৬০ দেশের পণ্যে মার্কিন শুল্ক, এবার কি দীর্ঘস্থায়ী শুল্কযুদ্ধ শুরু করলেন ট্রাম্প

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পফাইল ছবি : এএফপি

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত বছর ক্ষমতায় ফিরেই বাণিজ্য অংশীদার দেশগুলোর বিরুদ্ধে দ্রুত শুল্ক আরোপ করেন। দীর্ঘ তদন্ত বা আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার জন্য অপেক্ষা করতে চাননি তিনি। লক্ষ্য ছিল যত দ্রুত সম্ভব চাপ তৈরি করে বিভিন্ন দেশের কাছ থেকে বাণিজ্যিক ছাড় আদায় করা।

তবে সেই আগ্রাসী শুল্কনীতি শুরু থেকেই বিতর্ক ও আইনি জটিলতার মুখে পড়ে। চলতি বছর সুপ্রিম কোর্টের এক গুরুত্বপূর্ণ রায়ে ট্রাম্প প্রশাসন বড় ধাক্কা খাওয়ার পর এখন তারা নতুন কৌশল নিয়েছে। এবার আদালতে পুরোনো ও বহুল চর্চিত বাণিজ্য আইনের ভিত্তিতে আরও স্থায়ী শুল্কব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা করছে তারা। দেড় বছর আগেও যেসব আইনি প্রক্রিয়া সময়সাপেক্ষ বলে ট্রাম্প এড়িয়ে গিয়েছিলেন, এখন সেগুলোর ওপরই ভরসা করছেন তিনি।

সম্প্রতি জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্য আমদানি রোধে যথাযথ ব্যবস্থা না নেওয়ার অভিযোগে ৬০টি দেশের পণ্যে ১০ থেকে ১২ দশমিক ৫ শতাংশ পর্যন্ত নতুন শুল্ক আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। বিশ্লেষকদের মতে, এটি কেবল শুরু। আগামী কয়েক মাসে আরও একাধিক শুল্ক তদন্ত ও পদক্ষেপের ঘোষণা আসবে।

এর মধ্যে অতিরিক্ত শিল্প উৎপাদন সক্ষমতা, ভিয়েতনামের বিরুদ্ধে মেধাস্বত্ব লঙ্ঘনের অভিযোগ আর সেমিকন্ডাক্টর, রোবোটিকস ও শিল্পযন্ত্রের মতো কৌশলগত খাতকে জাতীয় নিরাপত্তার আওতায় সুরক্ষা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে—এমন খবর পাওয়া গেছে।

কানাডার জ্বালানি কোম্পানি সেনোভাস এনার্জির সহযোগী প্রধান আইন উপদেষ্টা ড্যান উজকজো বলেন, ‘ট্রাম্পের শুল্কনীতির প্রথম অধ্যায় এখন শেষের পথে। আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে, বলা যায়, সর্বোচ্চ গ্রীষ্মের শেষ নাগাদ তাঁর বাণিজ্যনীতির বড় অংশ পুরোপুরি কার্যকর হবে।’

ড্যানের মতে, এতে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো ট্রাম্প প্রশাসনের চূড়ান্ত শুল্ককাঠামো সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাবে। তবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের জন্য এটি নতুন উদ্বেগের কারণ হবে।

বিষয়টি হলো, যুক্তরাষ্ট্রের আমদানি বাজার ৩ কোটি ৪০ লাখ ডলারের, সেই বাজার ধরে রাখতে তাদের আরও ছাড় দিতে হতে পারে।

আগের শুল্কের বদলে নতুন কাঠামো

এত দিন যেসব দেশের ওপর ১০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর ছিল, গত শুক্রবার তা শেষ হয়েছে। তার পরিবর্তে পরিবর্তে ১৯৭৪ সালের বাণিজ্য আইনের ৩০১ নম্বর ধারার আওতায় নতুন শুল্ক আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র।

যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধির (ইউএসটিআর) কার্যালয় জানিয়েছে, নতুন এ ব্যবস্থা যুক্তরাষ্ট্রের মোট আমদানির ৯৯ দশমিক ৪ শতাংশের ওপর প্রযোজ্য হবে।

এর মাধ্যমে ট্রাম্পের বহুল আলোচিত ‘লিবারেশন ডে’ শুল্কনীতির বড় অংশ পুনর্গঠিত হচ্ছে। ওই নীতির আওতায় বিশ্বের প্রায় সব দেশের পণ্যে ১০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করা হয়েছিল। পরে মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট তা অবৈধ ঘোষণা করে। আদালতের মতে, শুল্ক আরোপে যে জাতীয় জরুরি আইন ব্যবহার করা হয়েছিল, তা প্রয়োগের আইনি ভিত্তি ছিল দুর্বল।

একই সঙ্গে অতিরিক্ত শিল্প–সক্ষমতা নিয়ে ৩০১ নম্বর ধারার আওতায় আরেকটি তদন্ত চলছে। এতে চীন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ), জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, মেক্সিকো, ভিয়েতনামসহ ১৬টি প্রধান বাণিজ্য অংশীদারকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। শিল্প–ভর্তুকি ও রপ্তানিমুখী নীতি—মূলত এ দুটি হচ্ছে তদন্তের বিষয়।

ব্যবসায়ীদের কাছে খুব একটা অপ্রত্যাশিত নয়

ট্রাম্পের নতুন শুল্ক ঘোষণা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হলেও অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান মনে করছে, পরিবর্তন হিসেবে এটি তেমন বড় কিছু নয়।

যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগানভিত্তিক ভ্যাকুয়াম ক্লিনার প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান বিসেল ইনকরপোরেটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মার্ক বিসেল বলেন, নতুন শুল্কের হার অনেকটাই তাঁদের প্রত্যাশার মধ্যে ছিল। তাই শুল্ক কার্যকর হওয়ার আগেই চীন বা অন্য দেশ থেকে অতিরিক্ত পণ্য আমদানি করে মজুত বাড়ানোর প্রয়োজন তারা অনুভব করেননি।

ই-মেইলে মার্ক বিসেল বলেন, ‘আমরা শুরু থেকেই ধরে নিয়েছিলাম, শুল্ক ১০ থেকে ১৫ শতাংশের মধ্যেই থাকবে। সেই হিসাব ধরেই ব্যবসার পরিকল্পনা করা হয়েছে।’

বাজেটে শুল্কের বড় অবদান

ক্ষমতায় ফিরেই দ্রুত শুল্ক আরোপের মাধ্যমে ট্রাম্প এক ঢিলে কয়েকটি পাখি মারতে চেয়েছিলেন। এতে আমদানিনির্ভর ব্যবসার ব্যয় বেড়েছে, অনেক দেশ আলোচনার টেবিলে বসতে বাধ্য হয়েছে, চীনের সঙ্গে পাল্টাপাল্টি শুল্ক আরোপের পর শেষ পর্যন্ত নাজুক সমঝোতা হয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো যুক্তরাষ্ট্রের কোষাগারে শত শত বিলিয়ন ডলার রাজস্ব এসেছে।

শুধু ‘লিবারেশন ডে’ শুল্ক থেকেই সরকার ১৬৬ বিলিয়ন ডলার রাজস্ব আদায় করেছে, ক্রমবর্ধমান বাজেট–ঘাটতি সামাল দিতে যার ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। তবে পরে আমদানিকারকদের অর্থ ফেরত দিতে হওয়ায় সেই হিসাব এখন ঋণাত্মক হয়ে গেছে।

অন্যদিকে লেনদেন ভারসাম্যের সংকট মোকাবিলা আইনের আওতায় আরোপ করা ১৫০ দিনের অস্থায়ী শুল্ক থেকে ৫ জুলাই পর্যন্ত ৩১ বিলিয়ন বা ৩ হাজার ১০০ কোটি ডলার রাজস্ব এসেছে। তবে আদালত অবৈধ ঘোষণা করলে এই শুল্কও আমদানিকারকদের ফেরত দিতে হবে।

যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি ঋণ এখন ৪০ ট্রিলিয়ন বা ৪০ লাখ কোটি ডলারের কাছাকাছি। আটলান্টিক কাউন্সিলের আন্তর্জাতিক অর্থনীতি বিভাগের চেয়ারম্যান জশ লিপস্কির মতে, পরবর্তী প্রশাসনও এই শুল্ক থেকে আসা এই রাজস্বের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়তে পারে।

জশ আরও বলেন, ‘ইটের পর ইট গেঁথে আবার শুল্কপ্রাচীর তৈরি করা হচ্ছে। দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার মতো করেই সেটা তৈরি করা হচ্ছে।’

আইনি চ্যালেঞ্জ থাকলেও ট্রাম্পের আত্মবিশ্বাস

জোরপূর্বক শ্রমের অভিযোগে ৩০১ ধারার এত বিস্তৃত প্রয়োগের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে কয়েকটি ছোট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান আদালতে মামলা করেছে। তবে বাণিজ্য ও আইনবিশেষজ্ঞদের মতে, এসব মামলার নিষ্পত্তি হতে দীর্ঘ সময় লাগবে।

তাদের মতে, ৩০১ নম্বর ধারা দীর্ঘদিন ধরে আদালতে টিকে আছে। ফলে জোরপূর্বক শ্রম প্রতিরোধ কিংবা মার্কিন পণ্যের বাজার সম্প্রসারণের উদ্দেশ্যে নেওয়া পদক্ষেপে আদালত সহজে হস্তক্ষেপ করবেন না।

সামনে আরও শুল্ক

যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার স্পষ্ট করে বলেছেন, উৎপাদন দেশে ফিরিয়ে আনা এবং বাণিজ্যঘাটতি কমাতে ট্রাম্প প্রশাসন সব ধরনের আইনি ক্ষমতা ব্যবহার করবে।

মার্কিন সিনেটের অর্থবিষয়ক কমিটিকে গ্রিয়ার বলেন, ‘আইনি হাতিয়ার বদলেছে, কিন্তু বাণিজ্যকৌশল বদলায়নি।’

বাণিজ্য প্রতিনিধি জানান, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশ এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কয়েকটি দেশের ক্ষেত্রে তুলনামূলক বেশি শুল্ক আরোপের যে আলোচনা চলছে, পুনর্গঠিত শুল্কব্যবস্থা সেই সীমা অতিক্রম করবে না।

কর্মকর্তারা আরও জানিয়েছেন, অতিরিক্ত উৎপাদন–সক্ষমতার সবচেয়ে বড় উৎস হিসেবে চীনকে বিবেচনা করা হলেও দেশটির ওপর নতুন শুল্কহার ২০ শতাংশ সীমা ছাড়াবে না। ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের মধ্যে গত নভেম্বরে যে সমঝোতা হয়েছে, বিষয়টি তার মধ্যেই থাকবে। এর সঙ্গে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে আরোপিত ২৫ শতাংশ শুল্ক বহাল থাকবে।

অনিশ্চয়তা এখনো কাটেনি

এদিকে ট্রাম্পের আকস্মিক শুল্ক ঘোষণার প্রবণতা এখনো আছে। গত সোমবার কানাডা বাণিজ্যছাড় দিতে অস্বীকৃতি জানানোয় দেশটির বিয়ার, দুগ্ধজাত পণ্য, হকিস্টিকসহ কয়েকটি পণ্যে ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন তিনি। একই সঙ্গে ন্যাটোর প্রতিরক্ষা ব্যয়ের লক্ষ্য পূরণ না করায় স্পেনের সঙ্গে সব ধরনের বাণিজ্য বন্ধ করে দেওয়ার হুমকিও দিয়েছেন।

কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের বাণিজ্যবিষয়ক অধ্যাপক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) চীনবিষয়ক সাবেক কর্মকর্তা ঈশ্বর প্রসাদ বলেন, ট্রাম্পের এই আকস্মিক শুল্কনীতি এখন সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা।

প্রসাদের ভাষায়, ‘নানা অসন্তোষের জবাব হিসেবে শুল্ককে হাতিয়ার বানানোর প্রবণতার কারণে বৈশ্বিক বাণিজ্যব্যবস্থা আরও অস্থিতিশীল হবে। শুধু বিদেশি ব্যবসায় এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে তা নয়, বরং মার্কিন পরিবার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানেও পড়বে।’