বিনিয়োগ বাড়াতে শুল্ক কমানোর পরামর্শ বিশ্বব্যাংকের, অর্থনীতিবিদেরা বললেন, তাড়াহুড়া নয়
এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতি হিসেবে বাংলাদেশ শুল্কহার কমালে সরকারের রাজস্ব আয় প্রায় এক বিলিয়ন বা ১০০ কোটি ডলার কমতে পারে। তবে শুল্ক সংস্কারের ফলে দেশীয় শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়বে। বিভিন্ন দেশের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্যচুক্তি (এফটিএ) করা সহজ হবে।
রাজস্ব আয় কমলেও দীর্ঘ মেয়াদে লাভ হওয়ার সম্ভাবনা আছে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকেরা। তাঁরা বলেন, প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়লে ও এফটিএ হলে অর্থনীতিতে অতিরিক্ত ৪ বিলিয়ন বা ৪০০ কোটি ডলারের মূল্য সংযোজনের সুযোগ সৃষ্টি হবে। তবে কয়েকজন বিশ্লেষক মনে করেন, বিষয়টি এত সহজ–সরল নয়।
আজ মঙ্গলবার রাজধানীর বনানীতে পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ (পিআরআই) ও বিশ্বব্যাংকের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এক সেমিনারে এসব কথা উঠে আসে। ‘বাংলাদেশের বাণিজ্য নীতির সন্ধিক্ষণ: জাতীয় শুল্কনীতি, এলডিসি উত্তরণ ও আগামী প্রজন্মের বাণিজ্যচুক্তির প্রেক্ষাপট’ শীর্ষক সেমিনারটি পিআরআই কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত হয়।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিশ্বব্যাংকের অর্থনীতিবিদ নোরা ডিহেল। এতে বলা হয়, বাংলাদেশে গড় নামমাত্র (নমিনাল) শুল্কহার ১৫ শতাংশ। তবে সম্পূরক শুল্ক ও নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্কসহ মোট শুল্কহার ২২ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়। এসব শুল্ক কমালে স্বল্প মেয়াদে সরকারের রাজস্ব আয় কমতে পারে। তবে দীর্ঘ মেয়াদে এর সুফল পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
আলোচনায় অংশ নিয়ে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ফাহমিদা খাতুন বলেন, মুক্ত বাণিজ্য থেকে ৪০০ কোটি ডলার অতিরিক্ত আয়ের যে সম্ভাবনার কথা বলা হচ্ছে, তা উচ্চাভিলাষী। এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিতে হবে। তৈরি করতে হবে সক্ষমতা।
সানেমের নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান বলেন, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে বর্তমানে বিশ্বজুড়ে সংরক্ষণমূলক বাণিজ্য নীতি জোরদার হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে তাড়াহুড়া করে শুল্ক কমানোর প্রয়োজন নেই। পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে ধাপে ধাপে সংস্কার করতে হবে।
শুল্ক কমানোর ফলে দেশীয় ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, এমন আশঙ্কাও তুলে ধরেন ব্যবসায়ী নেতারা। মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এমসিসিআই) সভাপতি কামরান টি রহমান বলেন, শুল্ক কমানো হলে অনেক ছোট ও মাঝারি কারখানা বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এতে কর্মসংস্থান কমে বেকারত্ব বাড়তে পারে।
পিআরআই চেয়ারম্যান জায়েদি সাত্তার বলেন, বাংলাদেশের মতো দেশের শুল্কহার ৭ শতাংশের মতো হওয়া উচিত। কিন্তু বাস্তবে বিভিন্ন ধরনের শুল্ক মিলিয়ে তা অনেক বেশি। শুল্ক কমানো না হলে দেশের শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়বে না।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক মো. ফজলুল হক বলেন, এলডিসি উত্তরণ ও মুক্ত বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের মধ্যে উদ্বেগ আছে। নতুন বাণিজ্যচুক্তি করার আগে তাঁদের সঙ্গে আলোচনা করা উচিত।
সেমিনারে আলোচকেরা বলেন, শুল্ক সংস্কারের কারণে একদিকে শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়তে পারে, অন্যদিকে হঠাৎ শুল্ক কমালে কিছু দেশীয় শিল্প ক্ষতির মুখে পড়তে পারে। তাই পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে ধাপে ধাপে শুল্কনীতি সংস্কার করা প্রয়োজন।