ট্রাম্পের একচ্ছত্র ক্ষমতার দিন কি শেষ হয়ে আসছে

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পফাইল ছবি: এএফপি

২০২৫ সালের কথা পাঠকদের নিশ্চয়ই মনে আছে। ক্ষমতায় আসার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গণহারে শুল্ক আরোপ করেছেন। অর্থনীতির জন্য নতুন নিয়ম প্রণয়ন করেছেন। সেই সঙ্গে সরকারি সংস্থাগুলোকে ভেঙে দেওয়া বা তাদের প্রভাব খর্ব করা হয়েছে। কর হ্রাস করা হয়েছে বা ব্যয় কমানো হয়েছে।

এককথায় অর্থনীতিতে যেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। একমাত্র কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ ছাড়া সবকিছুর ওপর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ছিল একচ্ছত্র আধিপত্য।

কিন্তু এক বছরের মাথায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সেই একচ্ছত্র ক্ষমতার মেয়াদ শেষ হয়ে আসছে। নতুন বছরের প্রথম কয়েক মাসেই ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে যাচ্ছে। সুপ্রিম কোর্ট শিগগিরই ট্রাম্প প্রশাসনের আরোপ করা বিপুল হারের শুল্ক এবং প্রেসিডেন্টের ফেডারেল রিজার্ভের পর্ষদ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা—এই দুটি বিষয়েই রায় দিতে পারেন।

পাশাপাশি ফেডের নেতৃত্বের জন্য মনোনীত ব্যক্তিকে সিনেটের যাচাই-বাছাইয়ের মুখোমুখি হতে হবে। এদিকে কর ও ব্যয়ের বিষয়ে কংগ্রেস আর আগের মতো ট্রাম্পের কথা শুনছে না; তারা নিজেরাই আলাদা কর্মসূচি নিতে শুরু করতে পারে।

এ পরিস্থিতিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক ভিত নড়ে যাবে। মার্কিন অর্থনীতির চরিত্র ও তার কার্যক্রমে বড় ধরনের প্রভাব পড়বে। গত বছর সবকিছু যেমন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে ছিল, এখন তা নেই। এত বড় পরিবর্তনে তাঁর বিশেষ ভূমিকা থাকবে না বললেই চলে। কম করে হলেও বলা যায়, এতে ট্রাম্পের পক্ষে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব না–ও হতে পারে। সবচেয়ে বেশি হলে বলা যায়, তিনি এত দিন যেসব পরিবর্তন নিয়ে এসেছেন, সেগুলো উল্টে যাবে। যেটাই হোক না কেন, ট্রাম্প যে ক্ষমতার শিখরে আরোহণ করেছিলেন, সেখান থেকে আমরা বেরিয়ে আসব।

বড় বড় যে ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে, তার মধ্যে প্রথম কাতারে থাকতে পারে শুল্ক। গত নভেম্বর মাসে মার্কিন সুপ্রিম কোর্টে ইন্টারন্যাশনাল ইমার্জেন্সি ইকোনমিক পাওয়ার অ্যাক্টের ওপর শুনানি হয়েছে। ট্রাম্প যে গত বছর গণহারে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পণ্যে শুল্ক আরোপ করেছেন, তার ভিত্তি হচ্ছে এই আইন।

আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে আদালত রুলিং দেবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। রায়ে একদম এসপার-ওসপার হতে পারে, অর্থাৎ আদালত প্রশাসনের যুক্তি পুরোপুরি মেনে নিতে পারেন, যদিও এই সম্ভাবনা একেবারেই কম। তবে আদালত সরকারের কিছু সিদ্ধান্ত মেনে নেবেন এবং কিছু ক্ষেত্রে তার পরিসর সংকুচিত করবেন, এমন সম্ভাবনাই বেশি। বিষয়টি শুধু আইন-আদালতের মধ্যে সীমিত থাকবে না; বরং তার প্রভাব বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

শুল্কের ধাক্কা এখনো ভোক্তাদের কাঁধে অতটা পড়েনি। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো এত দিন ধরে সেই ধাক্কা সামলে আসছে। কিন্তু উচ্চ শুল্ক অব্যাহত থাকলে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষে তা আর সম্ভব না–ও হতে পারে। অর্থাৎ জিনিসপত্রের দাম রাতারাতি বেড়ে যেতে পারে।

সেই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যারা বাণিজ্য অংশীদার, তারাও বাণিজ্যের চুক্তি নিয়ে আবার ভাবতে পারে। আবার এমন হতে পারে, তারা পাল্টা শুল্ক আরোপ শুরু করতে পারে। এখন আদালত যদি শুল্কের বিষয়ে হস্তক্ষেপ করেন, অর্থাৎ শুল্ক কমাতে বাধ্য করেন, তাহলে ট্রাম্প প্রশাসন ভিন্ন আইনি পথে নিজেদের এজেন্ডা বাস্তবায়নের চেষ্টা করবে। ফলে ব্যবসা-বাণিজ্য ও বাজারে আবার অনিশ্চয়তা তৈরি হবে।

এটা তো শুধু শুরু; এরপর সুপ্রিম কোর্ট দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে পারেন। সেটা হলে যুক্তরাষ্ট্রের মুদ্রানীতি ও অর্থনীতির গতিপ্রকৃতি পাল্টে যেতে পারে। স্মরণকালের ইতিহাসে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ক্ষেত্রে আদালতের এমন ভূমিকা দেখা যায়নি।

গত আগস্ট মাসে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ফেডারেল রিজার্ভের গভর্নর লিসা কুককে বরখাস্ত করেছেন বলে দাবি করেন। নিম্ন আদালত ট্রাম্পের এই আদেশে বাদ সাধেন, যদিও সেই সিদ্ধান্তের বৈধতা এখন সুপ্রিম কোর্টে ঝুলে আছে। চলতি মাসে এটা নিয়ে শুনানি হবে। আদালত হয়তো ফেডারেল রিজার্ভের স্বাধীনতার পক্ষে রায় দেবেন। আবার এমন হতে পারে, তাঁরা প্রেসিডেন্টের আদেশ বহাল রেখে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতার মূলে আঘাত করবেন। অর্থাৎ প্রেসিডেন্ট যাঁদের ওপর অসন্তুষ্ট, তাঁদের সরিয়ে দিতে পারেন।

ফেডারেল রিজার্ভের বর্তমান চেয়ারম্যান জেরোম পাওয়েলের ওপর ডোনাল্ড ট্রাম্প বিশেষভাবে অসন্তুষ্ট। আগামী মে মাসে চেয়ারম্যান হিসেবে পাওয়েলের মেয়াদ শেষ হবে। তার আগেই ট্রাম্প পাওয়েলের উত্তরসূরি নির্বাচন করবেন—এমন ধারণা করা হচ্ছে। এরপর কংগ্রেসে শুনানি হবে। বিষয়টি এমন নয় যে তিনি ফেডারেল রিজার্ভ পরিচালনার যোগ্য কি না, শুনানি কেবল তা নিয়ে হবে না, বরং তিনি স্বাধীনভাবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক পরিচালনা করতে ইচ্ছুক কি না, শুনানি হবে তা নিয়ে।

তবে যিনিই এই পদে আসুন না কেন, তাঁকে বড় ধরনের প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে হবে। চেয়ারম্যান তাঁর নীতি নিয়ে কত দূর যেতে পারবেন, তার সীমারেখা টেনে দেবে আর্থিক বাজার। সেই সঙ্গে ফেডারেল রিজার্ভের বাকি ১১ নীতিনির্ধারকের সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামতের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করার প্রবণতা দেখা গেছে। এখন সুপ্রিম কোর্ট যদি এই লিসার বরখাস্তের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন বা ফেড সদস্যদের সুরক্ষা বৃদ্ধির রায় দেন, এই মতভেদ আরও বাড়বে। ফলে তখন চেয়ারম্যানের ক্ষমতা সংকুচিত হবে। এর আগে চেয়ারম্যানের ক্ষমতা কখনোই এতটা কম ছিল না।

এদিকে কংগ্রেস নিজের ক্ষমতার প্রয়োগ ঘটাবে—এমন সম্ভাবনা আছে; এতে পরিস্থিতি আরও জটিল হবে।

