বন্ধ হচ্ছে ফক্সভাগেনের চারটি কারখানা, ছাঁটাই হবে এক লাখ
বড় ধরনের ছাঁটাইয়ে যাচ্ছে জার্মান গাড়ি কোম্পানি ফক্সভাগেন। জার্মানিতে চারটি কারখানা বন্ধ করার পাশাপাশি কোম্পানিটিতে যে কর্মী ছাঁটাই চলছে, তা বৃদ্ধি করে এক লাখে উন্নীত করার কথা ভাবছে তারা।
বিষয়টি সম্পর্কে অবগত দুটি সূত্র এ তথ্য জানিয়েছে। পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে এটি হতে পারে গাড়িশিল্পের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় পুনর্গঠনের নজির।
সূত্রগুলো বলছে, ফক্সভাগেনের তদারকি পর্ষদের সদস্যদের এ পরিকল্পনার বিষয়ে জানানো হয়েছে। আগামী ৯ জুলাইয়ের বৈঠকে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা।
চীনা প্রতিদ্বন্দ্বীদের বাড়তি চাপ, যুক্তরাষ্ট্রে গাড়ি আমদানিতে উচ্চ শুল্ক ও ইউরোপে চাহিদা কমে যাওয়ার মধ্যে কোম্পানিটি এ পদক্ষেপের কথা ভাবছে। ফক্সভাগেন আগেই বলেছিল, বর্তমান পরিস্থিতিতে তাদের ব্যবসায়িক মডেল টেকসই নয়।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, জার্মানির হ্যানোভার, জিভকাউ, এমডেন ও আউডির কারখানা বন্ধ হতে পারে। এতে ৪৫ হাজারের বেশি মানুষ চাকরি হারানোর ঝুঁকিতে পড়বেন। এর সঙ্গে আগে ঘোষিত ৫০ হাজার কর্মী ছাঁটাই হলে মোট সংখ্যা এক লাখে পৌঁছাতে পারে।
এক লাখ কর্মী ছাঁটাই ও চারটি সংযোজন কারখানা বন্ধ হলে তা হবে গাড়িশিল্পের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় পুনর্গঠন। মার্কিন গাড়ি কোম্পানি জেনারেল মোটরস (জিএম) ২০০৯ সালে দেউলিয়া হওয়ার আগের বড় ধরনের পুনর্গঠনের মধ্য দিয়ে যায়। ফক্সভাগেনের পুনর্গঠনের সঙ্গে সেই ঘটনার তুলনা করা হচ্ছে।
ফক্সভাগেনের প্রধান নির্বাহী অলিভার ব্লুমে চলতি সপ্তাহের শুরুতে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের কাছে পরিকল্পনাটি তুলে ধরেন। শ্রমিক ইউনিয়ন ও লোয়ার স্যাক্সনি রাজ্য সরকারের প্রবল বিরোধিতার মুখে সমর্থন ধরে রাখতে তিনি এ উদ্যোগ নেন। লোয়ার স্যাক্সনি ফক্সভাগেনের দ্বিতীয় বৃহত্তম শেয়ারহোল্ডার।
জার্মান সাময়িকী ম্যানেজার ম্যাগাজিন প্রথম এ পুনর্গঠনের খবর প্রকাশ করে। প্রতিবেদনে বলা হয়, আগামী পাঁচ বছরে ফক্সভাগেন তাদের বিনিয়োগ প্রায় ১৫ শতাংশ হ্রাস করবে। ফলে তাদের বিনিয়োগের পরিমাণ হবে ১৩০ বিলিয়ন বা ১৩ হাজার কোটি ইউরোর কিছু বেশি।
সাময়িকীটির তথ্য অনুযায়ী, ব্লুমে ও প্রধান অর্থ কর্মকর্তা আর্নো আন্টলিৎস ৮৯ বছর পুরোনো কোম্পানির আদ্যোপান্ত ঢেলে সাজাতে চান। এর মধ্যে মূল ফক্সভাগেন ব্র্যান্ড ও যন্ত্রাংশ ব্যবসা আলাদা কোম্পানিতে রূপ দেওয়ার পরিকল্পনাও আছে।
গত শুক্রবার শেয়ারবাজারে ফক্সভাগেনের শেয়ারদর ১৬ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে যায়। এতে বোঝা যাচ্ছে, বিনিয়োগকারীদের একাংশ এ পরিকল্পনার সফলতা নিয়ে সন্দিহান।
ফক্সভাগেনের অন্যতম শেয়ারধারী ডেকাব্যাংকের প্রতিনিধি ইঙ্গো স্পাইখ বলেন, ‘উচ্চ ব্যয় মূল সমস্যা নয়, এটি কেবল উপসর্গ। মূল সমস্যা হলো বিক্রি কমে যাওয়া; বাজারে চাহিদা আছে—এমন আকর্ষণীয় পণ্য আনতে পারলে ব্যয় নিয়ে বিতর্কও কমে যাবে।’
ফক্সভাগেনের এক মুখপাত্র গোপন নথি নিয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে তিনি বলেন, পুরো গ্রুপ, এর ব্র্যান্ড ও সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যাপক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যেতে হবে।
অন্যদিকে ফক্সভাগেনের ওয়ার্কস কাউন্সিল ও জার্মানির শক্তিশালী শ্রমিক ইউনিয়ন আইজি মেটাল যৌথ বিবৃতিতে জানিয়েছে, এ ধরনের পরিকল্পনা নিয়ে এগোনোর চেষ্টা করা হলে তারা সেটা ঠেকানোর সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে।
লোয়ার স্যাক্সনি রাজ্য সরকারও পরিকল্পনার বিরোধিতা করেছে। ফক্সভাগেনের সবচেয়ে বড় শেয়ারহোল্ডার পোরশে এসই এ বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
২০২৫ অর্থবছরে বিশ্বজুড়ে ফক্সভাগেন গ্রুপে কর্মীর সংখ্যা ছিল ৬ লাখ ৬৭ হাজার ১৬৪। এর মধ্যে প্রায় ৪৩ শতাংশই জার্মানিতে কর্মরত। এর আগেও ২০২৪ সালে জার্মানিতে কারখানা বন্ধের উদ্যোগ নিয়েছিলেন ব্লুমে। তবে শ্রমিক ইউনিয়নের তীব্র বিরোধিতার মুখে তখন পিছু হটতে হয়।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, চীনা প্রতিদ্বন্দ্বীদের উত্থানে ফক্সভাগেন এখন সবচেয়ে বড় চাপে আছে। বিশেষ করে চীনের বৈদ্যুতিক গাড়ি কোম্পানি বিওয়াইডি দ্রুত বাজার দখল করছে।
পরামর্শক প্রতিষ্ঠান অ্যালিক্স পার্টনার্সের তথ্য অনুযায়ী, চীনের বাজারে বিদেশি গাড়ি কোম্পানিগুলোর অংশীদারত্ব ২০২০ সালে ছিল ৫৭ শতাংশ, ২০২৫ সালে তা কমে ৩২ শতাংশে নেমেছে।
বহু বছর ধরে চীনের বাজারে শীর্ষ গাড়ি কোম্পানি ছিল ফক্সভাগেন। তবে ২০২৪ সালে তারা পিছিয়ে পড়ে দ্বিতীয় স্থানে চলে যায়, ২০২৫ সালে নেমে যায় তৃতীয় স্থানে।
এদিকে চীনের কোম্পানিগুলো এখন ইউরোপের বাজারেও দ্রুত বিস্তার করছে। বিওয়াইডি, চেরি, সাইক মোটর ও লিপ মোটর—এসব কোম্পানিসহ ইউরোপে চীনা কোম্পানির বাজার হিস্যা এক বছরে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। ভবিষ্যতে আরও অনেক চীনা ব্র্যান্ড ইউরোপের বাজারে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।