এনবিআরে আমূল সংস্কার হয়নি বলেই রাজস্ব-জিডিপি অনুপাতের এত খারাপ অবস্থা। শক্তিশালী রাজস্ব আদায় ব্যবস্থা থাকলে বর্তমান অর্থনৈতিক সংকটে আমরা কম চাপ অনুভব করতাম।

আহসান এইচ মনসুর, নির্বাহী পরিচালক, পিআরআই

শুধু ওই দুটি দেশ নয়, শ্রীলঙ্কা, ইন্দোনেশিয়া, মিয়ানমার, ভিয়েতনাম, ভারত, ফিলিপাইন, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়ার চেয়েও বাংলাদেশের রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত কম। উল্লিখিত দেশগুলোর রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত সাড়ে ১১ শতাংশ থেকে প্রায় ২৪ শতাংশ পর্যন্ত। অর্থ মন্ত্রণালয়ের মধ্যমেয়াদি সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতি বিবৃতিতেই দেশের রাজস্ব-জিডিপি পরিস্থিতির এই দৈন্যদশার চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।

দেশের রাজস্ব আদায়ের প্রায় ৮৪ শতাংশ আদায় করে থাকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এনবিআরের কর-জিডিপির অনুপাতে ৮ শতাংশের কিছুটা বেশি আছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনায় আগামী তিন বছরে এই হার ৮ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে ৯ শতাংশে উন্নীত করা লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে।

বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের গড় রাজস্ব-জিডিপি হারের তুলনায়ও বাংলাদেশের অনুপাত অনেক কম। ২০২১ সালে ইউরো অঞ্চলে মোট রাজস্ব-জিডিপির অনুপাত ছিল ৪৭ শতাংশের বেশি। এ ছাড়া লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলে তা প্রায় ২৭ শতাংশ, মধ্যপ্রাচ্য ও মধ্য এশিয়া অঞ্চলে ২২ দশমিক ২৩ শতাংশ; এমনকি আফ্রিকার সাব সাহারা অঞ্চলে প্রায় ১৭ শতাংশ গড় রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত। খোদ অর্থ মন্ত্রণালয় বলছে, রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অন্যান্য সমজাতীয় স্বল্পোন্নত ও উন্নয়নশীল দেশ থেকে অনেক পিছিয়ে।

অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল নিজেই মনে করেন, এনবিআরের আরও দেড় থেকে দুই লাখ কোটি টাকা বেশি রাজস্ব সংগ্রহের সুযোগ আছে। অর্থমন্ত্রী গতকাল বৃহস্পতিবার তাঁর কার্যালয়ে প্রথম আলোকে বলেন, ‘এনবিআরের রাজস্ব সংগ্রহ এবার ভালো হয়েছে। তবে আমি মনে করি, আরও দেড় থেকে দুই লাখ কোটি টাকা বেশি রাজস্ব সংগ্রহের বাস্তবতা আছে দেশে।’ বর্তমানে এক অঙ্কের থাকলেও কর-জিডিপি হার ১৪ থেকে ১৫ শতাংশে উন্নীত করার পদক্ষেপ নিচ্ছেন বলে জানান মুস্তফা কামাল। তিনি বলেন, ‘কর-জিডিপি হার বাড়াতে যা যা করা দরকার, সবই করব।’

২৯,৮২১ কোটি টাকা ঘাটতি

প্রথমবারের মতো এনবিআরের রাজস্ব আদায় তিন লাখ কোটি টাকা ছাড়াল। এ আদায় অবশ্য লক্ষ্যমাত্রা থেকে ২৯ হাজার ৮২১ কোটি টাকা কম। বিদায়ী ২০২১-২২ অর্থবছরে কর ও মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) মিলিয়ে এনবিআর আদায় করেছে ৩ লাখ ১৭৯ কোটি টাকা। আগের অর্থবছরের আদায় ছিল ২ লাখ ৫৯ হাজার ৮৮১ কোটি টাকা। সেই হিসাবে সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে আগের বছরের চেয়ে ৪০ হাজার ২৯৮ কোটি টাকা বেশি আদায় হয়েছে। রাজস্ব সংগ্রহের সাময়িক হিসাব এনবিআর সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগে পাঠিয়েছে।

বিদায়ী অর্থবছরে এনবিআরের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার। কিন্তু বছর শেষে সেই লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারেনি রাজস্ব বোর্ড। চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরে এনবিআরকে ৩ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য দেওয়া হয়েছে। অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, এ লক্ষ্যমাত্রাও পূরণ হবে না।

এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, ভ্যাট থেকে গত অর্থবছর আদায়ের লক্ষ্য ছিল ১ লাখ ২৮ হাজার কোটি টাকা। আদায় হয়েছে ১ লাখ ৮ হাজার ৪১৮ কোটি টাকা। বছর শেষে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১৯ হাজার ৫৮২ কোটি টাকা কম ভ্যাট আদায় হয়েছে।

আমদানি ও রপ্তানি পর্যায়ে শুল্ক সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৯৬ হাজার কোটি টাকা, আদায় হয়েছে ৮৯ হাজার ৪২৪ কোটি টাকা। এ ক্ষেত্রে ঘাটতি ৬ হাজার ৫৭৬ কোটি টাকা। আর আয়কর ও ভ্রমণ কর থেকে আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা। আদায় হয়েছে ১ লাখ ২ হাজার ৩৩৭ কোটি টাকা। এ ক্ষেত্রে ঘাটতি ৩ হাজার ৬৬৩ কোটি টাকা।

রাজস্ব খাত সংস্কারে নীতিনির্ধারকদের মধ্যে একধরনের উদাসীনতা আছে বলে মনে করেন বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘এনবিআরে আমূল সংস্কার হয়নি বলেই রাজস্ব-জিডিপি অনুপাতের এত খারাপ অবস্থা। শক্তিশালী রাজস্ব আদায়ের ব্যবস্থা থাকলে, বর্তমান অর্থনৈতিক সংকটে আমরা কম চাপ অনুভব করতাম।’ তাই রাজস্ব আদায় বাড়াতে প্রশাসনিক সংস্কারের পাশাপাশি স্বয়ংক্রিয় কর প্রদানের ব্যবস্থা চালুর প্রতি জোর দেন তিনি।

বাণিজ্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন