ট্রাম্পের পাল্টা শুল্ক উপেক্ষা করে ১ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়াল চীনের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত

চীনের সাংহাইয়ের ইয়াংশ্যাম বন্দরে।ফাইল ছবি: রয়টার্স

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পাল্টা শুল্ক ও বাণিজ্য নীতির কারণে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অস্থিরতাও চীনকে দমাতে পারেনি। বিদায়ী বছর তারা রেকর্ড পরিমাণ পণ্য ও সেবা রপ্তানি করেছে, এমনটাই জানিয়েছে দেশটি।

গত বুধবার বেইজিং জানায়, দেশটির ইতিহাসের সর্বোচ্চ ১ দশমিক ১৯ ট্রিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত হয়েছে। অর্থাৎ রপ্তানি ও আমদানির মধ্যে পার্থক্য বা বার্ষিক বাণিজ্য উদ্বৃত্ত প্রথমবারের মতো ১ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে, যা ২০২৪ সালে রেকর্ড ৯৯৩ বিলিয়ন ডলারকে ছাড়িয়ে গেছে।

গত বছর চীনের মাসিক রপ্তানি উদ্বৃত্ত ৭ বার ১০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি ছিল। তার মানে হচ্ছে, ট্রাম্পের পাল্টা শুল্ক সামগ্রিকভাবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে চীনের বাণিজ্যে খুব বেশি পড়েনি। তবে উচ্চ শুল্কের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীনের বাণিজ্য দুর্বল হয়েছে। যদিও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকায় রপ্তানি বৃদ্ধির মাধ্যমে সেই ঘাটতি পুষিয়ে নিয়েছে দেশটি।

চীনের কাস্টমসের উপপরিচালক ওয়াং জুন গত বুধবার এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, বৈশ্বিক বাণিজ্যে বড় পরিবর্তন ও বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও এই পরিসংখ্যান অসাধারণ ও কষ্টার্জিত। পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-সম্পর্কিত পণ্য এবং রোবোটিকস রপ্তানি বৃদ্ধির কথাও উল্লেখ করেন তিনি।

বিপুল বাণিজ্য উদ্বৃত্তের পেছনে রয়েছে চীনা পণ্যের প্রতি বৈদেশিক চাহিদা বৃদ্ধি। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপের দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য বৃদ্ধি। একই সঙ্গে দেশটির অভ্যন্তরীণ বাজার দুর্বল হওয়ার কারণে প্রভাব পড়েছে।

আবাসন খাতের সংকট ও বাড়তে থাকা ঋণের চাপে চীনের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগে অনীহা দেখাচ্ছেন। ভোক্তারাও খরচে বেশ সতর্ক। এর ফলে পণ্য আমদানির হার কমে গেছে। নতুন পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত বছর দেশটির আমদানি বেড়েছে মাত্র দশমিক ৫ শতাংশ।

এ ছাড়া চীনা মুদ্রা ইউয়ানের দুর্বল হওয়া, শক্তিশালী পণ্যের সরবরাহ এবং পশ্চিমা দেশে মুদ্রাস্ফীতি চীনা রপ্তানিকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে।

হিনরিখ ফাউন্ডেশনের বাণিজ্য নীতি বিশ্লেষক ডেবোরা এলমস বলেন, বাণিজ্যে উদ্বৃত্ত বেইজিংয়ের জন্য একধরনের মিশ্র আশীর্বাদ। বিদেশে ব্যবসা বাড়ায় চীন পণ্য বিক্রি ও কর্মসংস্থান থেকে লাভবান হয়েছে। একই সঙ্গে প্রতিযোগিতার চাপে থাকা বিদেশি বাজারগুলোতে চীনা পণ্যের ওপর নজরদারি আরও বাড়তে পারে। তাঁর মতে, চলতি ২০২৬ সালেও চীনের সাফল্য অব্যাহত থাকতে পারে। তার কারণ চীনা পণ্য ও সেবা বৈশ্বিক ব্যবসার সঙ্গে আরও গভীরভাবে যুক্ত হয়ে পড়ছে।

চীনের রপ্তানি বৃদ্ধি ও বাণিজ্যে উদ্বৃত্তের পরিসংখ্যান প্রমাণ করে যুক্তরাষ্ট্র ছাড়াও বিশ্বজুড়ে চীনের ক্রেতা রয়েছে। তবে চীন একটি অনিশ্চিত বহির্বিশ্বের পরিবেশের মুখোমুখি রয়েছে, সেটিও সতর্ক করেছেন চীনের কাস্টমসের উপপরিচালক ওয়াং জুন।

ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটি দেশ অভিযোগ তুলেছে, তাদের বাজার কম দামের চীনা পণ্যে সয়লাব হয়ে যাচ্ছে। যেগুলোর সঙ্গে তারা প্রতিযোগিতা করতে পারছে না। এদিকে ট্রাম্প প্রশাসনের অস্থিরতা ও শুল্ক উত্তেজনা আরও এক বছর থাকতে পারে এমন আশঙ্কায় প্রস্তুতি নিচ্ছেন চীনা ব্যবসায়ীরা।

গত বছরের এপ্রিল মাসে ট্রাম্প ৯০টির বেশি দেশের পণ্যের ওপর ব্যাপক শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়ে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অস্থিরতা সৃষ্টি করেন। এর মধ্যে সবচেয়ে কঠোর শুল্ক আরোপ করা হয় চীনের ওপর। তার কারণ যুক্তরাষ্ট্রে সবচেয়ে বেশি রপ্তানি করে থাকে চীন। বাংলাদেশি পণ্যের ওপরও পাল্টা শুল্ক বসে।

যুক্তরাষ্ট্র ও চীন—বিশ্বের দুই বৃহত্তম অর্থনীতির মধ্যে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য ও হুমকির মধ্য দিয়ে শতভাগের বেশি শুল্ক আরোপের শঙ্কা তৈরি হয়। সে সময় বাণিজ্য বিশেষজ্ঞরা এটিকে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের ওপর চীনের নির্ভরতার এক পরীক্ষা হিসেবে দেখেছিলেন। যদিও বেইজিং দাবি করেছিল, যুক্তরাষ্ট্র তাদের অনেক বাজারের মধ্যে মাত্র একটি।

গত অক্টোবরে দক্ষিণ কোরিয়ায় ট্রাম্প ও চীনের নেতা শি জিনপিংয়ের বৈঠকের পর উভয় পক্ষ উত্তেজনা সাময়িকভাবে কিছুটা হলেও কমেছে। এতে দুই দেশের মধ্যকার বাণিজ্য সম্পর্কের সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ার মতো সংকট এড়ানো গেছে। তবে কিছু পণ্যে তুলনামূলকভাবে মাঝারি শুল্ক এখনো বহাল, যা যুক্তরাষ্ট্রে চীনের রপ্তানিকে উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দিয়েছে।