এপ্রিলে বিশ্ববাজারে বেড়েছে খাদ্যের দাম, এফএওর সূচক তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ
ইরান-ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের জেরে বিশ্ববাজারে কেবল জ্বালানির দাম বাড়ছে না, বাড়ছে খাদ্যের দামও। এপ্রিলে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) সূচক তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ অবস্থানে পৌঁছেছে। সবচেয়ে বেশি বেড়েছে ভোজ্যতেলের দাম।
প্রতি মাসে ফুড প্রাইস ইনডেক্স বা খাদ্য মূল্যসূচক প্রকাশ করে এফএও। এপ্রিল মাসের সূচকে দেখা গেছে, এই সূচকের মান ১৩০ দশমিক ৭ পয়েন্টে পৌঁছেছে। ২০২৬-এর মার্চের তুলনায় বেড়েছে ১ দশমিক ৬৩ শতাংশ।
খাদ্যশস্য, চাল, রান্নার তেল, মাংস, দুগ্ধজাত পণ্য ও চিনির দামের ভিত্তিতে এই সূচক প্রণয়ন করা হয়। চলতি বছরের মার্চের তুলনায় এপ্রিলে এই পণ্যগুলোর অধিকাংশেরই দাম চড়েছে। যার জেরে সামগ্রিকভাবে ফুড প্রাইস ইনডেক্সও বেড়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এপ্রিল মাসে এ নিয়ে টানা তৃতীয় মাস এই সূচকের মান বেড়েছে, যদিও আগের মাসের তুলনায় বৃদ্ধির গতি কিছুটা কম। উদ্ভিজ্জ তেল, মাংস ও শস্যের মূল্যসূচক বিভিন্ন মাত্রায় বাড়লেও চিনি ও দুগ্ধজাত পণ্যের দাম কমায় প্রভাব কিছুটা সামাল দেওয়া গেছে বলে জানিয়েছে এফএও।
ঐতিহাসিক তুলনায় দেখা যায়, গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এবারের এপ্রিলে এই সূচকের মান ২ দশমিক ৫ পয়েন্ট বা ২ শতাংশ বেশি ছিল। তবে ২০২২ সালের মার্চে এই সূচকের মান ইতিহাসের সর্বোচ্চ অবস্থানে ছিল। সেই তুলনায় সূচকের মান এখনো ২৯ দশমিক ৬ পয়েন্ট বা ১৮ দশমিক ৪ শতাংশ নিচে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত মার্চের তুলনায় এপ্রিলে বিশ্ববাজারে সবচেয়ে বেশি বেড়েছে ভেজিটেবল অয়েল বা উদ্ভিজ্জ তেলের দাম। এই তেলের দাম মার্চের তুলনায় এপ্রিলে ৫ দশমিক ৯ শতাংশ বেড়েছে। ফলে এই তেলের দাম ২০২২ সালের জুলাইয়ের পর আবার সর্বকালীন উচ্চতায় উঠেছে।
এফএও বলছে, পাম, সয়াবিন, সূর্যমুখী ও শর্ষেজাত তেলের দাম বাড়তে থাকায় আন্তর্জাতিক বাজারে ভোজ্যতেলের মূল্যবৃদ্ধির ধারা অব্যাহত আছে। সংস্থাটির তথ্যানুসারে, এপ্রিল মাসে এ নিয়ে টানা পাঁচ মাম আন্তর্জাতিক বাজারে পাম তেলের দাম বেড়েছে। এর কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, উৎপাদনকারী কয়েকটি দেশে নীতিগত প্রণোদনার কারণে জৈব জ্বালানির চাহিদা বৃদ্ধির সম্ভাবনা এবং অপরিশোধিত জ্বালানির উচ্চমূল্য। পাশাপাশি আগামী মাসগুলোতে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় উৎপাদন কমে যেতে পারে—এমন আশঙ্কা থেকেও বাজারে বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে।
একইভাবে সয়াবিন ও শর্ষেজাত তেলের দামও বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নে জৈব জ্বালানির চাহিদা বৃদ্ধি এর মূল কারণ বলে জানিয়েছে এফএও। অন্যদিকে কৃষ্ণসাগরীয় অঞ্চলে সরবরাহসংকট অব্যাহত থাকায় সূর্যমুখী তেলের দামও বেশি। তবে আর্জেন্টিনায় তেলের উৎপাদন বেড়ে যাওয়ায় রপ্তানিযোগ্য সরবরাহ বেড়েছে। ফলে সেখানে দাম কিছুটা কমেছে।
এর আগে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হলে বিশ্ববাজারে জ্বালানির পাশাপাশি খাদ্যের দামও বেড়ে যায়। ২০২২ সালে এফএওর এই সূচকের গড় মান ১৪৪ ছাড়িয়ে যায়। যত দিন থেকে এই সূচক প্রণয়ন করা হচ্ছে, তার মধ্যে সেই বছরেই খাদ্যের দাম ছিল সবচেয়ে বেশি।
২০২৩ সালে খাদ্য সূচকের মান ১২৪-এ নেমে আসে। এরপর গত এপ্রিলে এই প্রথম তা ১৩০-এর ঘরে উঠে গেল। ফলে খাদ্য আমদানিকারী দেশগুলোর জন্য তা অশনিসংকেত বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
বিষয়টি হলো, একদিকে জ্বালানির বাড়তি দাম, আরেক দিকে খাদ্যের বাড়তি দাম—এই দুই ক্ষেত্রে বাড়তি মূল্য পরিশোধ করতে গিয়ে আমদানিকারী দেশগুলোর রিজার্ভে চাপ পড়তে পারে। ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর যা হয়েছিল।
এপ্রিলে দেশে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে
এদিকে এপ্রিল মাসে দেশে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। গত মাসে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৯ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ; মার্চে যা ছিল ৮ দশমিক ৭১ শতাংশ। খাদ্য মূল্যস্ফীতিও বেড়েছে—মার্চে যা ছিল ৮ দশমিক ২৪ শতাংশ; এপ্রিলে তা বেড়ে ৮ দশমিক ৩৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। একই সঙ্গে খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ৯ দশমিক ৫৭ শতাংশ হয়েছে।
তবে নিম্ন আয়ের ও দরিদ্র মানুষের জীবনে মধ্যে খাদ্য মূল্যস্ফীতির গুরুত্ব বেশি। কেননা, তাঁদের ব্যয়ের বড় অংশই যায় খাদ্য কিনতে। এই বাস্তবতায় খাদ্যের দাম বাড়লে নিম্ন আয়ের ও দরিদ্র মানুষেরা বিপাকে পড়েন।