ভেনেজুয়েলার কাছ থেকে তেল কিনবে ভারত, মার্কিন অনুমোদনের অপেক্ষায়

পরিবর্তনশীল ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে জ্বালানি তেলের নতুন উৎস খুঁজছে ভারত। বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, ভারতের রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ যুক্তরাষ্ট্রের অনুমোদন নিয়ে আবার ভেনেজুয়েলার অপরিশোধিত তেল কেনার চেষ্টা করছে।

বিষয়টি সম্পর্কে অবগত দুটি সূত্র গত শুক্রবার রয়টার্সকে এ তথ্য জানিয়েছে। ভারত এমনিতে রাশিয়া থেকে তেল কেনা নিয়ে চাপে আছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নতুন হুমকি দিয়েছেন, ভারত রাশিয়া থেকে তেল কেনা বন্ধ না করলে ৫০০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হবে। এই বাস্তবতায় ভারত এবার যুক্তরাষ্ট্রের অনুমতি নিয়ে ভেনেজুয়েলার তেল কেনার পরিকল্পনা করছে।

সূত্রগুলো জানায়, অনুমোদন পেতে রিলায়েন্সের প্রতিনিধিরা যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনায় বসেছেন। ৩ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের হাতে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরো আটক হওয়ার পর পাঁচ কোটি ব্যারেল তেল পাঠানো নিয়ে ওয়াশিংটন ও কারাকাসের মধ্যে যে আলোচনা চলছে, তার মধ্যেই এ যোগাযোগ এগোচ্ছে।

গত বছরের গোড়ায় দ্বিতীয় দফায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর থেকেই একের পর এক বোমা মেরে যাচ্ছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। রাশিয়া থেকে জ্বালানি কেনা নিয়ে ভারত, চীন ও ব্রাজিলের মতো একাধিক দেশের ওপর ‘খড়্গহস্ত’ হয়েছেন ট্রাম্প।

ট্রাম্পের অঙ্গীকার ছিল, ক্ষমতায় আসার পরপরই রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ থামিয়ে দেবেন। কিন্তু তাঁর সেই আশার গুড়ে বালি। ভূরাজনীতিতে ঝানু খেলোয়াড় ভ্লাদিমির পুতিন ট্রাম্পের কথায় পাত্তাই দিচ্ছেন না। যুদ্ধবিরতির আলোচনা যতটুকু এগোচ্ছে, ততটুকু পুতিনের শর্তানুসারেই হচ্ছে।

এই পরিস্থিতিতে রাশিয়ার সবচেয়ে পরীক্ষিত মিত্র ভারতের ওপর চাপ প্রয়োগের কৌশল নিয়েছেন ট্রাম্প। যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়া থেকে ইউরেনিয়াম কেনা অব্যাহত রাখলেও বাস্তবতা হলো, রাশিয়া থেকে তেল কেনার ‘অপরাধে’ তারা ভারতের ওপর ৫০০ শতাংশ শুল্ক আরোপের বিল পেশ করেছে।

এমন পরিস্থিতিতে ভারতের জন্য ভেনেজুয়েলা থেকে তেল কেনার ‘বিকল্প’ খুলে রেখেছেন ট্রাম্প। ভারতের সংবাদ সংস্থা আইএএনএসের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, তারা ভারতকে একটি নতুন ব্যবস্থার মাধ্যমে ভেনেজুয়েলা থেকে তেল কেনার অনুমতি দেবে। তবে এর নিয়ন্ত্রণ মার্কিন প্রশাসনের হাতে থাকবে।

ওই প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়েছে, মার্কিন প্রশাসনের এক শীর্ষ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ট্রাম্প প্রশাসন ভারতকে ভেনেজুয়েলার তেল কেনার ক্ষেত্রে অনুমতি দিতে পারে, তবে কেনাবেচার ক্ষেত্রে কী শর্ত দেওয়া হবে, তা শুক্রবার রাত পর্যন্ত চূড়ান্ত হয়নি।

ভারত একসময় ভেনেজুয়েলার কাছ থেকে বিপুল পরিমাণে তেল কিনত। তবে পরে দক্ষিণ আমেরিকার ওই দেশের ওপর যুক্তরাষ্ট্রে বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে সেখান থেকে তেল কেনা বন্ধ করে ভারত।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, সম্প্রতি রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ কর্তৃপক্ষ নিয়মকানুন মেনে ভেনেজুয়েলার তেল কেনা নিয়ে আগ্রহ দেখিয়েছে। রিলায়েন্স কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ভেনেজুয়েলা থেকে অপরিশোধিত তেল যদি বিশ্ববাজারে বিক্রির অনুমতি দেয় হোয়াইট হাউস, সে ক্ষেত্রে তারা চুক্তি নিয়ে বিবেচনা করবে।

ভেনেজুয়েলার তেল ভারতের জন্য রাশিয়ার তেলের কিছুটা বিকল্প হতে পারে। রিলায়েন্স আগে রাশিয়ার তেলের সবচেয়ে বড় ভারতীয় ক্রেতা ছিল। তবে প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, এ মাসে তারা রাশিয়া থেকে কোনো অপরিশোধিত তেলের চালান নিচ্ছে না, রাশিয়ার তেল আমদানি বন্ধ করতে ট্রাম্পের চাপের মুখে আছে ভারত।

গুজরাটের পশ্চিমাঞ্চলে রিলায়েন্সের দুটি পরিশোধনাগার আছে। এসব পরিশোধনাগারের সম্মিলিত তেল পরিশোধন সক্ষমতা দৈনিক প্রায় ১৪ লাখ ব্যারেল। রয়টার্সের সংবাদে বলা হয়েছে, ভেনেজুয়েলার মেরেইয়ের মতো তুলনামূলক সস্তা ও ভারী অপরিশোধিত তেল সেখানে প্রক্রিয়াজাত করা যায়।

ভেনেজুয়েলা থেকে তেল আনত ভারত

রিলায়েন্স ও ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি পিডিভিএসএর মধ্যে সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার তেল–বাণিজ্যে নিষেধাজ্ঞা আরোপের আগে দেশটির অপরিশোধিত তেলের তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ বাজার ছিল ভারত। তখন তারা দৈনিক প্রায় ৪ লাখ ব্যারেল তেল আমদানি করত।

বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল পরিশোধনাগার ভারতের রিলায়েন্স। ফলে তাদের বিভিন্ন উৎস থেকে তেল সংগ্রহ করতে হয়। কয়েক বছর আগে ভেনেজুয়েলার অপরিশোধিত তেল আমদানিতে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ অনুমোদন পেয়েছিল ভারতীয় এ সংস্থা।

ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি পিডিভিএসএর অভ্যন্তরীণ নথি অনুযায়ী, ওই অনুমোদনের আওতায় ২০২৫ সালের প্রথম চার মাসে রিলায়েন্সকে চার দফায় দৈনিক গড়ে প্রায় ৬৩ হাজার ব্যারেল অপরিশোধিত তেল সরবরাহ করা হয়।

তবে মার্চ ও এপ্রিল মাসে যুক্তরাষ্ট্র পিডিভিএসএর বিভিন্ন ব্যবসায়িক অংশীদারকে দেওয়া অধিকাংশ লাইসেন্স স্থগিত করে। একই সঙ্গে মাদুরো সরকারের ওপর চাপ বাড়াতে ভেনেজুয়েলার তেল ক্রেতাদের বিরুদ্ধে শুল্ক আরোপের হুমকিও দেয় ওয়াশিংটন।