহ আর্থিক খাতের বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক সংস্থার সঙ্গে বৈঠক করছে।

গত বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে বৈঠকে রিজার্ভের হিসাবায়ন নিয়ে প্রশ্ন তুলে প্রকৃত ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভ হিসাব করার পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি। বাংলাদেশ ব্যাংকও তাতে সম্মতি দিয়েছে। আইএমএফের পরামর্শ মেনে রিজার্ভ হিসাব করা হলে তা কমে দাঁড়াবে ২৭ বিলিয়ন ডলারের আশপাশে। বিভিন্ন খাতে দেওয়া রিজার্ভের অর্থ হিসাব থেকে বাদ দেওয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশ অবকাঠামো উন্নয়ন তহবিলের (বিআইডিএফ) কোনো প্রকল্পে রিজার্ভ থেকে অর্থায়ন না করার কথাও বলেছে সংস্থাটি।

এদিকে, গত ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকে বিশ্ববাজারে পণ্যের দামে তার নেতিবাচক প্রভাব দেখা যায়। টালমাটাল হয়ে পড়ে বিশ্ব অর্থনীতি। আর বিশ্ববাজারে জ্বালানি, খাদ্যপণ্য, মূলধনি যন্ত্রপাতি ও কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়ায় আমদানি খরচ বেড়ে যায় বাংলাদেশেরও। তবে সেই তুলনায় রপ্তানি ও প্রবাসী আয় না বেড়ে আরও কমে যায়। ফলে দেশে তৈরি হয় ডলার–সংকট। বেড়ে যায় দাম। এমন পরিস্থিতিতে জ্বালানি তেল আমদানি কমিয়ে দিয়েছে সরকার। আর জ্বালানিসংকটের বড় প্রভাব পড়েছে বিদ্যুৎ খাতে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর সালেহউদ্দিন আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে অতি প্রয়োজনীয় ছাড়া সব ধরনের পণ্য আমদানি কমিয়ে আনতে হবে। আর বাংলাদেশ ব্যাংকের উচিত ডলারের সর্বোচ্চ এক দাম নির্ধারণ করে দেওয়া। পাশাপাশি আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করে বিদেশি বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক আইএমএফের পরামর্শ মেনে একবারে ৮০০ কোটি ডলার না কমিয়ে রিজার্ভের দুই ধরনের তথ্য প্রকাশ করতে পারে। এতে বিভ্রান্তি দূর হবে।’

সালেহউদ্দিন আহমেদ আরও বলেন, ‘যুদ্ধ শুরুর আগে কেন আমদানি এত বেড়েছিল, সব মূলধনি যন্ত্র দেশে এসেছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা উচিত। হোটেল, আবাসনসহ বিভিন্ন খাতে অবৈধভাবে দেশের বাইরে যারা সম্পদ গড়ে তুলছে, তাদের ধরতে হবে। বিদেশে বিনিয়োগের অনুমতি দেওয়াটা ছিল ভুল সিদ্ধান্ত। আর রিজার্ভের অর্থে গঠিত ইডিএফের অর্থের যথাযথ ব্যবহার হয়েছে কি না, তা–ও খতিয়ে দেখতে হবে।’