২ লাখ কোটি ডলারের বাণিজ্য জাপানের, বাংলাদেশের সঙ্গে কত

বাংলাদেশ ও জাপানের পতাকার কোলাজ

বিভিন্ন দেশের সঙ্গে প্রতিবছর প্রায় ২ লাখ কোটি ডলারের ব্যবসা–বাণিজ্য করে থাকে বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ জাপান। বাংলাদেশের সঙ্গেও জাপানের ব্যবসা–বাণিজ্য হয়। বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে আমদানি–রপ্তানি বা ব্যবসা–বাণিজ্যের পরিমাণ মাত্র ৩২৮ কোটি ডলার। জাপান বাংলাদেশের নবম বৃহত্তম রপ্তানি গন্তব্য। জাপান থেকে গাড়ি, ইলেকট্রনিকস পণ্য, লোহা ও ইস্পাত বেশি আমদানি করা হয়।

একসময় মনে করা হতো জাপান বিশ্বের শীর্ষ অর্থনীতি হবে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ থেকে উঠে দাঁড়িয়ে দেশটি বড় শিল্পশক্তিতে পরিণত হয়। গাড়ি, ইলেকট্রনিকস ও প্রযুক্তিপণ্যের বিশ্ববাজারে প্রায় একক আধিপত্য ছিল দেশটির।

একসময় বাংলাদেশের বাজারে গাড়ি ও ইলেকট্রনিকস মানেই ছিল জাপানি পণ্য। জাপানের হোন্ডা ব্র্যান্ডের মোটরসাইকেল দাপিয়ে বেড়াত অলিগলি, সড়ক–মহাসড়ক। একসময় মানুষ মোটরসাইকেল বলতেই মনে করত হোন্ডার কথা, রঙিন টেলিভিশন বলতে বুঝত সনির কথা।

শেষমেশ জাপানের পক্ষে যুক্তরাষ্ট্রকে হটিয়ে শীর্ষ স্থানে যাওয়া সম্ভব হয়নি। বরং মাথাপিছু আয়সহ বিভিন্ন সূচকের জাপানের উল্টো অবনতি হয়েছে। নব্বইয়ের দশকের আর্থিক সংকট, বৃদ্ধ মানুষের সংখ্যা বেড়ে যাওয়া, চীনের উত্থানে তথ্যপ্রযুক্তিতে পিছিয়ে পড়া—এসব কারণে জাপানের সেই স্বপ্ন অধরাই থেকে গেছে।

এসব চাপ ও বাধার মধ্যেও জাপান এখনো বিশ্বের অন্যতম বড় অর্থনীতি। তারা এখন বিশ্বের চতুর্থ বৃহৎ অর্থনীতি। প্রায় ৪ লাখ ৪৪ হাজার কোটি ডলারের এই অর্থনীতির সঙ্গে এখনো বিশ্বের অনেক দেশ জড়িত।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) ও বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বেড়ে ৩২৮ কোটি ডলার ছাড়িয়ে গেছে। জাপান এখন বিশ্বে বাংলাদেশের নবম বৃহত্তম রপ্তানি গন্তব্য। তবে জাপানের রপ্তানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান কত, সেই তথ্য পাওয়া যায়নি।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আজ সোমবার চার দিনের সফরে জাপান গেছেন। এই সফরে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে আরও গতি আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

দেখে নেওয়া যাক জাপানের মোট বাণিজ্যের পরিমাণ কত, তার শীর্ষ বাণিজ্যিক অংশীদার কোন দেশগুলো।

জাপানের অর্থনীতি কেমন

বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে জাপানের পণ্য রপ্তানির পরিমাণ ছিল প্রায় ৭০ হাজার ৮৫০ কোটি ডলার এবং আমদানি ৭২ হাজার ৫৫০ কোটি ডলার। অর্থাৎ জাপানের পণ্য বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ৪৩ হাজার ৪০০ কোটি ডলার। তবে পণ্য বাণিজ্যে ঘাটতি আছে তার।

সেবা খাতেও জাপানের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বেড়েছে। ২০২৫ সালে দেশটির সেবা রপ্তানি ৭ দশমিক ২ শতাংশ বেড়ে ২৪ হাজার ৬১০ কোটি ডলারে পৌঁছায়। একই সময়ে সেবা আমদানি ৭ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়ে দাঁড়ায় ২৬ হাজার ৯২০ কোটি ডলার।

অর্থাৎ ২০২৫ সালে জাপানের মোট আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল প্রায় ১ লাখ ৯৭ হাজার ৯৩০ কোটি ডলার।

জাপান বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ রপ্তানিকারক ও আমদানিকারক দেশ। তবে দেশটির বাজার পুরোপুরি উন্মুক্ত নয়। বিশেষ করে কৃষি খাতে আমদানির ক্ষেত্রে নানা ধরনের অশুল্ক বাধা আছে। বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী ২০২৪ সালে জাপানের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৪৫ শতাংশের জোগান দিয়েছে বৈদেশিক বাণিজ্য।

জাপানের রপ্তানির মূল খাত হচ্ছে গাড়ি ও প্রযুক্তিপণ্য। ২০২৫ সালে দেশটি যত রপ্তানি করেছে, তার ১৪ দশমিক ৩ শতাংশ ছিল মোটরগাড়ি। এ ছাড়া ইলেকট্রনিক সার্কিট, সেমিকন্ডাক্টর তৈরির যন্ত্রপাতি, সোনা, গাড়ির যন্ত্রাংশ ও নানা ধরনের যন্ত্রপাতি রপ্তানি করে দেশটি। অন্যদিকে আমদানির বড় খাত হচ্ছে জ্বালানি ও প্রযুক্তিপণ্য। ২০২৫ সালে জাপান যত পণ্য আমদানি করেছে, তার ৮ দশমিক ৫ শতাংশ ছিল অপরিশোধিত জ্বালানি তেল। এ ছাড়া উল্লেখযোগ্য আমদানি পণ্যের মধ্যে আছে গ্যাস, টেলিফোন, ইলেকট্রনিক সার্কিট, কম্পিউটার ও কয়লা।

জাপানের সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজার যুক্তরাষ্ট্র। ২০২৫ সালে দেশটির মোট রপ্তানির ১৮ দশমিক ৬ শতাংশ গেছে যুক্তরাষ্ট্রে। দ্বিতীয় অবস্থানে আছে চীন, সে দেশে গেছে ১৭ শতাংশ রপ্তানি। এরপর আছে তাইওয়ান, দক্ষিণ কোরিয়া ও হংকং। জাপানের আমদানির সবচেয়ে বড় উৎস চীন। ২০২৫ সালে দেশটির মোট আমদানির ২৩ দশমিক ৬ শতাংশ এসেছে চীন থেকে। এ ছড়া যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, তাইওয়ান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে বিপুল পরিমাণে পণ্য আমদানি করেছে তারা।

যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সঙ্গে সম্পর্ক

যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক জাপানের অর্থনীতির জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্র জাপানের গাড়ি ও শিল্পপণ্যের বড় বাজার। অন্যদিকে চীন যেমন জাপানের জন্য বড় রপ্তানি বাজার, তেমনি শিল্পপণ্য আমদানির উৎস। ফলে জাপানের অর্থনীতি সচল রাখার ক্ষেত্রে এই দুই দেশের সঙ্গে সম্পর্ক বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গেও জাপানের বাণিজ্যিক সম্পর্কের বিশেষ গুরুত্ব আছে। চীনের পর এশিয়ায় ইইউর দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার জাপান। ২০১৯ সালে দুই পক্ষের অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি কার্যকর হয়। এ ছাড়া জাপান আঞ্চলিক সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তিতে (আরসিইপি) যুক্ত হয়েছে। চীন, অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়াসহ এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের কয়েকটি দেশ এই চুক্তির অংশীদার। এই দেশগুলোর সম্মিলিত জিডিপি বিশ্বের মোট জিডিপির প্রায় ৩০ শতাংশ।

জাপানের বাণিজ্যচিত্রে দুটি বিষয় স্পষ্ট। একদিকে গাড়ি ও প্রযুক্তিপণ্য রপ্তানিতে জাপানের অবস্থান শক্তিশালী। অন্যদিকে জ্বালানি ও বিভিন্ন শিল্প-উপকরণের জন্য আমদানির ওপর নির্ভরশীলতা দেশটির বাণিজ্য ভারসাম্যে প্রভাব বিস্তার করছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম, প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদারদের চাহিদা, বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থার পরিবর্তন—সবই জাপানের অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ।