ওপেক থেকে বেরিয়ে গেল আরব আমিরাত, কী প্রভাব পড়বে তেল–বাণিজ্যে
সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) হঠাৎ করেই তেল রপ্তানিকারক দেশগুলোর জোট ওপেক (ওপেক) থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে—বৈশ্বিক জ্বালানি রাজনীতিতে এটি বড় ঘটনা। ১৯৭১ সালে জাতিরাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশের আগে থেকেই তারা ওপেকের সদস্য ছিল।
উপসাগরীয় তেল রপ্তানিকারক দেশগুলোর এই সংগঠন কয়েক দশক ধরে উৎপাদন বাড়ানো-কমানো এবং সদস্যদের জন্য কোটা নির্ধারণের মাধ্যমে অপরিশোধিত তেলের দাম নিয়ন্ত্রণ করেছে। ১৯৭০-এর দশকের তেলসংকটে ওপেকের ভূমিকার কল্যাণে বৈশ্বিক জ্বালানিনীতি আমূল বদলে যায়।
ওপেকের উৎপাদনে সৌদি আরবের প্রাধান্য থাকলেও অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতার দিক থেকে ইউএই ছিল দ্বিতীয় অবস্থানে। অর্থাৎ বাজারে দাম কমাতে প্রয়োজন হলে উৎপাদন দ্রুত বাড়ানোর সক্ষমতা ছিল তাদের। কিন্তু এ সক্ষমতাই শেষ পর্যন্ত তাদের জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়।
দীর্ঘদিন ধরে ইউএই তাদের অবস্থান পুনর্বিবেচনা করছে, কেননা তারা যে বিনিয়োগ করেছে, সেটা তারা পুরোপুরি কাজে লাগাতে চেয়েছে।
ওপেকের কোটা অনুযায়ী ইউএইকে দৈনিক ৩০–৩৫ লাখ ব্যারেল উৎপাদনের মধ্যে থাকতে হতো। তারা মনে করছিল, এই কোটার কারণে ক্ষতি হচ্ছে। এই সদস্যপদের কারণে তাদের যে ক্ষতি হচ্ছে, তা অসামঞ্জস্যপূর্ণ।
এ সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়টিও তাৎপর্যপূর্ণ। ইরান যুদ্ধ ঘিরে চলমান যে উত্তেজনা এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের অস্থিরতা, তার কারণে ইউএইএর পররাষ্ট্রনীতি নতুন করে চাপের মুখে পড়েছে। এর প্রভাবে ইরানের সঙ্গে সম্পর্কের পাশাপাশি সৌদি আরবের সঙ্গেও টানাপোড়েন বাড়াতে পারে।
ওপেকের জন্যও আরব আমিরাতের এ সিদ্ধান্ত বড় ধাক্কা। এমন এক সময় ইউএই এ সিদ্ধান্ত নিল, যখন জোটের দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতা ও ঐক্য প্রশ্নের মুখে। ইউএই যদি সমুদ্রপথ বা পাইপলাইনের মাধ্যমে তাদের তেল পুরোপুরি বাজারে আনতে পারে, তাহলে তারা দৈনিক ৫০ লাখ ব্যারেল উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করতে পারবে। এর জবাবে সৌদি আরব মূল্যযুদ্ধ শুরু করতে পারে। ইউএইর অর্থনীতি তুলনামূলকভাবে বহুমুখী; তারা সেই ধাক্কা সামাল দিতে পারলেও ওপেকের অপেক্ষাকৃত দুর্বল সদস্যদের জন্য তা কঠিন হবে।
আমিরাতের নীতিনির্ধারকেরা আবুধাবির তেলক্ষেত্র থেকে নতুন পাইপলাইন নির্মাণের পরিকল্পনার কথা বলেছেন, হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে ফুজাইরাহ বন্দরে যাবে এই পাইপলাইন। বর্তমানে একটি পাইপলাইন আছে ঠিক, কিন্তু উৎপাদন বাড়লে বা উপসাগরে ট্যাংকার চলাচলের ব্যয় ও অনিশ্চয়তা স্থায়ী রূপ পেলে আরও সক্ষমতা প্রয়োজন হবে।
এ মুহূর্তে অবশ্য হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে অবরোধের কারণে বিষয়টি তেলের বাজারের জন্য প্রধান বিষয় নয়। তেল, গ্যাস, জ্বালানি, প্লাস্টিক ও খাদ্যের দামে এখনই তার প্রভাব পড়ছে।
বিশ্ববাজারে এখন তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১০ ডলারের কাছাকাছি। তবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে, তেলের দাম আগামী বছরে ৫০ ডলারের কাছাকাছি নেমে আসতে পারে বলেও ধারণা করা হচ্ছে।
১৯৭০-এর দশকে যেমন ছিল, এখন বৈশ্বিক তেলবাজারে ওপেকের প্রভাব তেমন নয়। তখন আন্তর্জাতিক তেল–বাণিজ্যের প্রায় ৮৫ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করত তারা; এখন যা নেমে এসেছে প্রায় ৫০ শতাংশে। একইভাবে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে তেলের গুরুত্বও কমেছে। ওপেকের প্রভাব এখনো আছে, কিন্তু একচেটিয়া নয়; তারা আর আগের মতো বিশ্ববাজার নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না।
পালাবদলের ইঙ্গিত
সাবেক সৌদি তেলমন্ত্রী শেখ ইয়ামানির মন্তব্য এ প্রেক্ষাপটে তাৎপর্যপূর্ণ: পাথর ফুরিয়ে যাওয়ার কারণে প্রস্তরযুগ শেষ হয়নি। তেলের বেলায়ও একই কথা প্রযোজ্য। অর্থাৎ বিশ্ব ধীরে ধীরে বিকল্প জ্বালানির দিকে অগ্রসর হচ্ছে।
এ প্রেক্ষাপটে ইউএইর সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতের জন্য ইঙ্গিত হিসেবেও দেখা যায়। চীনে বিদ্যুতায়নে বড় বিনিয়োগের কারণে ইতিমধ্যে তেলের মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কা কিছুটা সামাল দেওয়া গেছে। হিসাব অনুযায়ী, দেশটির যানবাহন ও রেলব্যবস্থার বিদ্যুতায়নের কারণে দৈনিক তেলের চাহিদা প্রায় ১০ লাখ ব্যারেল কমেছে। বিশ্বজুড়ে এই প্রবণতা বাড়লে তেলের চাহিদা একসময় স্থিতিশীল হতে পারে।
এ বাস্তবতায় তেলের মজুত থেকে আয় বাড়িয়ে নেওয়ার কৌশল অনেকেই যুক্তিযুক্ত মনে করছেন। ইউএইর শক্তিশালী আর্থিক ভিত্তি ও বহুমুখী অর্থনীতি এই কৌশলের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
উপসাগরীয় অঞ্চলের সংঘাত কবে শেষ হবে এবং তারপর কী পরিস্থিতি তৈরি হবে, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন। তবে ইউএইর এ সিদ্ধান্ত অন্য দেশগুলোকেও একই পথে হাঁটতে উৎসাহিত করতে পারে। এতে সৌদি আরবের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হবে।
হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল আবার স্বাভাবিক হলে কিংবা নতুন পাইপলাইন নির্মাণে গতি এলে ওপেকের বাধ্যবাধকতা ছাড়াই ইউএইর তেল উৎপাদন ও সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।
বর্তমান সংকটে এর তাৎক্ষণিক প্রভাব সীমিত ঠিক, কিন্তু পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে এ সিদ্ধান্ত বৈশ্বিক তেলবাজারের শক্তির ভারসাম্যই বদলে দিতে পারে।