এদিকে রাশিয়া-জার্মানির মধ্যকার নর্ড স্ট্রিম-১ পাইপলাইন রক্ষণাবেক্ষণের জন্য গত ১০ দিন ধরে বন্ধ আছে। আজ বৃহস্পতিবার থেকে তা আবার চালু হতে পারে। তবে মস্কো কথা না–ও রাখতে পারে, এমন আশঙ্কাও আছে।

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের এক কথায় এই সন্দেহ ঘনীভূত হয়েছে। সম্প্রতি তিনি বলেছেন, এই পাইপলাইনের টারবাইন মেরামতের জন্য কানাডায় পাঠানো হয়েছে। সেখান থেকে আসার পর টারবাইনের অবস্থা কেমন থাকবে, সে বিষয়ে তিনি পরিষ্কার নন। তিনি আরও বলেন, ঝুঁকি আছে, তাই নর্ড স্ট্রিম–১ পুনরায় চালু না–ও হতে পারে।

এই পরিপ্রেক্ষিতে ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেন বিবিসিকে বলেন, ইউরোপজুড়ে গ্যাস সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা আছে। তিনি আরও বলেন, ‘রাশিয়া আমাদের হুমকি দিয়ে নিজ স্বার্থ হাসিলের চেষ্টা করছে। এ বাস্তবতায় ইউরোপকে সব ধরনের পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।’

গত বছর ইউরোপের ৪০ শতাংশ গ্যাস এসেছে রাশিয়া থেকে। রাশিয়ার গ্যাসের সবচেয়ে বড় ভোক্তা হচ্ছে জার্মানি আর তার পরেই আছে ইতালি।

এ পরিস্থিতিতে ইউরোপীয় কমিশন বলেছে, শীতের সময় রাশিয়া গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ করে দিলে ইউরোপের অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে। এতে ইউরোপের জিডিপি ১ দশমিক ৫ শতাংশ সংকুচিত হতে পারে। যুদ্ধের কারণে ইতিমধ্যে তেল-গ্যাসসহ সব ধরনের জ্বালানির দাম বেড়েছে। এই বাস্তবতায় আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) বলেছে, রাশিয়া গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করে দিলে ইউরোপ মন্দার কবলে পড়তে পারে। এই আশঙ্কায় জার্মানিসহ ইউরোপের আরও বেশ কয়েকটি দেশ গ্যাসের মজুত রাখার চেষ্টা করছে। তারা ইতিমধ্যে গ্যাস রেশনিংয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, রাশিয়া গ্যাসকে অস্ত্র বানিয়ে পশ্চিমাদের সঙ্গে টক্কর নিতে চাইছে। এই খেলা কত দূর যায় অর্থাৎ রাশিয়া বিশ্বব্যবস্থার অংশীদারি কতটা পায়, তা–ই এখন দেখার বিষয়। আর পশ্চিমা দেশগুলো সোভিয়েত ইউনিয়ন পতনের সময় রাশিয়াকে যেসব অঙ্গীকার করেছিল, সেগুলো বাস্তবায়ন না করায় রাশিয়া এই পথে হাঁটছে বলে বিশ্লেষকেরা মনে করেন।

ইউরোপীয় ইউনিয়নে গ্যাসের বড় অংশই আসে রাশিয়া থেকে ৩৫ দশমিক ১ শতাংশ। এরপর নরওয়ে থেকে আসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১৬ দশমিক ৪ শতাংশ। এ ছাড়া কাতার থেকে আসে ৬ দশমিক ৮ শতাংশ, নাইজেরিয়া থেকে ৪ দশমিক ৮ শতাংশ, আলজেরিয়া থেকে ৭ দশমিক ৭ শতাংশ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ, যুক্তরাজ্য থেকে ৩ দশমিক ২ শতাংশ।

কোভিডের কারণে উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটায় বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের চাপ পড়ে। সেই চাপ আরও অসহনীয় করে তুলেছে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। জিনিসপত্রের দাম বেড়েছে, পশ্চিমের অনেক দেশে মূল্যস্ফীতি ৩০–৪০ বছরের রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে—এসব এখন বাস্তবতা। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিতে বিদ্যুতের সংকট হয়েছে, বিদ্যুৎ ব্যবহারে সাশ্রয়ী হওয়ার জন্য খোদ রাষ্ট্র নাগরিকদের পরামর্শ দিচ্ছে। নাগরিকেরা বিদ্যুৎ সরবরাহ পাচ্ছেন না।

এ পরিস্থিতি যে এই রকম হবে, তা আগেই টের পেয়েছিলেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জ়েলেনস্কি। জুন মাসে জি৭-এর বৈঠকে যোগ দিয়ে আরজি জানিয়েছিলেন, যেভাবে হোক, শীত পড়ার আগে এই যুদ্ধ শেষ করতে হবে। সাহায্য চেয়েছিলেন বিশ্বের প্রথম সারির দেশগুলোর কাছে। শীতকালে বরফে ঢেকে যায় গোটা ইউক্রেন। ঘর গরম রাখা থেকে পানি গরম করা—সবকিছুতে বিদ্যুৎই ভরসা। বহু মানুষের মাথার ওপরে ছাদটুকুও নেই। এ অবস্থায় যুদ্ধ চললে স্রেফ ঠান্ডায় বহু মানুষ মারা যাবেন। ইউক্রেনের আবেদনে সমর্থন জানিয়েছিলেন জি-৭ এর অন্তর্ভুক্ত দেশগুলো।

গ্যাস ও তেলের মূল্যবৃদ্ধিতে বিশ্বের সব দেশই কমবেশি বিপাকে পড়েছে। বাংলাদেশ ইতিমধ্যে আমদানি ব্যয় কমাতে গ্যাস-তেল আমদানি কমিয়েছে। ফলে বিদ্যুৎ ও শিল্পোৎপাদন ব্যাহত হতে শুরু করেছে। ইতিমধ্যে সরকার বিদ্যুতের ব্যবহার কমাতে নানা ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে। রেশনিং করতে হচ্ছে। সূত্র: বিবিসি, আরটি

বিশ্ববাণিজ্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন