তেলের দাম ২০০ ডলারে উঠতে পারে, সম্ভাবনা কতটা

ব্রেন্ট ক্রুড তেলকে আন্তর্জাতিকভাবে তেলের দাম মূল্যায়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি বলে বিবেচনা করা হয়ছবি: রয়টার্স ফাইল ছবি

২০০৮ সালের গ্রীষ্ম। বিনিয়োগ ব্যাংক লেহম্যান ব্রাদার্স ধস পড়ার কয়েক সপ্তাহ আগে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১৫০ ডলারে উঠে যায়। সেই অভিজ্ঞতার কথা মনে করিয়ে দিয়ে অনেক জ্বালানি বিশ্লেষকের সতর্কবার্তা, হরমুজ প্রণালি দ্রুত খুলে দেওয়া না হলে চলতি গ্রীষ্মে তেলের দাম আরও বাড়তে পারে।

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর পর যুক্তরাষ্ট্রের ডব্লিউটিআই ক্রুডের দাম প্রায় ৬৫ ডলার থেকে বেড়ে ১০০ ডলার পেরিয়ে গেছে। শুধু মার্চ মাসেই অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়েছে ৫১ শতাংশ—১৯৮৩ সালে ফিউচার ট্রেডিং চালুর পর এক মাসে এটি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ উত্থান।

একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রলের দাম গ্যালনপ্রতি ৪ ডলারের ওপরে উঠে গেছে। নিত্যপণ্য থেকে বিমান ভাড়া—সবখানেই এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে।

আশ্বাস বনাম শঙ্কা

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই যুদ্ধ শেষ হবে এবং তখন জ্বালানির দামে ধস নামবে। কিন্তু যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে ও হরমুজ প্রণালি খুলতে দেরি হলে পরিস্থিতি গুরুতর হয়ে উঠতে পারে বলে সতর্ক করেছেন বিশ্লেষকেরা।

অস্ট্রেলিয়ার বিনিয়োগ ব্যাংক ম্যাককোয়ারি গ্রুপের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, যুদ্ধ জুন মাস পর্যন্ত গড়ালে তেলের দাম সাময়িকভাবে হলেও ২০০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। প্রতিষ্ঠানটির জ্বালানি কৌশলবিদ বিকাশ দ্বিবেদীর মতে, এমন পরিস্থিতির সম্ভাবনা প্রায় ২০ শতাংশ, যদিও এক সপ্তাহ আগেও তা ছিল ৪০ শতাংশ। তাঁর ভাষায়, যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরেও হরমুজ প্রণালি আংশিকভাবে বন্ধ থাকলে তেলের দাম ২০০ ডলার হওয়া অস্বাভাবিক নয়।

হোয়াইট হাউস অবশ্য বলছে, জ্বালানি বাজারের স্বল্পমেয়াদি ধাক্কা সামাল দেওয়ার প্রস্তুতি তাদের আছে। প্রয়োজন অনুযায়ী দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

দাম বাড়লে কী হয়

তেলের দাম ২০০ ডলারে উঠলে বিশ্ব অর্থনীতি বড় ধাক্কা খাবে। যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রলের দাম তখন গ্যালনপ্রতি প্রায় ৭ ডলারে উঠতে পারে। ২০২২ সালে সে দেশের বাজারে পেট্রলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৫ দশমিক ০২ ডলারে উঠেছিল, এখন পর্যন্ত তা সর্বোচ্চ। অর্থাৎ এবার সেই রেকর্ড ভেঙে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, এমন মূল্যবৃদ্ধির সম্ভাবনা অতিরঞ্জিত মনে হলেও বাস্তবতা হলো, সরবরাহ সংকটের মাত্রা কতটা গভীর, এই ঘটনা থেকে তা বোঝা যাচ্ছে। ইতিমধ্যে দুবাই ক্রুডের দাম ১৬৬ ডলার পেরিয়ে গিয়েছিল।

মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে দাম এমন পর্যায়ে উঠবে, যেখানে চাহিদা কমে গিয়ে বাজারে ভারসাম্য ফিরে আসবে। ২০০৮ সালে সেই সীমা ছিল প্রায় ১৫০ ডলার। মূল্যস্ফীতি সমন্বয় করলে এখন তা ২০০ ডলারের ওপরে যেতে পারে।

র‍্যাপিডান এনার্জি গ্রুপের প্রধান বব ম্যাকন্যালি বলেন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি কমিয়ে দিতে যতটা দরকার, তেলের দাম ততটাই বাড়বে। ঠিক কোন পর্যায়ে গিয়ে তেলের দাম বৃদ্ধির ধারা থামবে, তা কেউ জানে না। তবে ১০০–এর ঘরের শেষ ভাগ বা ২০০ ডলারের ওপরে যাওয়াও অযৌক্তিক নয়।

সরবরাহে বড় ধাক্কা

জ্বালানি খাতে এখন যে সংকট চলছে, তা ইতিহাসের সবচেয়ে তীব্র সংকটগুলোর একটি।

ব্যাংক অব আমেরিকার হিসাবে, শুধু মার্চ মাসেই বিশ্বে প্রতিদিন ১ কোটি ৪০ থেকে ১ কোটি ৫০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ও জ্বালানি পণ্যের সরবরাহ কমেছে। তাদের ধারণা, চলতি বছরে তেলের দাম গড়ে ১০০ ডলারের আশপাশে থাকবে, তবে হরমুজ বন্ধ থাকলে তা আরও বাড়তে পারে।

ব্যাংকটির সতর্কবার্তা হলো, দুই থেকে চার সপ্তাহের মধ্যে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে বৈশ্বিক সরবরাহশৃঙ্খল ভেঙে পড়া ‘অনিবার্য’ হয়ে পড়বে। এই পরিস্থিতিতে দেশগুলো চাহিদা সীমিত করতে বাধ্য হতে হবে। ফলে ১৯৭০-এর দশকের জ্বালানিসংকটের মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, বা তার চেয়েও খারাপ পরিস্থিতি হতে পারে।

তাদের হিসাব, সরবরাহ দীর্ঘদিন ব্যাহত হলে চলতি ত্রৈমাসিকেই তেলের দাম ১৫০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে।

পূর্বাভাস কতটা নির্ভরযোগ্য

তবে এসব পূর্বাভাসের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে সংশয় আছে। হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা এসব পূর্বাভাস ‘অপ্রাসঙ্গিক’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। তাঁর মতে, সামরিক উত্তেজনা কখন কমবে বা যুদ্ধ থামবেই–বা কবে, সে বিষয়ে কেউই নির্ভুলভাবে পূর্বাভাস দিতে পারে না।

এর আগে ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্কযুদ্ধের সময় দেখা গেছে, নীতিগত সিদ্ধান্তের কারণে অর্থনৈতিক পূর্বাভাস কীভাবে অচল হয়ে যেতে পারে। গত বছর উচ্চ শুল্ক আরোপের পর মন্দার আশঙ্কা তৈরি হলেও পরবর্তী সময়ে তা আর বাস্তবায়িত হয়নি।

বর্তমান পরিস্থিতিতে হরমুজ দ্রুত খুলে দেওয়া হলে বা মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি অবকাঠামো দ্রুত মেরামত করা হলে তেলের দাম দ্রুত কমে আসতে পারে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ থেকে সরে গেলেও স্বল্পমেয়াদে তেলের দাম কমে যেতে পারে।

ট্রাম্প নিজেও বলেছেন, ‘আমরা শুধু ইরান থেকে সরে এলেই তেলের দাম পড়ে যাবে—শিগগিরই আমরা তা করব।’

তিনটি সম্ভাব্য চিত্র

ব্যাংক অব আমেরিকা তেলের দামের ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনটি সম্ভাব্য দৃশ্যপট তুলে ধরেছে—

১. উত্তেজনা দ্রুত প্রশমিত হলে চলতি ২০২৬ সালে ব্রেন্ট ক্রুডের গড় দাম হবে ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৭৭ দশমিক ৫০ ডলার।

২. যুদ্ধ দুই থেকে চার সপ্তাহে শেষ হলে চলতি বছর গড় দাম থাকবে ৯২ দশমিক ৫০ ডলারের কাছাকাছি।

৩. সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতিতে ভোক্তার আয় স্থবির হয়ে যাওয়ার পাশাপাশি কর্মসংস্থান হ্রাস ও শেয়ারবাজারে অস্থিরতা দেখা দিতে পারে।

ব্যাংক অব আমেরিকা মনে করছে, পরিস্থিতির অবনতি হলে কয়েক মাসের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র মন্দার কবলে পড়তে পারে।

পরিস্থিতি মোকাবিলার হাতিয়ার কম

সরবরাহ সংকট মোকাবিলায় ট্রাম্প প্রশাসন জরুরি মজুত থেকে রেকর্ড পরিমাণ তেল ছাড়ার মতো পদক্ষেপ নিয়েছে। পাশাপাশি জ্বালানি পরিবহনে বিধিনিষেধ শিথিল ও সামুদ্রিক বিমাসহায়তার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব পদক্ষেপ পর্যাপ্ত নয়। বব ম্যাকন্যালির ভাষায়, প্রেসিডেন্ট যেসব পদক্ষেপ নিয়েছেন সেগুলো ভালো; কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় একেবারেই অপ্রতুল। হরমুজ এমন সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে, যে সমস্যার সমাধান এসব দিয়ে করা কঠিন।

সব মিলিয়ে, এখন বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের দৃষ্টি এক জায়গায় নিবদ্ধ। সেটা আর কিছু নয়—হরমুজ প্রণালি। এই জলপথ যত দিন বন্ধ থাকবে, তত দিন তেলের বাজারে অনিশ্চয়তা থাকবে। পরিণতি—তেলের দাম আরও বৃদ্ধির আশঙ্কা।