তেলের গল্প ২
যেভাবে দুই বিশ্ব তেলযুদ্ধ বদলে দিল বিশ্বের মানচিত্র
পৃথিবীর আধুনিক ইতিহাসের অনেক বড় মোড় ঘুরেছে তেলকে ঘিরে। মাটির নিচের কালো এই তরল শুধু জ্বালানি নয়; এটি শক্তি, অর্থনীতি, সাম্রাজ্য আর যুদ্ধের গল্পও। প্রথম বাণিজ্যিক কূপ খনন থেকে জন ডি রকফেলারের উত্থান, বাকুর তেলজ্বর, দুই বিশ্বযুদ্ধে জ্বালানির লড়াই, মধ্যপ্রাচ্যে নতুন শক্তির উত্থান, ১৯৫৩ সালের ইরান অভ্যুত্থান, কুয়েতে ইরাকি আগ্রাসন থেকে আজকের ভূরাজনীতি—সবকিছুর কেন্দ্রে আছে তেল। ‘তেলের গল্প’ সিরিজে আমরা দেখব, কীভাবে একটি সম্পদ বদলে দিয়েছে মানচিত্র, ক্ষমতার ভারসাম্য এবং মানুষের জীবন। প্রথম পর্ব ছিল প্রথম তেল আবিষ্কারের গল্প নিয়ে। আজ দ্বিতীয় পর্ব।
প্রথম পর্বে আধুনিক তেলশিল্পের জন্মকথা বলা হয়েছে। পেনসিলভানিয়ায় ১৮৫৯ সালে এডউইন ড্রেকের কূপ থেকে বাণিজ্যিকভাবে তেল ওঠার পর শুরু হয় তেল–উন্মাদনা। এরপর জন ডি. রকফেলার স্ট্যান্ডার্ড অয়েলের মাধ্যমে তেলশিল্পকে সংগঠিত করলেও একচেটিয়া আধিপত্য গড়ে তোলেন। শেষে আইডা টারবেলের অনুসন্ধান ও অ্যান্টিট্রাস্ট আইনের মাধ্যমে সেই সাম্রাজ্য ভেঙে যায়।
রুশ তেলশিল্পের উত্থান
উনিশ শতকের শেষভাগ ছিল বড় ধরনের রদবদলের সময়। অনেক বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের তেলক্ষেত্রই এই শিল্পের প্রধান শক্তি ছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে কাস্পিয়ান সাগরঘেঁষা বাকু অঞ্চল নতুন প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে উঠে আসে। এর ফলে তেলের বিশ্ব মানচিত্রে শক্তির ভারসাম্য বদলাতে শুরু করে। এই পরিবর্তনের পেছনে ছিল নতুন প্রযুক্তি, বড় পুঁজি এবং কয়েকজন দূরদর্শী শিল্পপতির ঝুঁকি নেওয়ার সাহস।
বাকুর তেলশিল্পের শুরুর ইতিহাস কিন্তু পুরোনো। ১৮৪৬ সালে বিবি-হেইবাত এলাকায় একটি কূপ থেকে শিল্পভিত্তিকভাবে তেল তোলার কথা ইতিহাসে পাওয়া যায়। পরে ১৮৫৯ সালে সেখানে প্রথম শোধনাগার গড়ে ওঠে। ১৮৬০-এর দশকে কেরোসিন উৎপাদনও বাড়তে থাকে। অর্থাৎ আগেই বাকুতে তেল উত্তোলন ও শোধনের একটি ভিত্তি তৈরি হয়ে গিয়েছিল। তবে সেটি ছিল বেশির ভাগই অগোছালো, পুরোনো পদ্ধতির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা একটি শিল্প।
বড় পরিবর্তন আসে ১৮৭২ সালে। ওই বছর রুশ সাম্রাজ্য তেলসমৃদ্ধ জমি ব্যক্তি খাতে নিলামে ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এতে বড় পুঁজি ঢোকার পথ খুলে যায়। বিদেশি উদ্যোক্তাদের জন্যও সুযোগ তৈরি হয়। ঠিক এই সময়েই বাকুর তেল ব্যবসায় প্রবেশ করেন সুইডিশ বংশোদ্ভূত নোবেল ভ্রাতৃদ্বয়, রবার্ট হিয়ালমার নোবেল ও লুডভিগ ইমানুয়েল নোবেল। রবার্ট প্রথমে অন্য ব্যবসায়িক কাজে ককেশাস অঞ্চলে গিয়েছিলেন। কিন্তু বাকুর তেলের সম্ভাবনা দেখে তিনি ভাইকে রাজি করান। পরে তাদের উদ্যোগ থেকেই গড়ে ওঠে ব্রানোবেল বা নোবেল ব্রাদার্স পেট্রোলিয়াম কোম্পানি।
নোবেলদের শক্তি ছিল শুধু পুঁজি নয়, সংগঠন ও প্রযুক্তি। বাকুর পুরোনো, অগোছালো তেলব্যবস্থায় তারা আধুনিক শিল্পপদ্ধতি নিয়ে আসেন। কূপ খনন, শোধন, সংরক্ষণ, পরিবহন, সব জায়গায় তাঁরা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ান। অল্প সময়ের মধ্যেই ব্রানোবেল রুশ সাম্রাজ্যের সবচেয়ে শক্তিশালী তেল গোষ্ঠীগুলোর একটিতে পরিণত হয়। এ কারণেই অনেকেই তাদের ‘রাশিয়ার রকফেলার’বলতেন।
নোবেল ভ্রাতৃদ্বয়ের আরেকটি বড় অবদান ছিল পরিবহন ব্যবস্থায়। শুধু তেল তোলা বা শোধন করলেই চলত না, বাজারে পৌঁছাতে হতো দ্রুত ও সাশ্রয়ী উপায়ে। এই প্রয়োজন থেকেই পাইপলাইন, মজুতের ব্যবস্থা এবং ট্যাংকার পরিবহনে নতুনত্ব আসে। কাস্পিয়ান অঞ্চলে তেল পরিবহনের আধুনিক পদ্ধতি গড়ে তুলতে নোবেলদের বড় ভূমিকা ছিল। এর ফলে বাকুর তেল শুধু স্থানীয় বাজারে সীমাবদ্ধ থাকেনি, ইউরোপের বৃহত্তর বাজারেও পৌঁছানোর পথ পায়।
১৮৮০ ও ১৮৯০-এর দশকে বাকু এক বিশাল তেলকেন্দ্রে পরিণত হয়। সেখানে বিপুলসংখ্যক কূপ, শোধনাগার ও রপ্তানিনির্ভর ব্যবসা গড়ে ওঠে। এই সময় দ্বিতীয় বড় শক্তি হিসেবে উঠে আসে ফরাসি ব্যাংকিং পরিবার রথসচাইল্ডরা।
ইউরোপের বিখ্যাত রথসচাইল্ড ব্যাংকিং পরিবার ছিল উনিশ ও বিশ শতকের ইউরোপের সবচেয়ে প্রভাবশালী আর্থিক পরিবারগুলোর একটি ছিল। শুধু ধনসম্পদে নয়, সরকারকে ঋণ দেওয়া, রেলপথে বিনিয়োগ, খনি, বাণিজ্য এবং পরে তেলশিল্পে ছিল তাদের বড় ভূমিকা। পরিবারটির উত্থান শুরু হয় জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্টে মেয়ার অ্যামশেল রথসচাইল্ডের হাত ধরে। পরে তাঁর পাঁচ ছেলে লন্ডন, প্যারিস, ভিয়েনা, নেপলস ও ফ্রাঙ্কফুর্টে শাখা গড়ে তোলেন। এভাবে রথসচাইল্ডরা ইউরোপজুড়ে একটি আন্তর্জাতিক আর্থিক নেটওয়ার্ক তৈরি করেন।
তাদের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল সীমান্তপারের অর্থ লেনদেন ও দ্রুত তথ্যপ্রবাহ। সে সময় আধুনিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা পুরোপুরি গড়ে ওঠেনি। রথসচাইল্ডরা নিজেদের পারিবারিক নেটওয়ার্ক, কুরিয়ার ব্যবস্থা এবং বহু দেশে উপস্থিতির কারণে দ্রুত অর্থ জোগাড়, বিনিয়োগ ও স্থানান্তর করতে পারত। ফলে ইউরোপের বহু সরকার যুদ্ধ, অবকাঠামো বা উন্নয়ন প্রকল্পে তাদের সহায়তা নিত। নেপোলিয়নের যুদ্ধ-পরবর্তী সময় থেকে রেলপথ বিস্তার পর্যন্ত বহু বড় অর্থনৈতিক ঘটনায় তাদের নাম জড়িত।
উনিশ শতকের শেষভাগে তারা শুধু ব্যাংকিংয়ে সীমাবদ্ধ থাকেনি। শিল্পবিপ্লবের নতুন খাতে বিনিয়োগ শুরু করে। এই প্রেক্ষাপটে তারা বাকুর তেলশিল্পে প্রবেশ করে এবং কাস্পিয়ান অ্যান্ড ব্ল্যাক সি অয়েল কোম্পানি গঠন করে। তাদের পুঁজি, রপ্তানি নেটওয়ার্ক এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশাধিকার বাকুর তেলকে ইউরোপে ছড়িয়ে দিতে সাহায্য করে।
রথসচাইল্ডরা উৎপাদন ও অর্থায়নে শক্তিশালী হলেও বাজারজাতকরণে আরও বিস্তৃত নেটওয়ার্ক দরকার ছিল। এই জায়গায় লন্ডনের ব্যবসায়ী মার্কাস স্যামুয়েল গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন। আরও দূরে তেল পাঠানো এবং আন্তর্জাতিক বিপণনব্যবস্থা গড়ে তোলার মাধ্যমে তিনি তেল ব্যবসাকে আরও বিশ্বায়িত করতে সাহায্য করেন। এভাবেই বাকুর তেল ধীরে ধীরে ইউরোপ পেরিয়ে এশিয়ার বাজারেও পৌঁছাতে শুরু করে। তেল তখন আর শুধু একটি আঞ্চলিক পণ্য নয়; এটি হয়ে উঠছিল বৈশ্বিক বাণিজ্যের কেন্দ্রীয় শক্তি। যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, ইউরোপীয় পুঁজি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক নেটওয়ার্ক—সব মিলিয়ে বিশ্ব তেলশিল্পের নতুন যুগ শুরু হচ্ছিল। এই যুগে প্রতিযোগিতা শুধু কূপের দখল নিয়ে ছিল না; ছিল শোধনাগার, পরিবহনপথ ও বাজারের নিয়ন্ত্রণ নিয়েও।
তবে এই শক্তিশালী তেল গোষ্ঠীরও শেষ ছিল। ১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লবের পর সাম্রাজ্য বিস্তারের অর্থনৈতিক কাঠামো ভেঙে যেতে থাকে। পরে সোভিয়েত ইউনিয়নে তেলশিল্প জাতীয়করণ করা হলে ব্রানোবেলের যুগও কার্যত শেষ হয়ে যায়। নোবেল পুরস্কারের জনক আলফ্রেড নোবেল ছিলেন এই পরিবারেরই আরেক ভাই। ফলে নোবেল নামটি শুধু বিজ্ঞান ও শান্তির পুরস্কারের ইতিহাসে নয়, বিশ্ব তেলশিল্পের উত্থানের ইতিহাসেও গভীরভাবে জড়িয়ে আছে।
মার্কাস স্যামুয়েল ও শেলের জন্ম
মার্কাস স্যামুয়েল ছিলেন লন্ডনের ইস্ট এন্ডের এক ইহুদি ব্যবসায়ীর ছেলে। তিনি এশিয়ার পারিবারিক ব্যবসাকে ধীরে ধীরে বিশ্বজুড়ে তেল ব্যবসায় রূপ দেন। জন ডি. রকফেলারের স্ট্যান্ডার্ড অয়েলের বিশ্ব প্রভাবকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে তিনি রুশ তেল এশিয়ার বাজারে পাঠানোর পরিকল্পনা করেন।
এ ক্ষেত্রে তিনি কয়েকটি বড় পদক্ষেপ নেন। তিনি বড় সমুদ্রগামী ট্যাংকার তৈরি করান, যেমন মিউরেক্স। এর মাধ্যমে আগের মতো টিনে ভরে নয়, সরাসরি জাহাজে বড় পরিমাণ তেল পরিবহন করা সম্ভব হয়। ১৮৯২ সালে তিনি তাঁর ট্যাংকারকে সুয়েজ খাল দিয়ে চলাচলের অনুমতি আদায় করেন। স্ট্যান্ডার্ড অয়েল নিরাপত্তার অজুহাতে এটি ঠেকাতে চাইলেও সফল হয়নি।
স্ট্যান্ডার্ড অয়েলের নীল কেরোসিনের টিন দূরপ্রাচ্যে খুব জনপ্রিয় ছিল। স্থানীয় লোকজন সেগুলো পরে নানা কাজে ব্যবহার করত। তার জবাবে স্যামুয়েল লাল টিনে তেল বিক্রি শুরু করেন। অল্প সময়ের মধ্যেই সেগুলোও বাজারে পরিচিত হয়ে ওঠে।
পরে তিনি তাঁর কোম্পানির নাম দেন শেল। এই নামটি নেওয়া হয় তাঁর বাবার পুরোনো ঝিনুকের ব্যবসার স্মৃতি থেকে।
অঁরি ডিটার্ডিং ও রয়্যাল ডাচ
যখন স্যামুয়েল শেল গড়ে তুলছিলেন, তখন ডাচ ইস্ট ইন্ডিজের সুমাত্রা এলাকাতেও (ডাচ ইস্ট ইন্ডিজ ছিল নেদারল্যান্ডসের ঔপনিবেশিক শাসনের নাম। সেই উপনিবেশের অন্যতম বড় ও গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল ছিল সুমাত্রা, যা বর্তমান ইন্দোনেশিয়া) আরেকটি প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি উঠে আসছিল। সেটিই ছিল রয়্যাল ডাচ। এর নেতৃত্বে ছিলেন অঁরি ডিটার্ডিং, যিনি প্রবল কর্মশক্তি ও কঠোর ব্যবসায়িক মনোভাবের জন্য পরিচিত ছিলেন।
সুমাত্রার জঙ্গলে রয়্যাল ডাচকে কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে কাজ করতে হয়েছিল। সেখানে আচেহ জনগোষ্ঠীর বিদ্রোহ হয়েছিল, যা পরে ঔপনিবেশিক সরকার দমন করে। একে অনেকে তেলকে কেন্দ্র করে সংঘটিত প্রথম দিকের সংঘর্ষের একটি বলে মনে করেন। ডিটার্ডিং ৩৪ বছর বয়সে ব্যবস্থাপনা পরিচালক হন। তিনি স্ট্যান্ডার্ড অয়েলের নানা কৌশল ঠেকিয়ে স্থানীয় তেল স্বত্ব রক্ষা করতে সক্ষম হন।
বিশ শতকের শুরুতে এসে শেল কিছু সমস্যায় পড়ে। মার্কাস স্যামুয়েল তখন লন্ডনের লর্ড মেয়র হিসেবে ব্যস্ত ছিলেন। টেক্সাসের তেল নিয়ে একটি চুক্তিও ব্যর্থ হয়। এর মধ্যে ১৯০৫ সালের রুশ বিপ্লবে বাকুর তেলক্ষেত্র আগুনে পুড়ে যায়।
এই অবস্থায় স্যামুয়েল বুঝতে পারেন, টিকে থাকতে হলে একীভূত হওয়া ছাড়া উপায় নেই। তিনি অঁরি ডিটার্ডিংয়ের সঙ্গে আলোচনা করেন। কিন্তু আর্থিকভাবে শক্তিশালী অবস্থানে থাকায় ডিটার্ডিং নিজের শর্তে চুক্তি করেন। নতুন কোম্পানিতে ৬০ শতাংশ অংশ পায় রয়্যাল ডাচ, আর ৪০ শতাংশ পায় শেল। এভাবেই গড়ে ওঠে রয়্যাল ডাচ শেল। ১৯০৭ সালকে সাধারণত এই একীভবনের মূল বছর হিসেবে ধরা হয়। পরে এটি বৈশ্বিক শক্তিধর তেল কোম্পানিতে পরিণত হয় এবং স্ট্যান্ডার্ড অয়েলকেও বড় চ্যালেঞ্জ জানায়।
প্রথম বিশ্ব তেলযুদ্ধ
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় তেলের গুরুত্ব আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ট্যাংক, মোটরসাইকেল, বিমান, পরিবহন ট্রাক—সবকিছুতেই তেলচালিত প্রযুক্তি ব্যবহৃত হতে থাকে। এর ফলে যুদ্ধক্ষেত্রে বড় পরিবর্তন আসে।
এই পরিবর্তনের একটি বিখ্যাত প্রতীকী ঘটনা ঘটে ১৯১৪ সালের সেপ্টেম্বরে, প্রথম মার্নের যুদ্ধে। জার্মান বাহিনীর অগ্রযাত্রা ঠেকাতে প্যারিস থেকে ট্যাক্সিতে করে দ্রুত ফরাসি সৈন্য পাঠানো হয়। প্রায় ৬০০ ট্যাক্সিতে কয়েক হাজার সৈন্যকে যুদ্ধক্ষেত্রে নেওয়া হয়েছিল। এতে যুদ্ধ এককভাবে জেতা হয়নি, কিন্তু ঘটনাটি দেখিয়ে দেয় যে মোটরচালিত পরিবহন যুদ্ধ ক্ষেত্রে কত দ্রুত ও কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যেতে পারে। প্যারিসের ট্যাক্সি তাই শুধু একটি সামরিক কাহিনি নয়, যুদ্ধের নতুন যুগেরও প্রতীক।
স্থলযুদ্ধের পাশাপাশি নৌযুদ্ধেও তেলের গুরুত্ব দ্রুত বাড়ে। যুদ্ধের আগেই ব্রিটিশ নৌবাহিনী কয়লার বদলে তেলের দিকে ঝুঁকছিল। কারণ, তেলচালিত জাহাজ বেশি দ্রুত চলে, কম সময়ে জ্বালানি ভরা যায় এবং পরিচালনাও তুলনামূলকভাবে সহজ। যুদ্ধ শুরু হলে এই সিদ্ধান্তের কৌশলগত গুরুত্ব পরিষ্কার হয়ে ওঠে। একইভাবে বিমান চলাচল, সামরিক ট্রাক ও ট্যাংকের ক্ষেত্রেও তেল অপরিহার্য হয়ে পড়ে। এর মানে, যে পক্ষের হাতে বেশি তেল, তার হাতে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার ক্ষমতাও বেশি।
এই জায়গাতেই মিত্রশক্তির বড় সুবিধা ছিল। তারা বিশ্ব তেল উৎপাদনের বড় অংশের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পেরেছিল। গবেষণা বলছে, যুদ্ধকালে মিত্রশক্তির হাতে ছিল বিশ্ব পেট্রোলিয়াম উৎপাদনের ৭০ শতাংশেরও বেশি। ফলে তারা বেশি ট্রাক চালাতে, বেশি জাহাজ সচল রাখতে, বেশি বিমান উড়াতে এবং দীর্ঘ যুদ্ধের চাপ সামলাতে পেরেছে। এসব কারণেই অনেকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধকে ‘দা ফার্স্ট ওয়ার্ল্ড অয়েল ওয়ার’বা তেলের প্রথম বিশ্বযুদ্ধ বলে থাকেন।
শেষ পর্যন্ত মিত্রশক্তির জয়ে বড় ভূমিকা রাখে তাদের তেলশক্তির আধিপত্য। এই জ্বালানি-সরবরাহে বড় ভূমিকা ছিল রয়্যাল ডাচ শেল ও স্ট্যান্ডার্ড অয়েল অব নিউ জার্সির মতো কোম্পানির। শেল ছিল ব্রিটিশ বাহিনীর একটি বড় জ্বালানি-সরবরাহকারী। তাদের ট্যাংকার, শোধনাগার ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নেটওয়ার্ক ব্রিটিশ যুদ্ধ যন্ত্রকে সচল রাখতে সাহায্য করে। অন্যদিকে স্ট্যান্ডার্ড অয়েল অব নিউ জার্সি ছিল মার্কিন তেলশিল্পের অন্যতম প্রধান শক্তি। যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল উৎপাদনক্ষমতা এবং আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থা মিত্রশক্তিকে বড় সুবিধা দেয়।
মার্কাস স্যামুয়েল যুদ্ধকালীন অবদানের জন্য নাইট উপাধি পান। পরে তিনি লর্ড বেয়ারস্টেড হন। ১৯২৭ সালে তাঁর মৃত্যু হয়। অঁরি ডিটার্ডিং রয়্যাল ডাচ শেলকে আরও বড় করেন এবং রকফেলারের পর সবচেয়ে শক্তিশালী তেল ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিতি পান। তবে জীবনের শেষ সময়ে তিনি হিটলারের সমর্থক হয়ে ওঠেন। ১৯৩৯ সালে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরুর ঠিক আগে, তাঁর মৃত্যু হয়।
সব মিলিয়ে, এই ব্যবসায়ী ও তাদের প্রতিষ্ঠানগুলোই আধুনিক তেলশিল্পের ভিত্তি গড়ে দেয়। একই সঙ্গে তারা বিশ শতকের বৈশ্বিক রাজনীতি ও অর্থনীতির কৌশলগত কাঠামোও তৈরি করে দেয়।
তেলের নতুন লড়াইয়ে এবার মধ্যপ্রাচ্য
১৯০৮ সালে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন অধ্যায় শুরু হয়। জর্জ রেনল্ডস পারস্যে, অর্থাৎ বর্তমান ইরানে, প্রথম বড় তেল আবিষ্কারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। এই আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে উঠে আসে অ্যাংলো-পার্সিয়ান কোম্পানি, যা পরে ব্রিটিশ পেট্রোলিয়াম (বিপি) নামে পরিচিত হয়।
তবে শুরুতে কোম্পানিটি আর্থিক সংকটে পড়ে এবং শেলের প্রতিযোগিতার মুখে পড়ে। তখন ব্যবস্থাপনা পরিচালক চার্লস গ্রিনওয়ে ব্রিটিশ সরকারের সমর্থন চান। ১৯১১ সালে উইনস্টন চার্চিল সিদ্ধান্ত নেন, ব্রিটিশ নৌবাহিনীকে কয়লা থেকে তেলে রূপান্তর করা হবে; কারণ, তেলচালিত জাহাজ দ্রুতগতির। নিরাপদ ও ব্রিটিশ-নিয়ন্ত্রিত তেল সরবরাহ নিশ্চিত করতে ১৯১৪ সালে ব্রিটিশ সরকার অ্যাংলো-পার্সিয়ানে নিয়ন্ত্রণমূলক অংশ নেয়; সাধারণভাবে ৫১ শতাংশ শেয়ার কেনার কথাই বেশি বলা হয়।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্ব তেলশিল্প এক নতুন মোড়ে এসে দাঁড়ায়। যুদ্ধ দেখিয়ে দিয়েছিল, তেল আর শুধু আলো জ্বালানোর জ্বালানি নয়; এটি আধুনিক যুদ্ধ, শিল্প, পরিবহন ও রাষ্ট্রশক্তির কেন্দ্রীয় উপাদান। যুদ্ধ শেষের পৃথিবীতে তাই তেলকে ঘিরে প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হয়ে ওঠে। প্রশ্ন ছিল শুধু কোথায় তেল আছে, তা নয়; বরং কে সেই তেলের অধিকার পাবে, কে বাজার নিয়ন্ত্রণ করবে, আর কে ভবিষ্যতের জ্বালানিশক্তির মালিক হবে। এই নতুন অধ্যায়ের কেন্দ্রে উঠে আসেন দুই ভিন্ন চরিত্রের মানুষ, কালুস্তে গুলবেনকিয়ান ও ওয়াল্টার টিগল। একজন নিভৃতচারী, হিসেবি, দর–কষাকষিতে সিদ্ধহস্ত; অন্যজন করপোরেট আমেরিকার প্রবল, আত্মবিশ্বাসী তেলসম্রাট।
কালুস্তে গুলবেনকিয়ানের হাতে ছিল মধ্যপ্রাচ্যের সম্ভাব্য তেলের দরজা খোলার চাবি। আর্মেনীয় বংশোদ্ভূত এই ব্যবসায়ী অটোমান সাম্রাজ্যের আমল থেকেই মেসোপটেমিয়ার তেল সম্ভাবনা নিয়ে আগ্রহী ছিলেন। তিনি নিজে সেখানে না গেলেও ভ্রমণবিষয়ক বই, প্রকৌশলীদের তথ্য এবং অটোমান দরবারের সঙ্গে সম্পর্ক কাজে লাগিয়ে বুঝেছিলেন ওই অঞ্চলে এক দিন বড় তেল পাওয়া যাবে। সেই বিশ্বাস থেকেই তিনি তুর্কি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ গড়ে তোলেন এবং শেষ পর্যন্ত ১৯১২ সালে টার্কিশ পেট্রোলিয়াম কোম্পানি গঠনে প্রধান ভূমিকা নেন। তাঁর বড় কৃতিত্ব ছিল প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিগুলোকে একসঙ্গে আনা। ব্রিটিশ, জার্মান ও অন্য গোষ্ঠীগুলো একে অন্যের বিরুদ্ধে লড়ছিল। গুলবেনকিয়ান বুঝেছিলেন, তেল ব্যবসায় বড় কেকের ছোট অংশ অনেক সময় বড় অংশের চেয়ে লাভজনক। শেষ পর্যন্ত তিনি নিজের জন্য ৫ শতাংশ অংশ রেখে দেন। এ কারণেই তাঁর নাম হয় ‘মিস্টার ফাইভ পারসেন্ট’।
যুদ্ধ শেষের পৃথিবীতে আমেরিকার শক্তিও দ্রুত বাড়ছিল। স্ট্যান্ডার্ড অয়েল অব নিউ জার্সির প্রধান ওয়াল্টার টিগল যুদ্ধের অভিজ্ঞতা থেকে বুঝেছিলেন, তেল এখন জাতীয় শক্তির বিষয়। তেল ছাড়া শিল্প, পরিবহন, কৃষি—কিছুই ঠিকমতো এগোবে না। যুক্তরাষ্ট্রে গাড়ির ব্যবহার দ্রুত বাড়ছিল, সড়ক তৈরি হচ্ছিল, পেট্রলের চাহিদা লাফিয়ে বাড়ছিল। ফলে নতুন তেলের উৎস খুঁজে বের করা জরুরি হয়ে পড়ে। টিগল ১৯২০ সালে নতুন নীতি নেন যে পৃথিবীর যেখানেই তেলক্ষেত্র থাকুক, স্ট্যান্ডার্ড অয়েল সেখানে আগ্রহী হবে। তাঁর নজর ছিল টেক্সাস, ভেনেজুয়েলা, রাশিয়া, ইস্ট ইন্ডিজ এবং বিশেষ করে ইরাকের দিকে। কিন্তু ইরাকের দরজা তখনও আটকে ছিল গুলবেনকিয়ানের হাতে।
টিগল ছিলেন বিশ শতকের সংগঠিত করপোরেট শক্তির প্রতিনিধি। আর গুলবেনকিয়ান ছিলেন পুরোনো ধরনের আন্তর্জাতিক উদ্যোক্তা, যিনি ব্যক্তিগত যোগাযোগ, দরবারি কূটকৌশল ও ধৈর্য ধরে আলোচনার মাধ্যমে নিজের অবস্থান তৈরি করেছিলেন। টিগল ভেবেছিলেন, দ্রুত চুক্তি করে ফেলবেন। কিন্তু গুলবেনকিয়ান ছিলেন অনমনীয়। তিনি চান অটোমান সাম্রাজ্যের পুরোনো সীমানার ভেতর তেল নিয়ে যেকোনো উদ্যোগে সবাইকে একসঙ্গে যেতে হবে। ছয় বছরের দীর্ঘ আলোচনার পর অবশেষে ১৯২৮ সালে তাঁর শর্তেই চুক্তি হয়। তিনি একটি লাল পেনসিল দিয়ে পুরোনো অটোমান সাম্রাজ্যের সীমানার চারপাশে দাগ টেনে দেন। সেখান থেকেই জন্ম নেয় বিখ্যাত ‘রেড লাইন’ চুক্তি। ইরান ও কুয়েত বাদে মধ্যপ্রাচ্যের বিস্তৃত অঞ্চল এই চুক্তির আওতায় পড়ে। এর ভেতরে যে তেল পাওয়া যাবে, তা অংশীদারদের মধ্যে ভাগ হবে, আর গুলবেনকিয়ান নেবেন তাঁর ৫ শতাংশ।
এই চুক্তি আরও দৃঢ় হয় ১৯২৭ সালে, যখন ইরাকের কিরকুক এলাকায় বড় তেল পাওয়া যায়। সেটি ছিল আরব মধ্যপ্রাচ্যের প্রথম বড় তেল আবিষ্কারগুলোর একটি। প্রতিদিন প্রায় ৯০ হাজার ব্যারেল তেল উঠতে শুরু করে। এতে স্পষ্ট হয়ে যায়, মধ্যপ্রাচ্য ভবিষ্যতের বিশ্ব তেলশিল্পে কেন্দ্রীয় অঞ্চল হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু এই সময়ই আরেকটি বড় পরিবর্তন শুরু হচ্ছিল। এত দিন আশঙ্কা ছিল, তেলের ঘাটতি দেখা দেবে। হঠাৎ দেখা গেল, সমস্যা উল্টো। তেল এত বেশি হয়ে গেছে যে বাজার তা সামলাতে পারছে না। যুক্তরাষ্ট্রে নতুন নতুন কূপ মিলছে, তেল শহর রাতারাতি গড়ে উঠছে, মোটরগাড়ির উন্মাদনায় পেট্রলের চাহিদা বাড়ছে ঠিকই, কিন্তু জোগান বাড়ছে তারও দ্রুতগতিতে। ফলে দামের স্থিতি নষ্ট হতে শুরু করে।
তেলের উদ্বৃত্ত ও নিয়ন্ত্রণ শুরু
এই প্রেক্ষাপটেই ১৯২৮ সালে স্কটল্যান্ডের আখনাকারি ক্যাসেলে বিশ্বের বড় তেল কোম্পানির নেতারা গোপনে বৈঠক করেন। অজুহাত ছিল শিকার, কিন্তু আসল আলোচনা ছিল বাজার কীভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। সেখানে ছিলেন টিগল, রয়্যাল ডাচ শেলের স্যার হেনরি ডিটার্ডিং এবং অ্যাংলো-পার্সিয়ানের স্যার জন ক্যাডম্যান। তারা ‘অ্যাজ-ইজ অ্যাগ্রিমেন্ট’ নামে একটি সমঝোতায় পৌঁছান। এর উদ্দেশ্য ছিল বাজার নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেওয়া, পরস্পরের অবকাঠামো ব্যবহার করা এবং প্রতিযোগিতা কমানো। রেডলাইন চুক্তি হয়েছিল সম্ভাব্য ঘাটতির যুগে, আর আখনাকারির চুক্তি ছিল উদ্বৃত্তের যুগের প্রতিক্রিয়া। বড় কোম্পানিগুলো বুঝেছিল তেল যদি অনিয়ন্ত্রিতভাবে বাজারে ঢুকতে থাকে, তাহলে তাদের মুনাফা ও প্রভাব দুটোই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
কিন্তু এই নিয়ন্ত্রণ টেকেনি। কারণ, যুক্তরাষ্ট্রে স্বাধীন তেল অনুসন্ধানকারীরা এবং নতুন কূপের জোয়ার বড় কোম্পানিগুলোর হিসাব ভেঙে দেয়। অতিরিক্ত উৎপাদন এমন পর্যায়ে যায় যে বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়। বড় করপোরেশনগুলো আন্তর্জাতিক সমঝোতায় বাজারকে বেঁধে রাখতে চাইলেও, বাস্তবে তেলের জোগান এত দ্রুত বাড়ছিল যে সেই নিয়ন্ত্রণ অনেক জায়গায় কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকে। ফলে তেলশিল্প এমন এক যুগে প্রবেশ করে, যেখানে উদ্বৃত্ত, দামের ধস, উৎপাদন কোটা ও রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ—সবই ক্রমে বড় প্রশ্ন হয়ে ওঠে।
সব মিলিয়ে, ১৯২০-এর দশকের শেষভাগ বিশ্ব তেলশিল্পে ছিল এক সন্ধিক্ষণ। একদিকে মধ্যপ্রাচ্যের তেলের দরজা খুলছে, অন্যদিকে আমেরিকায় উদ্বৃত্ত তেল বাজারকে নাড়িয়ে দিচ্ছে। গুলবেনকিয়ানের রেড লাইন চুক্তি, টিগলের বৈশ্বিক তেল অনুসন্ধান, আর আখনাকারির গোপন সমঝোতা—সবকিছু মিলে দেখা যায় যে তেল ব্যবসা আর শুধু কূপ খননের মধ্যে নেই। এটি হয়ে উঠেছিল ভূরাজনীতি, করপোরেট শক্তি, রাষ্ট্রীয় স্বার্থ ও বৈশ্বিক বাজার নিয়ন্ত্রণের খেলা।
শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার সরাসরি হস্তক্ষেপ করে। টেক্সাস ও ওকলাহোমার গভর্নররা একপর্যায়ে মার্শাল ল জারি করেন। ন্যাশনাল গার্ড পাঠিয়ে কূপ বন্ধ করা হয়। পরে টেক্সাস রেলরোড কমিশন উৎপাদনে কোটা বেঁধে দেয়। অর্থাৎ কে কত তেল তুলতে পারবে, তা নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু অনেকে এই সীমা না মেনে অতিরিক্ত তেল রাতের অন্ধকারে অন্য রাজ্যে পাচার করত। এই বেআইনি তেলই পরিচিত হয় ‘হট অয়েল’ নামে।
এ সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ফ্র্যাঙ্কলিন ডি. রুজভেল্ট হ্যারল্ড ইকিসকে তেল প্রশাসক নিয়োগ দেন। ইকিস মনে করতেন, তেল শুধু বাণিজ্যিক পণ্য নয়, এটি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কৌশলগত জাতীয় সম্পদ। পরে নতুন ফেডারেল আইন করে ‘হট অয়েল’ নিয়ন্ত্রণে আনা হয় এবং বাজারে কিছুটা স্থিতি ফেরে। আইনটির নাম ছিল ‘কন্যালি হট অয়েল অ্যাক্ট, ১৯৩৫ ’। এতে বলা হয়, রাজ্যের নির্ধারিত সীমার বাইরে উৎপাদিত তেল অন্য রাজ্যে পাঠানো যাবে না। অর্থাৎ অবৈধভাবে তোলা ‘হট অয়েল’ বিক্রি ও পরিবহন নিয়ন্ত্রণে ফেডারেল সরকার হস্তক্ষেপ করতে পারবে। এভাবেই অনিয়ন্ত্রিত তেল-উত্থানের যুগ থেকে নিয়ন্ত্রিত তেল বাজারের যুগে প্রবেশ শুরু হয়। পরে তেল উৎপাদনে কোটা ও নিয়ন্ত্রণের যে ধারণা গড়ে ওঠে, সেটাই ছিল বহু বছর পর গঠিত ওপেকের এক ধরনের পূর্বসূরি।
দ্বিতীয় বিশ্ব তেলযুদ্ধ
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে তেলের ভূমিকা শুধু রসদ জোগানের বিষয় ছিল না; এটি ছিল যুদ্ধের এমন একটি নির্ধারক দিক, যা সামরিক কৌশল ঠিক করেছে এবং শেষ পর্যন্ত কে জিতবে, সেটাও অনেকাংশে নির্ধারণ করেছে।
হিটলার ক্ষমতায় আসার পর এমন এক জার্মানির কল্পনা করেছিলেন, যা হবে চাকার ওপর দাঁড়ানো একটি দেশ। অটোবাহন আর মোটরচালিত সামরিক শক্তিই হবে তার ভিত্তি। কিন্তু জার্মানি প্রাকৃতিক সম্পদ তেমন ছিল না। দেশটির নিজের তেল প্রায় ছিলই না। এই সমস্যা সমাধানে রাসায়নিক প্রতিষ্ঠান আইজি ফারবেন কয়লা থেকে কৃত্রিম তেল তৈরির একটি পদ্ধতি তৈরি করে। এই তেল খুব ব্যয়বহুল ছিল। তবু হিটলার এটাকেই সম্পদের সংকটের সমাধান হিসেবে দেখেছিলেন।
তবে তাতেও জার্মানির ঘাটতি কাটেনি। এ কারণেই তারা ‘ব্লিটজক্রিগ’কৌশল নেয়। জার্মান শব্দ ব্লিটজক্রিগের অর্থ হচ্ছে বিদ্যুৎগতির যুদ্ধ। এতে ট্যাংক, বিমান ও পদাতিক বাহিনী একসঙ্গে ব্যবহার করে শত্রুর প্রতিরক্ষা ভেঙে দ্রুত ভেতরে ঢুকে পড়া হয়। উদ্দেশ্য ছিল, শত্রুকে পরাজিত করতে হবে, যাতে সম্পদের সংকট বড় আকার নেওয়ার আগেই যুদ্ধ শেষ করা যায়। ফ্রান্স দখল করায় জার্মানিকে সাময়িকভাবে কিছু তেলের মজুত এনে দেয়। কিন্তু ব্রিটেনের যুদ্ধে ব্যবধান স্পষ্ট হয়ে পড়ে। যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি ১০০-অকটেন জ্বালানি ব্রিটিশ স্পিটফায়ারকে (ব্রিটেনের তৈরি দ্রুতগতির যুদ্ধবিমান) জার্মান মেসারশমিটের (জার্মানির অন্যতম প্রধান ফাইটার বিমান) তুলনায় বেশি শক্তি ও চালনা কৌশলের সুবিধা দেয়।
১৯৪০ সালের গ্রীষ্মে ব্রিটেনের যুদ্ধে এই ১০০-অকটেন জ্বালানি ব্রিটিশ রয়্যাল এয়ার ফোর্সকে বড় প্রযুক্তিগত সুবিধা দেয়। এই জ্বালানি স্পিটফায়ারকে দেয় বেশি শক্তি, বেশি উত্তোলন ক্ষমতা এবং বেশি কৌশলে ঘোরার সামর্থ্য। ফলে ব্রিটিশ পাইলটরা আকাশযুদ্ধে জার্মান মেসারশমিটের ছিল তুলনায় ভালো অবস্থানে ছিলেন।
১৯৪২ সালে জার্মান যুদ্ধযন্ত্রের বড় ব্যর্থতাগুলোর পেছনে তেল ছিল প্রধান নিয়ামক। হিটলার মস্কোকে প্রধান লক্ষ্য না বানিয়ে ককেশাসের বাকু তেলক্ষেত্রের দিকে মন দেন। কিন্তু বিশাল দূরত্ব, কঠোর আবহাওয়া এবং খারাপ রাস্তাঘাট জার্মানির অগ্রযাত্রা থামিয়ে দেয়। ইঞ্জিনে জ্বালানি জমে যেত, আর ট্যাংক প্রত্যাশার দ্বিগুণ জ্বালানি খরচ করত। শেষ পর্যন্ত এই অভিযান স্টালিনগ্রাদের বিপর্যয়ে গিয়ে ঠেকে।
উত্তর আফ্রিকায় জেনারেল এরউইন রোমেলের বড় পরিকল্পনা ছিল মধ্যপ্রাচ্য দখল করে ককেশাসমুখী জার্মান বাহিনীর সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করা। কিন্তু তাঁর অগ্রযাত্রা বারবার থেমে যায় পেট্রলের ঘাটতিতে। কখনো তাঁকে দখল করা ব্রিটিশ গাড়ি ও জ্বালানি ব্যবহার করতে হতো।
অন্যদিকে, মন্টগোমারির নেতৃত্বে ব্রিটিশ বাহিনী তেলের মধ্যে যেন ভাসছিল। যুক্তরাষ্ট্র ও মধ্যপ্রাচ্য থেকে তাদের পর্যাপ্ত সরবরাহ ছিল। এই পার্থক্যই শেষ পর্যন্ত আল আলামেইনে রোমেলের পরাজয়ের পথ তৈরি করে।
অক্ষশক্তি যখন সংকটে লড়ছিল, তখন মিত্রশক্তি তাদের বিশাল শিল্পশক্তিকে কাজে লাগায়। মিত্রদের ব্যবহৃত প্রতি ৭০০ কোটি ব্যারেল তেলের মধ্যে ৬০০ কোটিই জুগিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। এই সরবরাহ নিরাপদ রাখতে যুক্তরাষ্ট্র বিগ ইঞ্চ পাইপলাইন তৈরি করে। একই সঙ্গে তারা ভাসমান তেল ট্যাংকার ব্যবহার করে, যাতে নৌবাহিনীকে বারবার বন্দরে ফিরে যেতে না হয়। নরম্যান্ডি অভিযানের সময় প্লুটো পাইপলাইনও গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
১৯৪৪ সালে এসে মিত্রশক্তির কৌশলগত বোমাবর্ষণের মূল লক্ষ্য হয়ে ওঠে হিটলারের কৃত্রিম জ্বালানি কারখানাগুলো। এই কারখানাগুলো তৈরি হয়েছিল বন্দিশিবিরের জোরপূর্বক শ্রম দিয়ে, যার ফলে প্রায় ২৫ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। যুদ্ধের এই পর্যায়ে জার্মানির বিমান চালনার জ্বালানির প্রায় ৯০ শতাংশই আসত এসব কারখানা থেকে।
মিত্রদের বোমাবর্ষণ এতটাই কার্যকর হয়েছিল যে যুদ্ধের শেষে জার্মানির জ্বালানি উৎপাদন তাদের প্রয়োজনের সামান্য অংশে নেমে আসে। অবস্থা এমন হয়েছিল যে আধুনিক জেট যুদ্ধবিমানগুলো মাটিতে পড়ে থাকত, আর সেগুলো টেনে নেওয়া হতো।
প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে জাপানও একই ধরনের সংকটে ছিল। ১৯৪১ সালের মধ্যে জাপানের ৮০ শতাংশ তেল সরবরাহ করছিল যুক্তরাষ্ট্র। চীনে জাপানের নৃশংসতা এবং ইন্দোচীনে আগ্রাসনের প্রতিক্রিয়ায় প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট জাপানের সম্পদ জব্দ করেন। এর ফলে কার্যত জাপানের তেল সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়।
এর পর থেকেই জাপানের সামরিক নেতৃত্বের সামনে সময় গোনা শুরু হয়। তাদের হিসাব ছিল, নতুন তেলের উৎস নিশ্চিত করতে না পারলে কয়েক বছরের মধ্যেই তারা তৃতীয় শ্রেণির রাষ্ট্রে নেমে যাবে।
জাপানের লক্ষ্য ছিল ডাচ ইস্ট ইন্ডিজের তেল। অ্যাডমিরাল ইয়ামামোতোর পার্ল হারবার আক্রমণ ছিল একটি কৌশলগত পদক্ষেপ। উদ্দেশ্য ছিল, যুক্তরাষ্ট্রের প্রশান্ত মহাসাগরীয় নৌবহরকে অক্ষম করে দেওয়া, যাতে ইস্ট ইন্ডিজ থেকে জাপানে ফেরত আসা তেলবাহী জাহাজের পথ সুরক্ষিত থাকে।
যুদ্ধের শেষ মাসগুলোয় জাপান ও জার্মানি দুটিই মরিয়া পদক্ষেপ নিতে শুরু করে। জাপান পাইনগাছের শিকড় থেকে তেল বের করার চেষ্টা করে। একই সঙ্গে তারা ‘কামিকাজে’ হামলা চালায়। অন্যতম কারণ ছিল এতে ফেরার পথ না থাকায় জ্বালানি বাঁচে। কামিকাজে হামলা ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষদিকে জাপানের এক ধরনের আত্মঘাতী বিমান হামলা। এতে জাপানি পাইলটরা বিস্ফোরকভর্তি বিমান সরাসরি শত্রুপক্ষের জাহাজে গিয়ে আঘাত করত। অর্থাৎ, হামলার পর ফিরে আসার পরিকল্পনা থাকত না। মূল লক্ষ্য ছিল যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধজাহাজ ও নৌবহরে বড় ক্ষতি করা।
প্রকৃতির নির্মম পরিহাসের মতো শুনতে লাগবে হয়তো। তারপরও বলি। যুদ্ধ শেষে মার্কিন সেনারা যখন জাপানের প্রধানমন্ত্রী হিদেকি তোজোকে ধরতে যায়, তখন তিনি আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন। তাঁকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করা হলেও তেলের অভাবে অ্যাম্বুলেন্স পৌঁছাতে পারেনি। পরে মার্কিন সেনারা তাঁকে হাসপাতালে নেয়। তোজো বেঁচে যান। ১৯৪৮ সালে তাঁকে ফাঁসিতে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।
অন্যদিকে আত্মহত্যা করেছিলেন আডলফ হিটলারও। এর পরে তাঁরই নির্দেশে তাঁর সঙ্গীরা পেট্রল ঢেলে হিটলারের দেহ পুড়িয়ে দিয়েছিল, যাতে শত্রুপক্ষের হাতে না পড়ে।
সূত্র: ড্যানিয়েল ইয়ার্গিনের ‘দ্য প্রাইজ: দ্য এপিক কোয়েস্ট ফর অয়েল, মানি অ্যান্ড পাওয়ার’ আধুনিক তেলের ইতিহাস নিয়ে সবচেয়ে প্রভাবশালী বইগুলোর একটি। বইটি ১৯৯০ সালে প্রকাশিত হয় এবং ১৯৯২ সালে জেনারেল ননফিকশন বিভাগে পুলিৎজার পুরস্কার পায়। এই লেখার মূল সূত্র এই বই। সঙ্গে প্রাসঙ্গিক আরও সূত্র ব্যবহার করা হয়েছে। একই সঙ্গে হালনাগাদ তথ্যও যুক্ত করা হয়েছে।