অথচ বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যানুসারে, একই সময়ে বাংলাদেশের খাদ্য মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির হার মাত্র ৫ দশমিক ৩১ শতাংশ। ২০২০ সালের অক্টোবর মাসে দেশের খাদ্যমূল্য সূচক ছিল ৩২০ দশমিক ৯৪ পয়েন্ট। এ বছরের অক্টোবর মাসে তা দাঁড়িয়েছে ৩৩৭ দশমিক ৭০ পয়েন্ট। কিন্তু বাজারে গেলে মানুষের নাভিশ্বাস ওঠার জোগাড় হচ্ছে। আগস্ট মাসে কোভিডজনিত বিধিনিষেধ প্রত্যাহারের পর থেকেই জিনসপত্রের দাম ঊর্ধ্বমুখী। এরপর আবার জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে বাজারে গেলেই মানুষের নাভিশ্বাস ওঠার জোগাড় হচ্ছে। কিন্তু সরকারের দাপ্তরিক হিসাবে তার প্রতিফলন ঘটছে না। এই পরিস্থিতিতে সরকারি তথ্য-উপাত্তের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। অর্থনীতিবিদেরাও সময়-সময় এ নিয়ে অভিযোগ করেন।

এদিকে টানা এক মাস ধরে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমছে। নভেম্বরের ১ তারিখের পর থেকে আজ পর্যন্ত তেলের দাম কমেছে ১৯ শতাংশ। (প্রতি ব্যারেল ৮৪ দশমিক ৫ ডলার থেকে কমে ৬৮ দশমিক ৩ ডলার)। কথা হচ্ছে, আন্তর্জাতিক বাজারের দোহাই দিয়ে সরকার তেলের দাম ২৩ শতাংশ বাড়িয়েছিল। যেহেতু আন্তর্জাতিক বাজারে দাম ১৯ শতাংশ কমে গেছে, সেহেতু সরকার এখন তেলের দাম কমানোর চিন্তা করতেই পারে বলে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন। তাতে বাসভাড়া বৃদ্ধি নিয়ে চলমান অচলাবস্থার নিরসন করা সম্ভব।

এই পরিস্থিতিতে নতুন করে শঙ্কার কারণ হয়ে উঠেছে করোনাভাইরাসের নতুন ধরন অমিক্রনের প্রাদুর্ভাব। এর আগে থেকেই অবশ্য ইউরোপে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বাড়তির দিকে। এতে নতুন করে অনেক দেশেই বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। বিমান পরিবহন অনেকাংশে সীমিত করা হয়েছে। এয়ারলাইনসগুলো ইতিমধ্যে জানিয়েছে, টিকিট বুকিং কমতে শুরু করেছে। স্বাভাবিকভাবেই সরবরাহ ব্যবস্থা আরও বিঘ্নিত হবে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, এমনিতেই বিশ্ব অর্থনীতি সরবরাহ সংকট, কাঁচামালের অপ্রতুলতাসহ নানাবিধ সংকটে ভুগছে। তার সঙ্গে অমিক্রনের আবির্ভাব মড়ার উপর খাঁড়ার ঘায়ের মতো হয়ে এসেছে। বিশেষ করে যেসব দেশে টিকাদানের হার কম বা যেসব দেশ পর্যটনের ওপর বেশি নির্ভরশীল, সেই সব দেশ বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে বরে শঙ্কা করছেন বিশ্লেষকেরা।

মূল্যস্ফীতির কারণ বহুবিধ। প্রথমত, দেশি-বিদেশি বাজারে কাঁচামালের আগুন দর ও অপ্রতুলতার কারণে উৎপাদনশিল্প বিপাকে পড়েছে। উৎপাদনের কাঁচামাল বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। তাই মূল্যস্ফীতি দেশের বাজারে আগুন লাগিয়ে দিয়েছে। আবার জাহাজজটের কারণে অনেক পণ্য আমদানি করতে বিলম্ব হচ্ছে। অর্থাৎ অপ্রতুলতা ও বিলম্ব—দুই কারণেই মূল্যস্ফীতি ঘটছে। দ্বিতীয়ত, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে কলকারখানায় উৎপাদন খরচ বেড়েছে। ডলারের তুলনায় টাকার দামও নিম্নমুখী, রপ্তানির ক্ষেত্রে যা আবার অতিরিক্ত মূল্যস্ফীতি ঘটাচ্ছে। পরিবহন ভাড়া জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির আগে থেকেই বাড়তি। পণ্যমূল্যে যার প্রভাব পড়েছে। এমনকি রাইড শেয়ারিং সেবার ভাড়াও অনেক বেড়েছে। যে পথে দুই বছর আগে গাড়িভাড়া আসত ২৭০/২৮০ টাকা, সেই পথের ভাড়া এখন ৩৭০/৩৮০ টাকা হয়ে গেছে। অর্থাৎ ১০০ টাকা বেড়েছে। তারপর দীর্ঘ বর্ষাকালের কারণে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। প্রতিবার নিম্নচাপ বা ঘূর্ণিঝড়ের পর কৃষিপণ্যের দাম ২০ শতাংশের মতো বেড়েছে।

অন্যান্য দেশে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ত্বরিত ব্যবস্থা নিলেও দেশে সে রকম দেখা যাচ্ছে না। সুদহার সাধারণ বাজারের ওপর নির্ভর করলেও বিভিন্ন দেশে কেন্দ্রীয় ব্যাংক মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সুদহার বৃদ্ধি করে থাকে। কিন্তু দেশের সুদহার কেন্দ্রীয় ব্যাংক বেঁধে দিয়েছে। আর এবারের সমস্যা হচ্ছে, এই মূল্যস্ফীতি চাহিদাজনিত নয়, সরবরাহজনিত। সে জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কিছু করার সুযোগ সীমিত। সুদহার বাড়ানো হলে পুনরুদ্ধার আরও ব্যাহত হওয়ার শঙ্কা থাকে, যদিও ব্যাংকগুলো চায়, সুদহার বৃদ্ধি করা হোক। নয়ছয়ে তারা কুলাতে পারছে না।

মোট কথা, মহামারির ধাক্কা সামলে অর্থনীতি যখন ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে, তখন যেন মূল্যস্ফীতির সমস্যা আবার তাকে বিধ্বস্ত না করে, তা নিশ্চিত করা দরকার বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা।

বিশ্ববাণিজ্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন