যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক আরোপের হুমকি, তবু ভিয়েতনামে রমরমা নকল পণ্যের ব্যবসা
ভিয়েতনামের রাজধানী হ্যানয়ের উপকণ্ঠে বড় এক বাজারে নকল পণ্যের জমজমাট বেচাকেনা চলে। যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক আরোপের হুমকি ও ভিয়েতনাম সরকারের অভিযানও এই নকল পণ্যের কারবারে কোনো পরিবর্তন হয় না। রয়টার্সের সাংবাদিকদের দুই দফা সরেজমিনে ঘুরে এমন চিত্র উঠে এসেছে।
হ্যানয়ের নিন হিয়েপ পাইকারি বাজারে নকল রালফ লরেন ব্র্যান্ডের পোলো শার্ট বিক্রি করা এক নারী বিক্রেতা বলেন, ‘পুলিশ বছরে একবার টিভি ক্যামেরা নিয়ে আসে । তারা কোনো একটি দোকানে অভিযান চালানোর দৃশ্য ধারণ করে, তারপর আবার সব আগের মতোই চলতে থাকে।’
নিন হিয়েপ বিশ্বের প্রায় ৩০টি ‘কুখ্যাত বাজারের’ একটি, যেগুলোকে নকল পণ্য ও পাইরেসির কেন্দ্র হিসেবে চিহ্নিত করেছে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধির দপ্তর (ইউএসটিআর)।
ইউএসটিআর মাই-ফ্লিক্সার্জের মতো স্ট্রিমিং ওয়েবসাইটগুলোকেও চিহ্নিত করেছে। সংস্থাটির দাবি, এসব সাইট ভিয়েতনাম থেকে পরিচালিত হয় বলে ধারণা করা হচ্ছে। পাইরেটেড চলচ্চিত্র ও টিভি সিরিজ দেখিয়ে বিশ্বজুড়ে প্রতি মাসে শতকোটি দর্শক টানে। অভিযান চালানোর ঘোষণা দেওয়া হলেও ২৭ মে পর্যন্ত সাইটগুলোতে প্রবেশ করা যাচ্ছিল।
এ বিষয়ে ইউএসটিআর ও ভিয়েতনামের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় রয়টার্সের মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি।
ওয়াশিংটনের দৃষ্টিতে, ভিয়েতনামে মেধাস্বত্ব লঙ্ঘন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির জন্য গুরুতর ও ক্ষতিকর। গত ৩০ এপ্রিল দেশটিকে মেধাস্বত্ব সুরক্ষায় বিশ্বের সবচেয়ে খারাপ অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করে যুক্তরাষ্ট্র। একই সঙ্গে তদন্ত শুরুর হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়, যা শেষ পর্যন্ত বাণিজ্য শুল্ক আরোপে গড়াতে পারে।
এ সময়ের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রে ভিয়েতনামের রপ্তানি দ্রুত বেড়েছে। মার্কিন তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে ভিয়েতনামের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যঘাটতি দাঁড়ায় ৫৪ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার, যা চীন ও মেক্সিকোর মতো বড় রপ্তানিকারক দেশের চেয়ে বেশি। ট্রাম্প প্রশাসন বারবারই এই বাণিজ্যঘাটতি কমানোর কথা বলেছে।
মেধাস্বত্ব সুরক্ষায় ‘অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত বিদেশি দেশ’ হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার পর ভিয়েতনামের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দাবি করে, তারা মেধাস্বত্ব রক্ষায় ‘জোরালো প্রচেষ্টা’ চালাচ্ছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রকে ভিয়েতনামের উদ্যোগ ও অগ্রগতি ‘বস্তুনিষ্ঠ ও ভারসাম্যপূর্ণভাবে’ মূল্যায়নের আহ্বান জানানো হয় ।
চাহিদা থাকলে জোগানও থাকবে
ইউএসটিআরের ঘোষণার পরপরই ভিয়েতনাম সরকার ৭ থেকে ৩০ মে পর্যন্ত নকল পণ্য ও অনলাইন পাইরেসিবিরোধী বিশেষ অভিযান শুরু করে।
গত বছর একই ধরনের অভিযান চালানো হয়েছিল। তখন ট্রাম্প প্রশাসন ভিয়েতনাম থেকে আমদানির ওপর ৪৬ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছিল, যা পরে কমিয়ে ১০ শতাংশ করা হয়। এক বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে আলোচনা চালাচ্ছে ভিয়েতনাম। যুক্তরাষ্ট্রই দেশটির সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজার।
রয়টার্সের সাংবাদিকেরা এ মাসে দুইবার নিন হিয়েপ বাজারে যান—একবার অভিযানের আগে এবং আরেকবার ২৫ মে । সেখানে প্রায় ১০ জন দোকানির সঙ্গে কথা হয়। সবাই জানান, কর্তৃপক্ষ নিয়মিত অভিযান চালায়, তবে তার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব খুব কম। বিষয়টির স্পর্শকাতরতার কারণে কেউই পরিচয় প্রকাশ করতে চাননি।
এক বিক্রেতা জানান, সম্প্রতি পুলিশ বাজারে এসেছিল। এতে কিছু দোকান ব্র্যান্ডের নকল পণ্য প্রকাশ্যে প্রদর্শন করা কমিয়েছে। তবে তিনি বলেন, ‘ক্রয়াদেশ দিলে গুদাম থেকে এখনো নকল পণ্য চলে আসে।’
নকল পণ্যবিরোধী কার্যক্রম তদারককারী কর্তৃপক্ষও রয়টার্সের মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি।
রয়টার্সের সাংবাদিকেরা বাজারে ডজনখানেক দোকানে নকল পোশাক বিক্রি হতে দেখেছেন। এসব পোশাকে রালফ লরেন, ক্যালভিন ক্লেইন, গুচি, গ্যাপ ও আলো ইয়োগা ব্র্যান্ডের লোগো ব্যবহার করা হয়েছে । অনেক পণ্যে চীনা ভাষায় প্রস্তুতকারকের ট্যাগও ছিল। দোকানকর্মীরা স্বীকার করেন, বেশির ভাগ পণ্যই নকল। সেগুলো মূলত চীনের গুয়াংজু থেকে আসে, কিছু ভিয়েতনামেও তৈরি হয়।
আগের অভিযানগুলোরও খুব বেশি প্রভাব পড়েনি। কয়েকজন ব্যবসায়ী বলেন, অভিযান ও নতুন করব্যবস্থা ব্যবসায় কিছুটা প্রভাব ফেলেছে। হো চি মিন সিটির আরেকটি ‘কুখ্যাত বাজারে’ গত বছর পুলিশ অভিযান চালালেও সেটি এখনো সচল রয়েছে।
নিন হিয়েপের সরু গলিতে এখনো মোটরসাইকেলে করে ক্রেতারা আসছেন। তাঁরা হ্যানয় ও দেশের বিভিন্ন এলাকার দোকানে বিক্রির জন্য পণ্য কিনে নিয়ে যাচ্ছেন।
এক বিক্রেতার ভাষায়, ‘যত দিন চাহিদা থাকবে, তত দিন জোগানও থাকবে।’