আবার আদানি গোষ্ঠীর শেয়ারধস, গৌতম আদানির সম্পদমূল্য কমল ৫৭০ কোটি ডলার

আদানি গ্রুপের চেয়ারপারসন গৌতম আদানিফাইল ছবি: রয়টার্স

তিন বছর আগে ২০২৩ সালের ২৫ জানুয়ারি প্রকাশিত হয় হিনডেনবার্গ প্রতিবেদন। অভিযোগ, আদানি গোষ্ঠী জালিয়াতি করে শেয়ারের দাম বাড়িয়েছে। ভারতের বাজারে রীতিমতো তোলপাড় পড়ে যায়। তার জেরে সেদিনই আদানি গোষ্ঠীর ১০ কোম্পানির মোট বাজার মূলধন কমে ১ লাখ কোটি রুপি।

২৩ জানুয়ারি, ২০২৬—আবারও যেন সেই দুঃস্বপ্ন ফিরে এল। গতকাল ভারতে সপ্তাহের শেষ কার্যদিবসে আদানি গোষ্ঠীর কোম্পানিগুলোর বাজার মূলধন কমেছে ১২ দশমিক ৫ বিলিয়ন বা ১ হাজার ২৫০ কোটি ডলার বা ১ লাখ ১ হাজার কোটি রুপির বেশি। ফলে জানুয়ারির এই শেষ সপ্তাহ আদানিদের জন্য দুঃস্বপ্নের মতোই হয়ে যাচ্ছে। এ ঘটনার জেরে এক দিনে গৌতম আদানির সম্পদমূল্য কমেছে ৫ দশমিক ৭ বিলিয়ন বা ৫৭০ কোটি ডলার। ফোর্বস ম্যাগাজিনের ধনীদের তালিকায় তাঁর অবস্থান এখন ৩০তম।

এবার অবশ্য হিনডেনবার্গের সংশ্লিষ্টতা নেই। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের সংবাদে বলা হয়েছে, সম্প্রতি ইউএস সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি) কর্তৃপক্ষ গৌতম আদানি ও সাগর আদানিকে জালিয়াতি ও ঘুষ দেওয়ার পরিকল্পনার অভিযোগে সরাসরি ই–মেইল করে সমন পাঠানোর অনুমতি চেয়ে মার্কিন আদালতের কাছে আবেদন করেছেন।

২০২৪ সালের নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের কর্তৃপক্ষ আদানি গ্রুপের কয়েকজন নির্বাহীর বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলে, আদানি গ্রিন এনার্জির উৎপাদিত বিদ্যুৎ কেনার ব্যবস্থা করতে ভারতীয় কর্মকর্তাদের ঘুষ দেওয়ার পরিকল্পনায় জড়িত ছিলেন তাঁরা। আদানি গ্রিন এনার্জি আদানি গোষ্ঠীরই কোম্পানি।

এ ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি) গৌতম আদানি ও সাগর আদানির বিরুদ্ধে দেওয়ানি মামলা করে। আদানি পরিবার ও আরও কয়েকজন আসামির বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ যে ফৌজদারি মামলা করেছে, সেটা তার থেকে আলাদা। আদালতের নথি অনুযায়ী, বিচার বিভাগের মামলাটি এখনো চলমান।

যুক্তরাষ্ট্রের আইন অনুযায়ী, যেসব বিদেশি কোম্পানি মার্কিন বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করে, তারা ব্যবসা পাওয়ার জন্য বিদেশে ঘুষ দিতে পারে না। একই সঙ্গে মিথ্যা বা বিভ্রান্তিকর তথ্যের ভিত্তিতে বিনিয়োগ আহ্বান করাও আইনত নিষিদ্ধ। আদানি গ্রিনের শেয়ার যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারে লেনদেন না হলেও মার্কিন বিনিয়োগকারীরা বৈশ্বিক ব্রোকারেজ কোম্পানিগুলোর মাধ্যমে আদানি গোষ্ঠীর শেয়ার কিনতে পারেন, যেখানে মার্কিন বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ জড়িত, মার্কিন আদালত হস্তক্ষেপ করতে পারে।

এদিকে আদানি গ্রুপ যথারীতি এসব অভিযোগ ‘ভিত্তিহীন’ আখ্যা দিয়েছে। সেই সঙ্গে নিজেদের রক্ষায় ‘সম্ভাব্য সব ধরনের আইনি পদক্ষেপ’ নেবে তারা—সে কথাও জানিয়েছে। তবে ২১ জানুয়ারির সর্বশেষ এসইসি নথি নিয়ে রয়টার্স আদানি গোষ্ঠীর মন্তব্য চাইলেও সেই অনুরোধে তারা তাৎক্ষণিকভাবে সাড়া দেয়নি।

স্বাধীন বাজার বিশ্লেষক অম্বারিশ বালিগা রয়টার্সকে বলেন, বিনিয়োগকারীরা ভেবেছিলেন, আদানি গোষ্ঠী দায়মুক্তি পেয়ে গেছে, সবকিছু মিটে গেছে। এই যখন বাস্তবতা, তখন হঠাৎই যেন এসইসির নথি সামনে এসে পড়ল।

শুক্রবার এ খবর সামনে আসতেই আদানিদের শেয়ারমূল্যে ধস নামে। ফলত ভারতের শেয়ারবাজারের অন্যতম প্রধান দুই সূচক সেনসেক্স ও নিফটিতেও নামে ধস। এর জেরে গতকাল শুক্রবার ভারতের শেয়ারবাজার থেকে বিনিয়োগকারীদের ৬ লাখ ৮ হাজার কোটি রুপির মূলধন কমে গেছে।

সংবাদে বলা হয়েছে, এসইসি কর্তৃপক্ষ আদালতকে জানিয়েছে, গত বছর আনুষ্ঠানিক পথে সমন জারির দুটি অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেছে ভারত। যুক্তরাষ্ট্রে ভারতের কোনো বৃহৎ ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে প্রথম মামলা। মার্কিন বাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থা আদানি গোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠাতা ও তাঁর আত্মীয়ের বিরুদ্ধে সমন জারির চেষ্টা করছে।

ভারতের শেয়ারবাজারের অবস্থা এমনিতেই ভালো নয়। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগ তুলে নিচ্ছেন। ফলে ভারতীয় মুদ্রা রুপিরও দরপতন হচ্ছে। প্রতি সপ্তাহেই নতুন রেকর্ড গড়ছে রুপির দরপতন।

এর মধ্যে গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা কমে আসায় বৃহস্পতিবার ভারতের বাজারের প্রধান সূচকগুলোর উত্থান হয়। কিন্তু তার ঠিক পরের দিনেই বাজারে ফিরল বিক্রির চাপ।

বাস্তবতা হলো, এই বিক্রির চাপে গতকাল শুক্রবার আদানি গ্রিন, আদানি এন্টারপ্রাইজেস, আদানি এনার্জি ও আদানি পোর্টসের শেয়ারের দাম ১৪ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, শুক্রবার দিন শেষে ৭৬৯ পয়েন্ট কমে সেনসেক্স থামে ৮১ হাজার ৫৩৭ পয়েন্টে। নিফটির পতন হয় ২৪১ পয়েন্ট। দিন শেষে এই সূচক শেষমেশ ২৫ হাজার শূন্য ৪৮ পয়েন্টে এসে থামে।

বিশেষজ্ঞদের একাংশের দাবি, গ্রিনল্যান্ড নিয়ে উত্তেজনা কমলেও আদানিদের শেয়ারের দাম কমে যাওয়ায় পতন সেনসেক্স-নিফটির পতন হয়েছে। পাশাপাশি ডলারসহ বিভিন্ন মুদ্রার বিপরীতে ভারতীয় মুদ্রার মূল্য কমে যাওয়ার কারণেও বিনিয়োগকারীরা উদ্বিগ্ন। ফলে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের একাংশ বিপুল পরিমাণে শেয়ার বিক্রি করে দিয়েছেন।

এদিকে পশ্চিম এশিয়া নিয়ে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে। শুক্রবার ব্রেন্ট ক্রুড ফিউচারের দাম শূন্য দশশিক ৫ শতাংশ বেড়ে ব্যারেল প্রতি ৬৪ দশশিক ৩৫ ডলারে ওঠে।

হিনডেনবার্গের অভিযোগ থেকে মুক্তি পেয়েছিলেন আদানি

মার্কিন শেয়ার বিশ্লেষক কোম্পানি বা শর্টসেলার হিনডেনবার্গ রিসার্চ যে অনিয়মের অভিযোগ তুলেছিল গৌতম আদানির গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে, তা ভিত্তিহীন বলে রায় দিয়েছিল সেবি (সিকিউরিটিস অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ বোর্ড অব ইন্ডিয়া)। ঘটনার দুই বছরের বেশি সময় ২০২৫ সালে সেবি এ রায় দেয়। গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছিল তারা।

২০২৩ সালের ২৫ জানুয়ারি আদানি গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে প্রতিবেদন প্রকাশ করে হিনডেনবার্গ। দাবি করা হয়েছিল, এক দশকের বেশি সময় ধরে জালিয়াতি করে নিজেদের কোম্পানিগুলোর শেয়ারের দাম বাড়িয়েছে আদানি গোষ্ঠী।

হিনডেনবার্গের অভিযোগ ছিল, সেবির বিধি ফাঁকি দিতে ভুঁইফোড় বিদেশি সংস্থার মাধ্যমে নিজেদের কোম্পানির শেয়ার কিনিয়েছে তারা। উদ্দেশ্য, নিজেদের হাতে অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ রাখা। এই প্রতিবেদন প্রকাশ্যে আসার পর ভারতে তো বটেই, আন্তর্জাতিক বাজারেও বিপদে পড়ে আদানি গোষ্ঠী। আদানির কোম্পানিগুলোর শেয়ারদর হু হু করে পড়তে থাকে। ওই সময় বিশ্বের ধনীতম ব্যক্তির তালিকায় আদানির অবস্থান পাঁচের মধ্যে ছিল। কিন্তু সেই এক ধাক্কায় অনেকটা নেমে গিয়েছিলেন আদানি।