পাকিস্তানে চা পান যখন বিলাসিতা হয়ে দাঁড়ায়
এমন কোন একটি বিষয় যা পাকিস্তানে সবাই খুব পছন্দ করে? উত্তর হলো সকালের এক কাপ চা। তবে কেবল এক কাপেই সবাই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখতে পারেন, তেমন ইচ্ছাশক্তি হয়তো অনেকেরই নেই। পুরো দিন সতেজ থাকতে তাদের দরকার চিনি আর ক্যাফেইনের অনুপ্রেরণা।
তাই এক দশকে চায়ের দাম তিন গুণ বেড়ে যাওয়া—যেমন হিসাব পাকিস্তান পরিসংখ্যান ব্যুরো দিচ্ছে—বেশির ভাগ মানুষের কাছে খুব একটা স্বস্তির ব্যাপার নয়। চায়ের এ দাম তাদের পকেটের ওপর বেশ ভালোই চাপ ফেলছে। পাকিস্তানের অন্যতম প্রভাবশালী সংবাদপত্র ডনে প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে এমনটা বলা হয়েছে।
পাকিস্তানে এখন মোটামুটি মানের এক কাপ চায়ের দাম পড়ছে ৫০ রুপি। একজন মানুষ যদি প্রতিদিন তিন কাপ চা পান করেন, তাহলে প্রতি মাসে তাকে শুধু চায়ের জন্যই খরচ করতে হয় সাড়ে চার হাজার রুপি। যে দেশে মানুষের গড় আয় মাসে ১৫ হাজার রুপি, সেখানে চা পানের জন্য একজনকে খরচ করতে হচ্ছে আয়ের ৩০ শতাংশ।
পাকিস্তান হলো পৃথিবীর সবচেয়ে বড় চা আমদানিকারক দেশ। প্রতিবছর এ খাতে তাদের আমদানি খরচ কমবেশি ৫০ কোটি মার্কিন ডলার। একটা হিসাব দেওয়া যাক—পাকিস্তানের সবাই যদি দুই বছরের জন্য চা পান করা বাদ দেয়, তাহলে যে অর্থ বাঁচবে তা আইএমএফের ঋণের সর্বশেষ কিস্তির মোটামুটি সমান হবে।
অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে ২০১৯ সালে পাকিস্তান আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের কাছ থেকে ৬৫০ কোটি ডলার ঋণ নেওয়ার জন্য একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল। কিন্তু ওই ঋণের সর্বশেষ কিস্তির ১১০ কোটি ডলার স্থগিত হয়ে রয়েছে। এই অর্থ ছাড় করাতে পাকিস্তান এখন মরিয়া হয়ে চেষ্টা চালাচ্ছে, কিন্তু আইএমএফ টাকা দিতে এখনো রাজি হয়নি।
ডনের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, অর্থ ধার করে চা আমদানি করার চেয়ে কৃষিনির্ভর পাকিস্তানের উচিত নিজস্ব উৎপাদনের দিকে নজর দেওয়া। একসময় পাকিস্তান চা উৎপাদন ও রপ্তানি করত। কিন্তু তা ১৯৭১ সালে পাকিস্তান ভেঙে যাওয়ার আগের কথা। ওই বছরে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়। আর এর পর থেকে ক্যাফেইনের আসক্তি মেটাতে পাকিস্তানকে নির্ভর করতে হয় চা আমদানির ওপর।
পাকিস্তানের স্থানীয় চাষিরা অবশ্য চা চাষে খুব একটা আগ্রহী নন। যদিও দেশটিতে চা চাষের জন্য উপযুক্ত জমি রয়েছে, আর রয়েছে চায়ের বিপুল চাহিদা। অনাগ্রহের একটি কারণ, চা চাষের জন্য প্রাথমিকভাবে বেশ বড় পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করতে হয়। তবে অন্য আরেকটি প্রধান কারণ হলো, চা-গাছ রোপণের পর দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়।
চা-গাছ রোপণ করে কমপক্ষে পাঁচ থেকে ছয় বছর অপেক্ষা করতে হয়। এরপরই কেবল চা-পাতা তোলা যায়, যে পাতা চা তৈরিতে ব্যবহার করা যেতে পারে।
পাকিস্তানে বেশির ভাগ চা-পাতা আমদানি করা হয় কেনিয়া থেকে। এরপর আমদানি করা চা-পাতা ব্লেন্ড করে বানানো হয় বিভিন্ন স্বাদ ও তেজের চা। বাকিটা বিপণনের ব্যাপার।
দেশটিতে এখন রুপির দাম পড়ছে আর মূল্যস্ফীতি বাড়ছে। দাম বাড়ছে দুধের, ক্রিমের আর চিনির। ফলে প্রতিদিন সকালের চা আরও বেশি দামি হয়ে উঠছে। ফলে আরও কমসংখ্যক মানুষ এমন একটি বিলাসিতা করার সক্ষমতা ধরে রাখতে পারছেন।