ভারত যেকোনো দেশ থেকে তেল কিনতে পারে: রাশিয়া
যুক্তরাষ্ট্রের দাবির মুখে রাশিয়া জানিয়েছে, ভারত যেকোনো দেশ থেকে তেল কিনতে পারে। তেল কেনার ক্ষেত্রে তারা স্বাধীন।
সম্প্রতি মার্কিন-ভারত বাণিজ্যচুক্তি চূড়ান্ত হয়ে গেছে—মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এমন ঘোষণা দেওয়ার সময় বলেন, ভারত রাশিয়া থেকে তেল কিনবে বলে রাজি হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে ভারত এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক বিবৃতি না দিলেও রাশিয়া দিয়েছে। খবর ইকোনমিক টাইমসের।
রাশিয়া বলেছে, ভারত যেকোনো দেশ থেকে তেল কিনতে পারে। অতীতেও ভারতের খনিজ তেল কেনার একমাত্র জায়গা যে শুধু রাশিয়া ছিল না, সেটিতেও গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
বাণিজ্যবিষয়ক উপাত্ত সংস্থা কেপলারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ট্রাম্প ভারতের পণ্যে অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ শুল্ক বসানোর পরও ভারত প্রতিদিন রাশিয়া থেকে ১ দশমিক ৫ মিলিয়ন বা ১৫ লাখ ব্যারেল খনিজ তেল কিনছিল। রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল ক্রেতাদের মধ্যে ভারতের অবস্থান দ্বিতীয়। ভারতের আমদানি করা অপরিশোধিত তেলের এক-তৃতীয়াংশ আসে রাশিয়া থেকে। এই প্রেক্ষাপটে ভবিষ্যতে অপরিশোধিত তেল কেনা নিয়ে কি অবস্থান বদলাবে নয়াদিল্লি, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বলেন, ‘ভারত শুধু আমাদের দেশ থেকে পেট্রল বা খনিজ তেল কেনে না। তাই এ ক্ষেত্রে আমরা কোনো কিছুই দেখছি না। ভারত রাশিয়ার পরিবর্তে ভেনেজুয়েলার থেকে তেল কিনবে, এ–সংক্রান্ত প্রশ্নের জবাবে এ কথা বলেছেন তিনি। এক দিন আগেই পেসকভ জানিয়েছিলেন, ভারত রাশিয়া থেকে তেল কিনবে না, এমন কোনো বিবৃতি ভারত দেয়নি।
ভারতের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যচুক্তির ঘোষণা করেছেন ট্রাম্প। নয়াদিল্লির ওপর শুল্ক ৫০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৮ শতাংশ করেছেন তিনি। ট্রাম্পের দাবি, রাশিয়ার থেকে তেল কেনার সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে ভারত। সেই সঙ্গে তিনি আরও বলেছেন, ভারত এখন থেকে ভেনেজুয়েলার তিল কিনবে।
রাশিয়ার তেলের ওপর ভারতের নির্ভরশীলতা
২০২১ সাল পর্যন্ত ভারতের মোট অপরিশোধিত তেল আমদানিতে রাশিয়ার অংশ ছিল নগণ্য—মাত্র শূন্য দশমিক ২ শতাংশ। কিন্তু ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক অভিযান শুরু হলে এবং পশ্চিমা দেশগুলো মস্কোর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে বৈশ্বিক তেলবাজারে বড় পরিবর্তন আসে। সেই প্রেক্ষাপটে বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম তেল আমদানিকারক দেশ ভারত ছাড়মূল্যের রুশ অপরিশোধিত তেলের প্রধান ক্রেতায় পরিণত হয়।
ভারত তার মোট অপরিশোধিত তেলের প্রায় ৮৮ শতাংশই বিদেশ থেকে আমদানি করে। পরিশোধন করে তা পেট্রল ও ডিজেলের মতো জ্বালানিতে রূপান্তরিত করা হয়। এর মধ্যে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ তেল আসে রাশিয়া থেকে। একসময় দৈনিক ২০ লাখ ব্যারেলের বেশি রুশ তেল আমদানি করেছে ভারত। পরে তা কমে ডিসেম্বর মাসে প্রায় ১৩ লাখ ব্যারেলে দাঁড়ায়। ধারণা করা হচ্ছে, চলতি মাসেও তা মোটামুটি একই পর্যায়ে থাকবে। খবর এনডিটিভির।
গত বছর ডোনাল্ড ট্রাম্প ভারতীয় পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করলে পরিস্থিতি বদলে যায়। এর মধ্যে ২৫ শতাংশ ছিল রাশিয়ার জ্বালানি কেনার কারণে শাস্তিমূলক শুল্ক। এর প্রভাবে ভারতের রুশ অপরিশোধিত তেল আমদানিতে ভাটা পড়ে।
তাৎক্ষণিকভাবে তথ্য বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারির প্রথম তিন সপ্তাহে ভারতের রুশ তেল আমদানি নেমে আসে দৈনিক প্রায় ১১ লাখ ব্যারেলে। আগের মাসে যেখানে গড় আমদানি ছিল ১২ লাখ ১০ হাজার ব্যারেল। ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে এই পরিমাণ ছিল দৈনিক ২০ লাখ ব্যারেলের বেশি।
ন্যাশনাল এনার্জি সিকিউরিটি ফান্ডের শীর্ষ বিশেষজ্ঞ ইগর ইউশকভ মনে করেন, ভারতীয় শোধনাগারগুলোর পক্ষে রাশিয়ান অপরিশোধিত তেল পুরোপুরি বাদ দেওয়া বাস্তবসম্মত নয়। সংবাদ সংস্থা পিটিআইকে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যে শেল তেল রপ্তানি করে, তা হালকা প্রকৃতির গ্যাস কনডেনসেটের কাছাকাছি। বিপরীতে রাশিয়ার ইউরালস তেল তুলনামূলকভাবে ভারী ও সালফারসমৃদ্ধ। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের তেল ব্যবহার করতে হলে ভারতকে অন্যান্য গ্রেডের তেলের সঙ্গে মিশিয়ে নিতে হবে। এতে বাড়তি খরচ হবে। অর্থাৎ একে একে বিকল্প হিসেবে নেওয়া সহজ নয়।
ইউশকভের ভাষায়, রাশিয়া সাধারণত ভারতে দৈনিক ১৫ থেকে ২০ লাখ ব্যারেল তেল সরবরাহ করে। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে এই কোটা পূরণ করা সম্ভব নয়। তাঁর মতে, ট্রাম্পের এ অবস্থান মূলত রাজনৈতিক-বাণিজ্য আলোচনায় তিনি যে ‘জয়ী’ হয়েছেন, তা প্রদর্শনেরই চেষ্টা।
ইউশকভ আরও স্মরণ করিয়ে দেন, ২০২২ সালে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের বাজার ছেড়ে রাশিয়া যখন ভারতমুখী হয়েছিল, তখন দেশটি দৈনিক ১০ লাখ ব্যারেল তেল উৎপাদন কমিয়ে দেয়। এর ফলেই আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১২০ ডলারে পৌঁছে যায়। যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রল ও ডিজেলের দাম ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠে যায়।