ইরান–যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধে অর্থনৈতিকভাবে চীনের লাভ, কীভাবে
মধ্যপ্রাচ্যের হরমুজ প্রণালি সংকট থেকে যে দেশটি দৃশ্যত সবচেয়ে বেশি অর্থনৈতিক সুবিধা পেয়েছে, সেই দেশটি বিবদমানের পক্ষের কেউ নয়, বরং সেই দেশটি হলো বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি চীন। মঙ্গলবার প্রকাশিত এক ভূরাজনৈতিক প্রতিবেদনে এই তথ্য দেওয়া হয়েছে।
ভূরাজনৈতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান দ্য এশিয়া গ্রুপের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে যে বৈশ্বিক পণ্য ও জ্বালানিসংকট তৈরি হয়েছে, তার ধাক্কা চীন তুলনামূলক ভালোভাবে সামলাতে পেরেছে। একই সঙ্গে বৃহত্তর সংঘাত থেকে তৈরি হওয়া অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক পরিবর্তন থেকেও লাভবান হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে তাদের জন্য।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথ হামলা চালিয়ে ইরানের সরকারি ও সামরিক স্থাপনায় আঘাত করে। এতে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনি নিহত হন। এর পরপরই ইরান কার্যত হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়—যে পথ দিয়ে বিশ্বের বড় অংশের তেল ও গ্যাস পরিবাহিত হয়। এর জেরে বৈশ্বিক জ্বালানিবাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়, যার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ে এশিয়ার বাজারে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রণালি বন্ধ হওয়ার আগে ওই জলপথ দিয়ে পরিবাহিত প্রায় ৮০ শতাংশ তেল ও প্রায় ৯০ শতাংশ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস এশিয়ার বাজারে যেত। পাশাপাশি অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পণ্যও এই পথেই পরিবাহিত হতো।
এশিয়া গ্রুপের এই বিশ্লেষণে চীন, ভারত, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়াসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার উদীয়মান অর্থনীতিগুলোর ওপর সংকটের প্রভাব পর্যালোচনা করা হয়। উৎপাদন, জ্বালানি ও কৃষিসহ গুরুত্বপূর্ণ খাতে যে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অভিঘাত পড়েছে, তা তুলে ধরা হয়েছে এই প্রতিবেদনে।
গবেষকেরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যে ডোনাল্ড ট্রাম্পের কারণে যে সংকট সৃষ্টি হয়েছে, তার সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী চীন।
কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, চীনের বিশাল তেল মজুত ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে ব্যাপক বিনিয়োগ তাকে অনেকটা সুরক্ষিত রেখেছে। অন্তত সমতুল্য দেশগুলোর তুলনায় চীনের ঝুঁকি ছিল কম।
বলা হয়েছে, দীর্ঘদিন ধরেই চীন কৌশলগত জ্বালানি মজুত গড়ে তুলছে। গত বছর দাম কমে যাওয়ার সুযোগে তারা এই মজুত আরও বৃদ্ধি করে।
বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৫ সালে চীনের অপরিশোধিত তেল আমদানি দৈনিক ১১ দশমিক ১ মিলিয়ন বা ১ কোটি ১০ লাখ ব্যারেল থেকে বেড়ে ১১ দশমিক ৬ মিলিয়ন বা ১ কোটি ১৬ লাখ ব্যারেলে পৌঁছায়। এর ৮০ শতাংশের বেশি সরাসরি মজুতে পাঠানো হয়। চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত দেশটির যে মজুত ছিল, তা ২০২৫ সালের আমদানির হারে ১০৪ দিনের আমদানি চাহিদা মেটানোর মতো যথেষ্ট ছিল।
একই সঙ্গে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অবকাঠামোতেও ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে চীন। গত বছর দেশটি নতুন করে ৩১৫ গিগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করেছে। হিসাবে দেখা যায়, বিশ্বে গত বছর নতুন করে যে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়েছে, এটি তার অর্ধেকের বেশি। তার আগের বছর যোগ হয়েছিল আরও ২৭৭ গিগাওয়াট।
বেইজিংয়ের লক্ষ্য, ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের মোট জ্বালানির অর্ধেক জীবাশ্মবিহীন উৎস থেকে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে দেশটি। এর মধ্যে বায়ু ও সৌরবিদ্যুতের হিস্যা ২০২৫ সালের ২২ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি করে ৩০ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। যদিও এখনো চীনের জ্বালানি–কাঠামোর অর্ধেকের বেশি নির্ভর করে কয়লার ওপর।
নবায়নযোগ্য বিদ্যুতে চীনের দাপট
এশিয়া গ্রুপের ভাষ্য, বর্তমানে চীনের নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনসক্ষমতা ১ দশমিক ৪ টেরাওয়াট; এই উৎপাদনসক্ষমতা এখনো আছে। সেই সঙ্গে ৯০ থেকে ১১০ দিনের অপরিশোধিত তেলের চাহিদার সমপরিমাণ মজুত থাকায় তারা সবচেয়ে ভালোভাবে প্রাথমিক ধাক্কা সামাল দিতে পেরেছে।
এ ছাড়া সংকটের কারণে অন্যান্য দেশ যখন নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে ঝুঁকছে, তখন তারও সুবিধা পাচ্ছে চীন। সৌরশক্তি ও নবায়নযোগ্য প্রযুক্তির বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় এখন তাদেরই দাপট।
গত মে মাসে চীনের বৈদ্যুতিক গাড়ি রপ্তানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১১০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। এপ্রিল মাসে সৌর প্যানেল রপ্তানি বেড়েছে ৬০ শতাংশ।
এদিকে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়েছে বেইজিং। মে মাসে ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিনপিংয়ের সঙ্গে সমাধান খোঁজার বিষয়ে একমত হওয়ার কথাও জানিয়েছিলেন ট্রাম্প।
তবে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই সংকটের কারণে কূটনৈতিকভাবে চীনের সামনে সুযোগ এসেছে। সেই সুযোগটা হলো, যুক্তরাষ্ট্রের কারণে যে বিশ্বব্যবস্থায় অস্থিতিশীলতা, সেই বিষয়টি তুলে ধরা।
বিষয়টি অত সহজ সরল নয়, এতে নানা ঝুঁকিও আছে। সিঙ্গাপুরের এস. রাজরত্নম আন্তর্জাতিক অধ্যয়ন বিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ গবেষণা-সহযোগী ড্রু থম্পসন বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কমলেই যে চীন স্বয়ংক্রিয়ভাবে লাভবান হবে, বিষয়টি তা নয়। নিরাপত্তা দেওয়ার ক্ষেত্রে মধ্যপ্রাচ্যে ওয়াশিংটনের স্থলাভিষিক্ত হতে রাজি নয় বেইজিং।
অন্যদিকে আটলান্টিক কাউন্সিলের গ্লোবাল চায়না হাবের ফেলো ওয়েন তি সুং মনে করেন, এই সংকটের মধ্য দিয়ে তাইওয়ানে ভবিষ্যৎ সামরিক অভিযানের প্রশ্নে চীন আরও সতর্ক হতে পারে। বৈরী অঞ্চলে জাহাজ চলাচলে যে জটিলতা, এই সংকটের মধ্য দিয়ে তা আরও স্পষ্ট হয়েছে।
চীন এই সংকটকে হুমকি হিসেবে নয়, বরং চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাব্য সুযোগ হিসেবে দেখছে, যে চ্যালেঞ্জ বাগে আনার সক্ষমতা তাদের আছে।