সম্ভাব্যতা যাচাই না করেই শ্রীলঙ্কা অনেক বড় বড় প্রকল্প হাতে নিয়েছিল, কিন্তু সেগুলো থেকে এখন কাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক ফল মিলছে না।

সবচেয়ে বড় কথা হলো, সম্ভাব্যতা যাচাই না করেই শ্রীলঙ্কা অনেক বড় বড় প্রকল্প হাতে নিয়েছিল, কিন্তু সেগুলো থেকে এখন কাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক ফল মিলছে না। আবার সার্বভৌম ঋণের অর্থ দিয়ে এসব প্রকল্প করার কারণেও বিপদ বেড়েছে। কারণ, এতে দেশটির মোট বিদেশি ঋণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৫৯ কোটি ডলার। এ ধরনের ঋণের শর্ত অনেক কঠিন, পরিশোধের মেয়াদও খুব কম। ফলে অনেক ঋণ পরিশোধের সময় হয়ে গেছে, কিন্তু দেশটির হাতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ খুব কম থাকার কারণে দেশটির পক্ষে ঋণ পরিশোধ করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে গত মে মাসে আনুষ্ঠানিকভাবে ঋণখেলাপি হয়ে পড়েছে দেশটি। এতে তাদের আন্তর্জাতিক ঋণমান কমে গেছে।

তা ছাড়া কর ছাড় ঘোষণার কারণেও প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজপক্ষের সমালোচনা করেছিলেন অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞরা। ২০১৯ সালে গোতাবায়ার ঘোষিত ওই নীতির কারণেই সরকারের ১৪০ কোটি ডলারের সমপরিমাণ আর্থিক ক্ষতি হয়, যদিও এতে দেশটির ধনীরা উপকৃত হয়েছিলেন। এ ছাড়া হঠাৎ করে জৈব কৃষি করতে গিয়েও বিপাকে পড়ে দ্বীপদেশটি। এতে তাদের কৃষি উৎপাদন অনেকটাই কমে যায়।

কারা কী সহায়তা করল

কয়েক মাস ধরে চরম আর্থিক সংকটের মধ্যে আছে শ্রীলঙ্কা। একই সময়ে বিক্ষোভের সূত্রপাত। এর জেরে দেশটির সাবেক প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপক্ষে দেশত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন। এই পরিস্থিতিতে ৩৮০ কোটি ডলার ঋণ দিয়েছে প্রতিবেশী ভারত। শ্রীলঙ্কা যখন জ্বালানির অভাবে ধুঁকছিল, তখন তাদের জ্বালানি তেল দিয়েও ভারত সহায়তা করেছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্প্রতি এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘ভারত হলো শ্রীলঙ্কার নিকটতম পড়শিদেশ। আমাদের দুই দেশের নাগরিকদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ যোগ রয়েছে।’

তবে শ্রীলঙ্কার সংকট নিয়ে এত এত আলোচনার মধ্যে চীন নিশ্চুপ। পশ্চিমাদের অভিযোগ, চীন থেকে অব্যাহতভাবে ঋণ নেওয়ার কারণেই শ্রীলঙ্কা ঋণের ফাঁদে আটকে পড়েছে, যদিও শ্রীলঙ্কার বৈদেশিক ঋণের মাত্র ১০ শতাংশ চীনের ঋণ। তাই মুখে কুলুপ এঁটে থাকা চীনকে নিয়ে আলোচনা বেশি। দ্য হিন্দুর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কঠিন অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকটের সময় শ্রীলঙ্কাকে আর্থিক সহায়তার কথা বিবেচনা করছে কি না, সে বিষয়ে মন্তব্য করতেও অস্বীকৃতি জানিয়েছে চীন। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞরা এ অবস্থাকে ‘ওয়েট অ্যান্ড সি’ হিসেবে বর্ণনা করে থাকেন।

চীনা ঋণের ফাঁদ কতটা সত্য

এদিকে এশিয়া ও আফ্রিকার বেশ কয়েকটি উন্নয়নশীল দেশে সাম্প্রতিক ঋণ সমস্যার জন্য পশ্চিমা বিশ্বকে দায়ী করেছে চীন। ডেবট জাস্টিস গ্রুপের নতুন এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বের ৪৯টি দেশের ৬৯৬ বিলিয়ন বা ৬৯ হাজার ৬০০ কোটি ডলার ঋণের মধ্যে মাত্র ১২ শতাংশ চীন থেকে নেওয়া। শ্রীলঙ্কার ক্ষেত্রেও তা মাত্র ১০ শতাংশ। কলম্বোভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ভেরিট রিসার্চের এক হিসাবে দেখা গেছে, চীনা ঋণের গড় সুদহার ৩ দশমিক ৩, যেখানে জাপানের ঋণের গড় সুদহার শূন্য দশমিক ৭। আর চীনা ঋণের মেয়াদ যেখানে ১৮ বছর, সেখানে তা ভারতের ক্ষেত্রে ২৪ ও জাপানের বেলায় ৩৪ বছর। তবে সুবিধা হচ্ছে, চীনা ঋণে শর্ত নেই বললেই চলে।

আইএমএফের ঋণ

এদিকে ঋণদাতাদের জন্য বর্ধিত তহবিল সুবিধার (ইএফএফ) মাধ্যমে কমপক্ষে ৩০০ কোটি ডলারের বেইল আউট, তথা পুনরুদ্ধার কর্মসূচির জন্য এখন আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সঙ্গে আলোচনা করছে শ্রীলঙ্কা। কিন্তু আইএমএফ বিনা শর্তে ঋণ দেয় না। ঋণ পেতে হলে শ্রীলঙ্কাকে বড় ধরনের অর্থনৈতিক সংস্কার করতে হবে বলে সংস্থাটি জানিয়ে দিয়েছে। সূত্র: বিবিসি, দ্য হিন্দু

বিশ্ববাণিজ্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন