নীতি সুদ অপরিবর্তিত রাখল ফেড, অনড় রইলেন পাওয়েল

মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভ চেয়ারম্যান জেরোম পাওয়েলফাইল ছবি: রয়টার্স

যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ নীতি সুদহার অপরিবর্তিত রেখেছে। এর মধ্য দিয়ে ফেডের চেয়ারম্যান জেরোম পাওয়েল নীতি নির্ধারণে আবারও স্বায়ত্তশাসন বজায় রাখলেন। রাজনৈতিক চাপের কাছে নতি স্বীকার করলেন না।

অর্থনীতিতে স্বাভাবিকতা ফিরে আসার সঙ্গে সঙ্গে ফেডারেল রিজার্ভ ২০২৫ সালের টানা তিনবার নীতি সুদহার কমিয়েছে। কিন্তু মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাতেও সন্তুষ্ট নন। তিনি চান, সুদের হার আরও কমানো হোক। কিন্তু ফেডের চেয়ারম্যান জেরোম পাওয়েল তাতে কর্ণপাত করেনি। স্বভাবসুলভভাবে ট্রাম্প ফেড চেয়ারম্যান সম্পর্কেও কটু কথা বলেছেন। পাওয়েলও এবার ছেড়ে কথা বলেননি। খবর বিবিসি।

ফেডারেল রিজার্ভ জানিয়েছে, নীতি সুদহার হার ৩ দশমিক ৫ থেকে ৩ দশমিক ৭৫ শতাংশের মধ্যেই রাখা হব। ফেডের ভাষ্য, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সম্প্রসারণের গতি ‘স্থিতিশীল’।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতার প্রশ্নে জেরোম পাওয়েল অনড়। এ নিয়ে ট্রাম্প এতটাই ক্ষিপ্ত যে সম্প্রতি ফেড ভবন সংস্কার নিয়ে সিনেটে দেওয়া পাওয়েলের সাক্ষ্যর বিরুদ্ধে ফৌজদারি তদন্ত শুরু হয়েছে।

গতকাল বুধবার ওই তদন্ত নিয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান পাওয়েল। তবে তিনি বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক যদি স্বাধীনতা হারায়, তাহলে বিশ্বাসযোগ্যতা পুনরুদ্ধার করা খুব কঠিন হয়ে পড়ে। সে কারণেই ফেডের স্বায়ত্তশাসন রক্ষায় তাঁর দৃঢ় প্রতিশ্রুতি।

পাওয়েল এর আগে মন্তব্য করেছিলেন, তার ধারণা—সুদের হার কমানোর গতি নিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের অসন্তোষ থেকেই ফেডারেল তদন্তের সূত্রপাত হয়েছে।

তদন্তের প্রসঙ্গে মন্তব্য করার পর প্রথম সংবাদ সম্মেলনে পাওয়েল স্পষ্ট করে বলেন, মুদ্রানীতি যেন রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহৃত না হয়, সে জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা অপরিহার্য। তাঁর ভাষায়, এই প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে জনগণের স্বার্থে কার্যকর ভূমিকা রেখে আসছে। নির্বাচিত রাজনীতিকদের সরাসরি হস্তক্ষেপ ছাড়াই মুদ্রানীতি নির্ধারিত হয়। এই নীতি নির্ধারণ অর্থনীতির ভিত্তিতে হয়—রাজনীতির ভিত্তিতে নয়।

আগামী মে মাসে ফেডের চেয়ারম্যান পদ ছাড়ছেন পাওয়েল। তার উত্তরসূরি হিসেবে নতুন নাম শিগগিরই ঘোষণা করবেন ট্রাম্প—এমনটাই ধারণা করা হচ্ছে।

পাওয়েলের বিরুদ্ধে তদন্ত নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক প্রধানেরাও কড়া সমালোচনা করেছেন। তাঁদের মতে, এটা ফেডের স্বায়ত্তশাসন দুর্বল করার প্রচেষ্টা।

সুদের হার অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত ব্যাখ্যা করতে গিয়ে পাওয়েল বলেন, ‘অর্থনীতির শক্তিমত্তা আবার আমাদের চমকে দিয়েছে।’ তাঁর মতে, শ্রমবাজারে স্থিতিশীলতার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, যদিও কর্মসংস্থানের গতি কম, বেকারত্বের হার কিছুটা কমেছে। গত বছর তিন দফা সুদ কমানোর প্রভাব অর্থনীতিতে কীভাবে পড়ছে, নীতিনির্ধারকেরা তা এখনো পর্যবেক্ষণ করছেন।’

পাওয়েল আরও বলেন, কর্মসংস্থান ও মূল্যস্ফীতির মধ্যে এখনো কিছু টানাপোড়েন আছে, যদিও তা আগের তুলনায় অনেকটাই কম। পাশাপাশি সাম্প্রতিক বৈঠকের পর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ভবিষ্যৎ চিত্র আরও ইতিবাচক হয়েছে।

২০২৫ সালের দ্বিতীয়ার্ধে মূল্যস্ফীতির চেয়ে চাকরির বাজারে শ্লথগতির আশঙ্কাই বেশি গুরুত্ব পেয়েছিল। সুদের হার কমানোর লক্ষ্য মূলত ব্যবসার ঋণের খরচ কমিয়ে কর্মসংস্থানে গতি আনা।

সংবাদে বলা হয়েছে, সম্প্রতি শ্রমবাজার নিয়ে উদ্বেগ কিছুটা কমলেও মূল্যস্ফীতি এখনো ফেডের ২ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার ওপরে। পাওয়েলের বক্তব্যের আগে এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক একপর্যায়ে ইতিহাসে প্রথম ৭ হাজার পয়েন্ট ছাড়ালেও শেষ পর্যন্ত অপরিবর্তিত অবস্থায় থেকে যায়।

ফেডের মুদ্রানীতি কমিটির বৈঠকে দুজন কর্মকর্তা সুদ কমানোর পক্ষে ভোট দেন—হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পের অর্থনৈতিক উপদেষ্টা পরিষদের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালনরত (বর্তমানে ছুটিতে থাকা) স্টিফেন মিরান ও ট্রাম্প-নিযুক্ত ক্রিস্টোফার ওয়ালার। বাজারের জল্পনা, এই ওয়ালার পাওয়েলের উত্তরসূরি হচ্ছেন।

তবে ভিন্নমত থাকা সত্ত্বেও ফেডের পরিচালনা পর্ষদ সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক তথ্য–উপাত্তের দিকেই জোর দিয়েছে। দেখা গেছে, পরিসংখ্যানে উন্নতি আছে। ফলে সুদের হার স্থির রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে নীতিনির্ধারকেরা আত্মবিশ্বাস পেয়েছেন।

মরগান স্ট্যানলি ওয়েলথ ম্যানেজমেন্টের প্রধান অর্থনৈতিক কৌশলবিদ এলেন জেন্টনার বিবিসিকে বলেন, ‘ফেডের বার্তা আগের মতোই। সুদের হার কমতে পারে, তবে বিনিয়োগকারীদের ধৈর্য ধরতে হবে। এই বিরতি সবার পছন্দ না হলেও বছরের শেষ দিকে সুদ কমানোর সম্ভাবনার পথ খোলা আছে।’

বিশ্লেষকেরা বলেন, বিশ্ববাজারে যে সোনার দাম তরতর করে বাড়ছে এবং ডলারের দাম কমছে, এর পেছনে ফেডের স্বাধীনতা ক্ষুন্ন হচ্ছে—এমন আশঙ্কার প্রভাব আছে। ডলার ইনডেক্স বা সূচকের মান চার বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। তা সত্ত্বেও ট্রাম্প নির্বিকার।

২০২৬ সালে কবার কমবে সুদহার

ওয়াল স্ট্রিটের ধারণা, ২০২৬ সালে দুই দফা সুদের হার কমতে পারে—এর বড় একটি কারণ হলো, ফেডের পরবর্তী নেতৃত্ব সুদ কমানোর পক্ষে তুলনামূলকভাবে সহানুভূতিশীল অবস্থান নেবে।

কিন্তু ব্যাংক অব আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্র–বিষয়ক জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ আদিত্য ভাবি সিএনএনকে বলেন, ‘চলতি বছর সুদ কমানোর পক্ষে খুব জোরালো যুক্তি নেই। আমরা জানি, নতুন ফেড চেয়ারম্যানের মনোভাব সুদ কমানোর পক্ষে। ফলে কমিটির ভেতর থেকে দুই দফা সুদ কমানোর পক্ষে যথেষ্ট সমর্থন তিনি জোগাড় করতে পারবেন—এমন সম্ভাবনা আছে; যদিও এই ঐকমত্য তৈরি সহজ হবে না।’