ওপেক কী ও কেন গঠিত হয়েছিল, কেন প্রভাব কমছে

ওপেক

বিশ্বের তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর জোট ওপেক থেকে হঠাৎই বেরিয়ে গেল সংযুক্ত আরব আমিরাত। স্বাভাবিকভাবে বিশ্বের তেলের বাজারে তাদের এই সিদ্ধান্তের প্রভাব পড়বে। এই পরিপ্রেক্ষিতে ওপেক কী, কেন গঠিত হয়েছিল, তার উদ্দেশ্য বা লক্ষ্য কী, তা নিয়ে নতুন করে আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে।

ওপেক হলো বিশ্বের শীর্ষ তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর স্থায়ী আন্তসরকারি জোট। ১৯৬০ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর ইরাকের বাগদাদে ইরান, ইরাক, কুয়েত, সৌদি আরব ও ভেনেজুয়েলা—এই পাঁচ দেশ মিলে জোটটি গড়ে ওঠে। খবর গালফ নিউজের

ওপেক গঠনের সময় বৈশ্বিক তেলের বাজারের নিয়ন্ত্রণ ছিল পশ্চিমা কিছু তেল কোম্পানির হাতে, যাদের অনানুষ্ঠানিকভাবে ‘সেভেন সিস্টার্স’ বলা হতো। উৎপাদন থেকে দাম—সবকিছুই ছিল তাদের নিয়ন্ত্রণে। এই পরিপ্রেক্ষিতে তেল উৎপাদনকারী দেশগুলো নিজেদের নীতিসমন্বয়, ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা ও সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ওপেক গঠন করে।

এই জোট গঠনের মূল লক্ষ্য হলো সদস্যদেশগুলোর তেলনীতি সমন্বয় করা, উৎপাদকদের জন্য স্থিতিশীল ও ন্যায্য দাম নিশ্চিত করা, ভোক্তাদের জন্য নিয়মিত সরবরাহ বজায় রাখা ও বিনিয়োগকারীদের জন্য যুক্তিসংগত মুনাফা নিশ্চিত করা।

বাস্তবে ওপেকের কার্যক্রম অনেকটাই নির্ভর করে উৎপাদন কোটার ওপর। সদস্যদেশগুলো নিয়মিত বৈঠকে বসে ঠিক করে, কে কত তেল উৎপাদন করবে। উৎপাদন কমলে বৈশ্বিক সরবরাহ কমে গিয়ে দাম বাড়ে আর উৎপাদন বাড়লে সরবরাহ বাড়ে ও দাম কমে। এভাবেই বৈশ্বিক জ্বালানিবাজারে সরাসরি প্রভাব ফেলে তারা।

দীর্ঘ সময় ধরে বাজারের ওঠানামা, ভূরাজনৈতিক সংকট ও বৈশ্বিক মহামারির মতো পরিস্থিতি মোকাবিলা করেছে ওপেক। ২০২০ সালে করোনাভাইরাস মহামারির সময় তেলের চাহিদা হঠাৎ কমে গেলে সংগঠনটি উৎপাদনে বড় ধরনের সমন্বয় করে, এটি ছিল ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ সমন্বয়। বৈশ্বিক জ্বালানিবাজার স্থিতিশীল রাখতে এই সিদ্ধান্তের বড় ভূমিকা ছিল।

ওপেক ও ওপেক প্লাস

ওপেক একটি আনুষ্ঠানিক আন্তর্জাতিক সংস্থা। এর নিজস্ব সনদ, সচিবালয় ও সদস্যরাষ্ট্র আছে। অন্যদিকে ওপেক+ হলো তুলনামূলক বিস্তৃত জোট, ২০১৬ সালে এটি গড়ে ওঠে। এতে ওপেকের বাইরে থাকা রাশিয়াসহ আরও কয়েকটি তেল উৎপাদনকারী দেশ যুক্ত হয়ে উৎপাদননীতি সমন্বয় করে। সংক্ষেপে বললে, ওপেক হলো মূল সংগঠন আর ওপেক প্লাস তার সম্প্রসারিত রূপ।

সদস্য কারা

বর্তমানে ওপেকের সদস্য ১২টি দেশ—সৌদি আরব, ইরান, ইরাক, কুয়েত, ভেনেজুয়েলা, লিবিয়া, আলজেরিয়া, নাইজেরিয়া, গ্যাবন, ইকুয়েটোরিয়াল গিনি, কঙ্গো ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। আমিরাতের সদস্যপদ ২০২৬ সালের ১ মে থেকে শেষ হচ্ছে। ওপেক প্লাস জোটে এসব দেশের পাশাপাশি রাশিয়া, কাজাখস্তান, আজারবাইজানসহ আরও কয়েকটি বড় তেল উৎপাদক দেশ রয়েছে।

কারা বেরিয়েছে, কেন

এই দীর্ঘ সময়ে ওপেকের সদস্যপদে বেশ কিছু পরিবর্তন এসেছে। কাতার ২০১৯ সালে তেল ছেড়ে গ্যাস খাতে গুরুত্ব দিতে সংগঠন ত্যাগ করে। ইন্দোনেশিয়া নিজেই তেল আমদানিকারক হয়ে যাওয়ায় সদস্যপদ স্থগিত করে। ইকুয়েডর আর্থিক দায়ের কারণে ২০২০ সালে বেরিয়ে যায়। গ্যাবন মাঝখানে বেরিয়ে গিয়ে পরে আবার ফিরে আসে। অ্যাঙ্গোলা উৎপাদন কোটা নিয়ে মতবিরোধে ২০২৪ সালে সংগঠন ছাড়ে।

তবে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত হলো, সংযুক্ত আরব আমিরাতের ঘোষণা। ১৯৬৭ সালে জোটে যোগ দেওয়া দেশটি ২০২৬ সালের ১ মে থেকে ওপেক ও ওপেক প্লাস—দুই জোট থেকেই সরে দাঁড়াচ্ছে। দীর্ঘদিনের উৎপাদন কোটা নিয়ে অসন্তোষ এবং নিজস্ব জ্বালানি–কৌশল জোরদারের লক্ষ্যেই এই সিদ্ধান্ত তারা নিয়েছে, বিশ্লেষকেরা এমনটাই মনে করছেন।

কমছে ওপেকের প্রভাব

তবে ১৯৭০-এর দশকে যেমন ছিল, এখন বৈশ্বিক তেলবাজারে ওপেকের প্রভাব তেমন নয়। তবে ওপেকের প্রভাব কমলেও তা একেবারে হারিয়ে যাবে না। কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার অন গ্লোবাল এনার্জি পলিসির নন-রেসিডেন্ট ফেলো ও দুবাইভিত্তিক ক্বামার এনার্জির প্রধান নির্বাহী রবিন মিলস বলেন, ‘এটি আগের মতো প্রভাবশালী থাকবে না, তবে হারিয়েও যাবে না।

১৯৭৩ সালে মধ্যপ্রাচ্যের সদস্যদেশগুলো ইসরায়েলকে সমর্থনকারী দেশগুলোর বিরুদ্ধে তেল নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে সংগঠনটি বিশ্বজুড়ে আলোচনায় আসে। প্রথমবারের মতো আরব দেশগুলো সম্মিলিতভাবে এমন সিদ্ধান্ত নেয়, বৈশ্বিক অর্থনীতি ও রাজনীতিতে যার প্রভাব ছিল গভীর।

তখন বিশ্ব তেলবাজারের প্রায় অর্ধেক নিয়ন্ত্রণ করত ওপেক। কিন্তু আজ পরিস্থিতি বদলেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও নরওয়ের মতো দেশ নিজস্ব বড় তেল উৎপাদক হিসেবে উঠে আসায় ওপেকের বাজার অংশীদারত্ব কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৩ শতাংশে। বস্তুত এখন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের বৃহত্তম তেল ও গ্যাস উৎপাদনকারী দেশ। এই যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে তাদের তেল রপ্তানিও বাড়ছে।

অন্যদিকে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে তেলের গুরুত্বও কমছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রতি আগ্রহ বাড়ছে। সেই সঙ্গে এসব ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে পারমাণবিক বিদ্যুতের প্রতি আবারও আকর্ষণ তৈরি হচ্ছে। বিবিসির এক সংবাদে বলা হয়েছে, অনেক উন্নত দেশ পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধির কথা ভাবছে।

বাস্তবতা হলো, ওপেকের প্রভাব এখনো আছে, কিন্তু একচেটিয়া নয়; তারা আর আগের মতো বিশ্ববাজার নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না।

আঞ্চলিক রাজনীতি ও আরব আমিরাত

কিছু বিশ্লেষকের মতে, সংযুক্ত আরব আমিরাতের ওপেক থেকে সরে যাওয়া শুধু বাজার বা অর্থনীতির সিদ্ধান্ত নয়।

আন্তর্জাতিক জ্বালানি ও বৈশ্বিক বিষয়াবলি নিয়ে কাজ করা পরামর্শক আনাস আবদুন আল–জাজিরায় লিখেছেন, ‘আমিরাতের এই প্রস্থান মূলত রিয়াদ ও আবুধাবির মধ্যে গভীর আঞ্চলিক বিভাজনের দৃশ্যমান প্রকাশ। উপসাগরীয় অঞ্চলের শৃঙ্খলা কীভাবে হবে, তা নিয়ে দুই ভিন্ন ও পরস্পরবিরোধী দৃষ্টিভঙ্গির বহিঃপ্রকাশ।

আল–জাজিরার সংবাদে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলা শুরুর পর ইরানের সবচেয়ে তীব্র হামলার মুখে পড়া দেশগুলোর একটি হলো আরব আমিরাত। ইরানের আঞ্চলিক প্রতিবেশীদের মধ্যে ইসরায়েল ও সব উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের (জিসিসি) দেশগুলোর মধ্যে আমিরাতই বেশি হামলার শিকার হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

জানা গেছে, আরব আমিরাত ইরানের বিরুদ্ধে আরও কঠোর অবস্থানের পক্ষে। সরকারি পর্যায়ে প্রতিরক্ষামূলক অবস্থান বজায় থাকলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি প্রকাশ্যে যুদ্ধের আহ্বান জানিয়েছেন। এর বিপরীতে সৌদি আরব, কাতার ও ওমান তুলনামূলকভাবে কূটনৈতিক সমাধানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ওপেক থেকে আমিরাতের আকস্মিক এই সরে যাওয়া প্রকৃতপক্ষে তাদের পররাষ্ট্রনীতিরই ধারাবাহিকতা, যার বদৌলতে তারা ধীরে ধীরে প্রতিবেশীদের থেকে আলাদা হয়ে যাচ্ছে।

২০২০ সালে আব্রাহাম অ্যাকর্ডের মাধ্যমে আমিরাতই প্রথম আরব দেশ হিসেবে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করে।

মধ্যপ্রাচ্য ইনস্টিটিউটের সহযোগী ফেলো গ্রেগরি গাউস তৃতীয় বুধবার এক ওয়েবিনারে বলেন, ‘মনে হচ্ছে, আমিরাত যে পার্থক্যগুলো অনুভব করছিল, এই যুদ্ধের কারণে সেগুলো আরও তীব্র হয়ে উঠছে।’

পালাবদলের ইঙ্গিত

সাবেক সৌদি তেলমন্ত্রী শেখ ইয়ামানির মন্তব্য এই প্রেক্ষাপটে তাৎপর্যপূর্ণ: পাথর ফুরিয়ে যাওয়ার কারণে প্রস্তরযুগ শেষ হয়নি। তেলের বেলায়ও একই কথা প্রযোজ্য। অর্থাৎ বিশ্ব ধীরে ধীরে বিকল্প জ্বালানির দিকে অগ্রসর হচ্ছে।

এই প্রেক্ষাপটে ইউএইর সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতের জন্য ইঙ্গিত হিসেবেও দেখা যায়। চীনে বিদ্যুতায়নে বড় বিনিয়োগের কারণে ইতিমধ্যে তেলের মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কা কিছুটা সামাল দেওয়া গেছে। হিসাব অনুযায়ী, দেশটির যানবাহন ও রেলব্যবস্থার বিদ্যুতায়নের কারণে দৈনিক তেলের চাহিদা প্রায় ১০ লাখ ব্যারেল কমেছে। বিশ্বজুড়ে এই প্রবণতা বাড়লে তেলের চাহিদা একসময় স্থিতিশীল হতে পারে।

এ বাস্তবতায় তেলের মজুত থেকে আয় বাড়িয়ে নেওয়ার কৌশল অনেকেই যুক্তিযুক্ত মনে করছেন। ইউএইর শক্তিশালী আর্থিক ভিত্তি ও বহুমুখী অর্থনীতি এই কৌশলের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

উপসাগরীয় অঞ্চলের সংঘাত কবে শেষ হবে এবং তারপর কী পরিস্থিতি তৈরি হবে, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন। তবে ইউএইর এ সিদ্ধান্ত অন্য দেশগুলোকেও একই পথে হাঁটতে উৎসাহিত করতে পারে। এতে সৌদি আরবের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হবে।

হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল আবার স্বাভাবিক হলে কিংবা নতুন পাইপলাইন নির্মাণে গতি এলে ওপেকের বাধ্যবাধকতা ছাড়া ইউএইর তেল উৎপাদন ও সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।

বর্তমান সংকটে এর তাৎক্ষণিক প্রভাব সীমিত ঠিক, কিন্তু পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে এ সিদ্ধান্ত বৈশ্বিক তেলবাজারের শক্তির ভারসাম্যই বদলে দিতে পারে।