বিশ্বব্যাপী পুঁজির প্রবাহ নজরদারি করে মার্কিন পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এক্সান্টি ডেটা। তাদের তথ্যানুসারে, চীন ব্যতীত এশিয়ার উদীয়মান দেশগুলো সেপ্টেম্বর মাসে খোলাবাজারে বিক্রির জন্য প্রায় তিন হাজার কোটি ডলার ছেড়েছে। জাপানকে অন্তর্ভুক্ত করলে এ ব্যয়ের পরিমাণ পাঁচ হাজার কোটি ডলার। বাংলাদেশও প্রতিনিয়ত রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি করছে।

এক্সান্টি ডেটার তথ্যানুসারে, চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসে জাপানসহ এ অঞ্চলের ডলার বিক্রি প্রায় ৮ হাজার ৯০০ কোটি ডলারে উন্নীত হয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয়ের এ প্রবণতা ২০০৮ সালের পর সবচেয়ে সক্রিয় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সংস্থাটি কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও অন্যান্য সরকারি কর্তৃপক্ষের তথ্যের ভিত্তিতে এ হিসাব করেছে।

এদিকে অন্যান্য মুদ্রার বিপরীতে ডলারের বিনিময় হার রেকর্ড উচ্চতায় উঠেছে। অন্যান্য প্রধান মুদ্রার বিপরীতে ডলারের সূচক ১৯৮০-এর দশকের পর সর্বোচ্চ উচ্চতায় উঠেছে। ডলারের ঊর্ধ্বগতি কেন্দ্রীয় ব্যাংকে রক্ষিত অন্যান্য মুদ্রার মূল্যমান হ্রাস করেছে।

দক্ষিণ কোরিয়া, ভারত, তাইওয়ান, জাপানসহ উদীয়মান অর্থনীতিগুলো ব্যাপকভাবে ডলার বিক্রি করেছে। সেপ্টেম্বর মাসে জাপানের দুই হাজার কোটি ডলার বিক্রি ছাড়াও দক্ষিণ কোরিয়া প্রায় ১ হাজার ৭০০ কোটি ডলার বিক্রি করেছে। গত মাসে হংকং, ফিলিপাইন, তাইওয়ান ও থাইল্যান্ডও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে ডলার বিক্রি করেছে।

এক্সান্টের জ্যেষ্ঠ কৌশলবিদ অ্যালেক্স ইন্ট্রা বলেন, উচ্চ নীতি সুদহারের কারণে উদীয়মান দেশগুলোর মুদ্রা চাপের মধ্যে আছে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রে সুদহার কতটা বাড়ানো হবে, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা আছে। সুতরাং ডলারের বিপরীতে অন্যান্য মুদ্রার অবমূল্যায়ন শিগগিরই থামবে বলে মনে হচ্ছে না।

এমন পরিস্থিতিতে বিভিন্ন দেশের সরকার আরও পদক্ষেপ নিতে পারে। সম্প্রতি ডলারের বিপরীতে ইয়েনের বিনিময় হার ৩০ বছরের বেশি সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দেশটির সরকার মুদ্রাবাজারে হস্তক্ষেপের জোরালো পরিকল্পনা করছে।

এর আগেও অস্থিরতা কমাতে কিংবা নিয়ন্ত্রণ করতে এশিয়ার সরকারগুলো প্রায়ই বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে হস্তক্ষেপ করেছে। নানামুখী পদক্ষেপের মাধ্যমে বিদেশি মুদ্রা দুর্বল করার চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু গত মাসের ডলার বিক্রি আড়াই বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।

এদিকে বিশ্বজুড়ে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ নিম্নমুখী। এর কারণও তুলে ধরেছেন অ্যালেক্স ইন্ট্রা। তিনি বলেন, আংশিকভাবে সম্পদের বৃহত্তম পুনর্বণ্টনের কারণেও রিজার্ভে টান পড়তে পারে। কিন্তু চাপে পড়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোকে এখন নগদ অর্থ বিক্রি করতে হচ্ছে।

বিশ্বব্যাপী বৈদেশিক মুদ্রার মজুত ১ ট্রিলিয়ন কিংবা ৮ দশমিক ৯ শতাংশের বেশি কমেছে। চলতি বছর রিজার্ভের পরিমাণ ১২ ট্রিলিয়ন ডলারের নিচে নেমে এসেছে।

ডলারের দর কেন বাড়ছে

অর্থনৈতিক মন্দার আশঙ্কা এখন সারা বিশ্বকেই তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। আর এই মন্দার আশঙ্কাই মার্কিন ডলারকে শক্তিশালী করছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। একই সময়ে আর্থিক খাতে নিয়ন্ত্রণমূলক নানা পদক্ষেপে মন্দার আশঙ্কা আরও ঘনীভূত হচ্ছে।

মার্কিন ডলার হঠাৎ করে এমন তপ্ত হয়ে উঠল কেন—এ নিয়ে নানা ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ আছে। বিষয়টি হলো, বিশ্বের বাজারব্যবস্থা যখন অস্বাভাবিক আচরণ করতে শুরু করে, অনিশ্চয়তায় ভোগে, বিনিয়োগকারীরা তখন নিরাপদ আশ্রয় খোঁজেন। অর্থনীতিতে মন্দার আশঙ্কা আর অস্থিরতায় সারা বিশ্বের বিনিয়োগকারীরা এখন মার্কিন ডলারেই নিরাপত্তা খুঁজছেন।