২০২৫ সালে দেখা গেছে, কংগ্রেস সদস্যরা মূলত বিভিন্ন বিষয়ে যেমন, কর হ্রাস, ব্যয় হ্রাস ও স্টেবলকয়েনের মতো ক্রিপ্টোকারেন্সির বৈধতা দেওয়া প্রসঙ্গে প্রেসিডেন্টের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। কিন্তু মধ্যবর্তী নির্বাচন এগিয়ে আসায় প্রেসিডেন্টের সেই একচ্ছত্র ক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে। এদিকে হাউস ও সিনেটে রিপাবলিকানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা বেশি আসনের নয়। রিপাবলিকানদের অন্তর্বর্তী কোন্দলও বাড়ছে। এ পরিস্থিতিতে রিপাবলিকান দল থেকে কয়েকজন সদস্য দলত্যাগ করলে তাঁরা সিনেট ও হাউস উভয়ই হারাতে পারেন বা অন্তত একটি হারাতে পারেন।

বিষয়টি হলো আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়িয়েছে এখন সক্ষমতা। অর্থাৎ জীবনযাত্রার যে ক্রমবর্ধমান ব্যয়, তার ভার নেওয়ার মতো সক্ষমতা মানুষের আছে কি না, সেটা। বিশেষত স্বাস্থ্যবিমার ব্যয় নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। এদিকে ১ জানুয়ারি দ্য অ্যাফোর্ডেবল কেয়ার অ্যাক্টের (এসিএ) মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। এ আইনের কারণে স্বাস্থ্যবিমা প্রিমিয়ামে মানুষ কিছুটা ছাড় পেত। কিন্তু এর মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় মানুষের পক্ষে স্বাস্থ্যবিমার ব্যয় বহন করা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েই গেছে।

ডেমোক্র্যাটরা এ পরিস্থিতির পূর্ণাঙ্গ সুযোগ নিচ্ছে। এমনকি কয়েক মাস আগে তারা সরকারকে শাটডাউন করতে বাধ্য করে। চারজন রিপাবলিক সদস্য ডিসচার্জ পিটিশনে (যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদের বিশেষ সংসদীয় পদ্ধতি। এর মাধ্যমে দলীয় নেতৃত্ব বা কমিটির বাধা উপেক্ষা করে কোনো বিল জোর করে সংসদের মূল অধিবেশনে ভোটের জন্য তোলা যায়।) সই করে বসেন। এতে বোঝা যায়, রিপাবলিকানদের গৃহবিবাদ বাড়ছে। অর্থাৎ ভোটারদের জীবনযাত্রার ব্যয়ের বিষয়টি পার্টির শৃঙ্খলাকে ছাপিয়ে যাচ্ছে।

বিষয়টি হলো, জরুরি প্রয়োজন থাকলেও অর্থনৈতিক ভারসাম্য বজায় রেখে স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় কার্যকর সংস্কার হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। বর্তমান সংকট কংগ্রেস কীভাবে সামলায়, তা থেকে অনেক কিছু বোঝা যাবে। সেটা হলো, ২০২৫ সালের কর ও ব্যয় আইনের আওতায় মেডিকেড ও পুষ্টিসহায়তা বাজেটে যে বড় কাটছাঁট করা হয়েছে, ভবিষ্যতে তা পুনর্বিবেচনা করা হবে কি না, তা বোঝা যাবে।

এই বিতর্ক এমন এক সময়ে চলছে, যখন অর্থনীতি অস্বাভাবিকভাবে অনিশ্চিত। একদিকে শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি, কমতে থাকা মূল্যস্ফীতি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা থেকে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির সম্ভাবনা, অন্যদিকে মন্দার ঝুঁকি এখনো যথেষ্ট। ফলে মূল্যস্ফীতিসংক্রান্ত স্থায়ী নীতিনির্ধারণ জটিল হয়ে উঠেছে। এমনকি এআইয়ের বুদ্‌বুদ ভেঙে পড়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

প্রেসিডেন্টের হাতে কর, ব্যয় ও মুদ্রানীতির একক ও পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের চেয়ে এই অনিশ্চয়তা বরং ভালো। এমন অচলাবস্থাই হয়তো যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির মূল শক্তিকে টিকিয়ে রাখবে। সহনশীল শ্রমশক্তি, খাপ খাইয়ে নেওয়া ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান ও ভবিষ্যৎ বিনিয়োগে আগ্রহী ভোক্তাদের মাধ্যমে তা সম্ভব হবে।

জেসন ফারম্যান: ২০১৩ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত হোয়াইট হাউসের কাউন্সিল অব ইকোনমিক অ্যাডভাইজার্সের চেয়ারম্যান ছিলেন। লেখাটি নিউইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত।