সেকেন্ডে জাতীয় ঋণ বাড়ছে ৯০ হাজার ডলার, মার্কিন অর্থনীতিতে কেন বিপৎসংকেত বাজছে
যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০তম জন্মবার্ষিকী, টেইলর সুইফটের বিয়ে ও ফুটবল বিশ্বকাপ—সব মিলিয়ে এবারের গ্রীষ্মে যুক্তরাষ্ট্রের মানুষ অর্থনীতির দিকে নজর কিছুটা কমিয়ে দিলে তাঁদের দোষ দেওয়া যায় না।
কিন্তু দেশটির অর্থনীতিতে সমস্যার লক্ষণগুলো ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছিল। চলতি সপ্তাহে তা বড় শিরোনাম হয়ে ওঠে, যখন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ঋণের পরিমাণ ৪০ ট্রিলিয়ন ডলার (৪০ লাখ কোটি ডলার) ছাড়িয়ে যায়। দেশটির জাতীয় ঋণ এখন প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৯০ হাজার ডলার, অর্থাৎ প্রতিদিন প্রায় ৭৮০ কোটি ডলার করে বাড়ছে। এতে দেশটির অভ্যন্তরে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
কীভাবে এখানে এসে পৌঁছাল যুক্তরাষ্ট্র
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক কমিটি ফর আ রেসপনসিবল ফেডারেল বাজেটের প্রেসিডেন্ট মায়া ম্যাকগিনিয়াস বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ঋণ প্রথমবারের মতো ১ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে প্রায় ২০০ বছর সময় লেগেছিল।
১৯৮১ সালে ওই মাইলফলক অতিক্রম করাকে সতর্কসংকেত হিসেবে দেখা হয়েছিল। সে সময় প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যান জাতির উদ্দেশে টেলিভিশনে দেওয়া এক ভাষণে বলেছিলেন, ‘একটি জাতি হিসেবে আমাদের যদি কোনো সতর্কবার্তার প্রয়োজন হয়ে থাকে, তাহলে এটাই হোক সেই সতর্কবার্তা।’
মায়া ম্যাকগিনিয়াস বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০তম বছরে এসে দেশটি এখন শুধু ঋণের সুদ পরিশোধেই সেই এক ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি ব্যয় করছে।
৪০ ট্রিলিয়ন ডলারের মাইলফলক স্পর্শ করবে—এটি প্রত্যাশিতই ছিল। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদ এবং সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন—উভয় প্রশাসনের সময় সরকারি ব্যয় ব্যাপকভাবে বেড়েছে। তবে ঋণের এই নতুন মাইলফলক পরিস্থিতির ভয়াবহতার আরেকটি স্পষ্ট উদাহরণ।
সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিসহ বিভিন্ন খাতে সরকারের ব্যয় বেড়েছে, কিন্তু কর কমানোর কারণে সরকারের রাজস্ব সেই হারে বাড়েনি। ফলে ব্যয় ও আয়ের মধ্যে বড় ব্যবধান তৈরি হয়েছে। এর পাশাপাশি ২০০৮ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকট এবং কোভিড-১৯ মহামারির মতো সংকট মোকাবিলায় সরকারের নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের জন্যও বিপুল পরিমাণ ঋণ করতে হয়েছে। সাম্প্রতিক মূল্যস্ফীতির ধাক্কা সামাল দিতে সুদের হার বাড়ানোর বিষয়টি এর সঙ্গে যোগ করলে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক বলেই মনে হয়।
পরিস্থিতি কতটা খারাপ
২০১৬ সালে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হওয়ার সময় যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ঋণের পরিমাণ ছিল ২০ ট্রিলিয়ন ডলারের সামান্য কম। এক দশকের মধ্যে সেই ঋণ দ্বিগুণ হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের জয়েন্ট ইকোনমিক কমিটির তথ্য অনুযায়ী, দেশটির জাতীয় ঋণ এখন প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৯০ হাজার ডলার, অর্থাৎ প্রতিদিন প্রায় ৭৮০ কোটি ডলার করে বাড়ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক এবং ফেডারেল রিজার্ভের সাবেক জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ এরিক সোয়ানসন বলেন, এক দশক আগের তুলনায় এখনকার পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় পার্থক্য হলো সুদের হারের মাত্রা। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে দীর্ঘমেয়াদি সুদের হার কয়েক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। এর একটি কারণ মূল্যস্ফীতি নিয়ে উদ্বেগ। তবে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের অতিরিক্ত ঋণ নেওয়ার প্রবণতা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ঋণের পরিমাণ নিয়ে বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ বাড়ায় বন্ড বাজারে এখন বেশি মুনাফা বা রিটার্ন দাবি করা হচ্ছে। অন্যদিকে এআই খাতে বিপুল বিনিয়োগের জন্য প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোও বড় অঙ্কের ঋণ নিচ্ছে। ফলে বিনিয়োগকারীদের অর্থ পেতে সরকার ও প্রযুক্তি কোম্পানির মধ্যে প্রতিযোগিতা বাড়ছে।
পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের হোয়াটন স্কুলের অধ্যাপক ও অর্থনীতিবিদ মোহাম্মদ এ এল-ইরিয়ান বলেন, সুদের হার বেড়ে গেলে সরকারের বাজেট–ঘাটতি মেটাতে ঋণ নেওয়ার খরচও বেড়ে যায়।
এল-ইরিয়ানের তথ্যমতে, সরকারের ঋণের বিপরীতে সুদ পরিশোধের ব্যয় এখন গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৫ শতাংশ বেশি। তিনি বলেন, এই সুদ পরিশোধে সরকারের কর থেকে পাওয়া রাজস্বের প্রায় ২০ শতাংশ ব্যয় হচ্ছে। এই ব্যয় এখন প্রতিরক্ষা খাতের ব্যয়ের চেয়েও বেশি।
তাহলে কি উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ আছে
যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ঋণ এখন ৪১ দশমিক ১ ট্রিলিয়ন ডলারের ঋণসীমার কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। কংগ্রেশনাল বাজেট অফিসের (সিবিও) পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩৬ সাল নাগাদ দেশটির ঋণ বেড়ে প্রায় ৬৪ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে।
অবশ্য অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, পরিস্থিতি এখনো সংকটজনক পর্যায়ে পৌঁছায়নি। বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতি হওয়া এবং মার্কিন ডলার বিশ্বের প্রধান রিজার্ভ মুদ্রা হওয়ায় অন্য দেশগুলোর তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রের বেশি সময় ধরে আর্থিক শৃঙ্খলার বাইরে থাকার সুযোগ রয়েছে।
অর্থনীতিবিদ মোহাম্মদ এ এল-ইরিয়ান বলেন, ‘আমরা এমন একটি পর্যায়ে পৌঁছাচ্ছি, যেখানে হলুদ সতর্কসংকেত জ্বলছে। তবে এখনো লাল সতর্কসংকেত জ্বলছে না।’
যুক্তরাষ্ট্র সরকারের বন্ড কিনে দেশটিকে ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ কমে আসছে বলে সতর্ক করেছেন অর্থনীতিবিদ এরিক সোয়ানসন। তিনি বলেন, এতে একটি ‘দুষ্টচক্র’ তৈরি হচ্ছে। বিনিয়োগকারীদের যুক্তরাষ্ট্রের ঋণ কিনতে আগ্রহী রাখতে সরকারকে ক্রমেই বেশি সুদ বা রিটার্ন দিতে হচ্ছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ঋণ নেওয়ার খরচ বেড়ে গেলে এর প্রভাব অন্য দেশগুলোর ওপরও পড়া অনিবার্য। কারণ, যুক্তরাষ্ট্রে ঋণের খরচ বাড়লে বিশ্বজুড়ে ঋণের খরচও বাড়তে থাকে বলে মন্তব্য করেন এরিক সোয়ানসন।
মার্কিন জনগণের ওপর প্রভাব কীভাবে পড়বে
বর্তমান পরিস্থিতির কারণে পরিবারগুলোকে গৃহঋণ, গাড়ি কেনার ঋণ এবং ক্রেডিট কার্ডে আরও বেশি সুদ গুনতে হতে পারে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদ মোহাম্মদ এ এল-ইরিয়ান। এতে তুলনামূলক কম আয়ের মানুষই সবচেয়ে বেশি চাপে পড়বেন।
এর পাশাপাশি ভোক্তাদের ওপর আরও একটি পরোক্ষ প্রভাব পড়তে পারে। ঋণ নেওয়ার খরচ বেড়ে গেলে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোও অনেক সময় সেই বাড়তি খরচ পণ্যের দাম বাড়ানোর মাধ্যমে ভোক্তাদের ওপর চাপিয়ে দেয়।
কমিটি ফর আ রেসপনসিবল ফেডারেল বাজেটের প্রেসিডেন্ট মায়া ম্যাকগিনিয়াস বলেন, ‘কোনো না কোনোভাবে এই ঋণের প্রভাব শেষ পর্যন্ত মানুষের পকেটে গিয়ে পড়ে।’
এরপর কী
যুক্তরাষ্ট্রের সর্বশেষ অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান বলছে, সাম্প্রতিক মাসগুলোয় দেশটির অর্থনীতির গতি কিছুটা কমেছে। তবে অর্থনীতি এখনো সন্তোজনক গতিতেই বাড়ছে।
এটি গুরুত্বপূর্ণ এ কারণে যে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হলে সরকারের রাজস্বও বাড়ে। সেই বাড়তি রাজস্ব দিয়ে সরকারি বিভিন্ন কর্মসূচির ব্যয় কিংবা ঋণের সুদ পরিশোধ করা সম্ভব হয়। পর্যাপ্ত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি থাকলে ঋণের সমস্যা অনেকটাই লাঘব করা যায় বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদ মোহাম্মদ এ এল-ইরিয়ান।
অবশ্য প্রবৃদ্ধি পর্যাপ্ত না হলে যুক্তরাষ্ট্রকে অন্য কিছু পদক্ষেপের কথা ভাবতে হতে পারে। এর মধ্যে করব্যবস্থা ও সরকারি ব্যয়ে সংস্কার আনা, এমনকি কৃচ্ছ্রসাধনের পথেও হাঁটা থাকতে পারে। ঋণ পুনর্গঠনও আরেকটি বিকল্প।
এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র যে কৌশল নিয়েছে, তাকে একধরনের আর্থিক প্রকৌশল (ফাইন্যান্সিয়াল ইঞ্জিনিয়ারিং) বলা যায়। এর অংশ হিসেবে বুধবার দেশটির অর্থ মন্ত্রণালয় বাজার থেকে সরকারি বন্ড পুনঃক্রয়ের উদ্যোগ নেয়। এতে বন্ডের চাহিদা বাড়ে এবং সরকারের ঋণ নেওয়ার খরচ কমে। তবে এর প্রভাব বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। পরদিনই দীর্ঘমেয়াদি ঋণের সুদের হার আবার বেড়ে যায়।
এদিকে মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে হোয়াইট হাউস চাইবে অর্থনীতিতে নিজেদের সাফল্য দেখাতে। ভোটারদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ এখন জীবনযাত্রার ব্যয় ও পণ্য-সেবার ক্রয়ক্ষমতা। তবে বিকল্প পদক্ষেপগুলোর কোনোটিই খুব একটা আকর্ষণীয় নয়। আর সরকার সেসব পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত কি না, তা নিয়েও সন্দিহান অর্থনীতিবিদ মোহাম্মদ এ এল-ইরিয়ান।
এই অর্থনীতিবিদ বলেন, ‘আগামী দুই থেকে তিন বছরে বাজেট–ঘাটতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানোর মতো কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হবে—এমন কিছু আমি দেখতে পাচ্ছি না। রাজনৈতিক আলোচনার দিকে তাকালে দেখা যায়, সেখানে মূলত কর কমানোর কথাই বলা হচ্ছে।’