দ্য গার্ডিয়ানের এক্সপ্লেইনার
বিশ্ববাজারে তেলের দাম কত হবে, মূল্যস্ফীতি কত বাড়বে, আবারও কি মন্দা হবে
ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধের জেরে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধিতে বিশ্ব অর্থনীতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, জ্বালানি রপ্তানিনির্ভর এই অঞ্চলে সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে তা বিশ্বজুড়ে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। এতে আবারও মূল্যস্ফীতির ঢেউ তৈরির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এমন অনিশ্চয়তার মধ্যে বৈশ্বিক আর্থিক বাজারে বিক্রির চাপ বাড়ছে। বন্ড ও শেয়ার বিক্রি বেড়ে গেছে। সেই সঙ্গে বাড়ছে ভোক্তাদের খরচ। এই পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোকে আবারও সুদের হার বাড়াতে হতে পারে। তেমনটা হলে পরিবার ও ব্যবসা খাতকে সহায়তা দেওয়ার চাপ তৈরি হতে পারে।
সোমবার আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১৯ ডলার ছাড়িয়ে যায়; ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের পর যা সর্বোচ্চ। যদিও তেলের দাম আজ ৯০ ডলারে নেমে এসেছে, দাম আবার বৃদ্ধির শঙ্কা এখনই যাচ্ছে না।
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালি দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১৫০ ডলারে পৌঁছাতে পারে। সে ক্ষেত্রে ২০০৮ সালের জুলাইয়ে তেলের দাম যে ১৪৫ দশমিক ২৯ ডলারের রেকর্ড গড়েছিল, তা ছাড়িয়ে যাবে।
ইরানের দক্ষিণ সীমান্তের এই সমুদ্রপথ দিয়ে সমুদ্রপথে পরিবাহিত অপরিশোধিত তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের বড় অংশ পরিবাহিত হয়। একই সঙ্গে বিশ্বের সার পরিবহনের প্রায় এক-তৃতীয়াংশও এই পথ দিয়ে যায়।
বিনিয়োগ ব্যাংক গোল্ডম্যান স্যাকস বলেছে, ইরান কার্যত এই জলপথ অবরুদ্ধ করায় এর প্রভাব ২০২২ সালে রাশিয়ার ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞার প্রায় ১৭ গুণ বেশি। ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর তেলের দাম প্রায় ১৩৯ ডলারে উঠেছিল।
এখন পরিস্থিতি অনেকটাই নির্ভর করছে হরমুজ প্রণালি কত দিন কার্যত বন্ধ থাকে এবং তেল রপ্তানি অন্য পথে সরিয়ে নেওয়া কতটা সম্ভব হয়, তার ওপর। সৌদি আরব ইতিমধ্যে লোহিত সাগরের বন্দর দিয়ে তেল পাঠানো শুরু করেছে। তবে বেশির ভাগ রপ্তানিকারকই সরবরাহ সংকটে পড়েছে।
ফলে উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল ও গ্যাস সংরক্ষণাগার দ্রুত ভরে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে বড় তেলক্ষেত্রগুলোও সাময়িকভাবে বন্ধ করতে হতে পারে। উৎপাদন আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নিতেও সময় লাগবে। এতে জ্বালানিসংকট আরও বাড়তে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, সংঘাত যদি স্বল্প সময়ের মধ্যে শেষ হয় এবং হরমুজ দিয়ে আবার রপ্তানি শুরু হয়, তাহলে জ্বালানির দাম কিছুটা কমতে পারে। তবে জলপথের নিরাপত্তা নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকতে পারে দীর্ঘদিন। গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ক্যাপিটাল ইকোনমিকসের মতে, সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে এ বছর তেলের দাম ১০০ ডলারের ওপরে থাকতে পারে।
মূল্যস্ফীতিতে কতটা প্রভাব পড়তে পারে
বিশ্ব অর্থনীতির জন্য খুবই স্পর্শকাতর সময়ে এই যুদ্ধের সূত্রপাত। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর উচ্চ মূল্যস্ফীতি সামাল দিতে বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদহার অনেকটাই বৃদ্ধি করেছিল। সেই পর্ব ছিল শেষের দিকে। অনেক দেশ সুদের হার কমানো শুরু করেছিল। কিন্তু ইরান–সংকট সেই সম্ভাবনা উল্টো দিকে ঘুরিয়ে দিতে পারে, অর্থাৎ সুদের হার আবারও বাড়তে পারে।
২০২২ সালের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, জ্বালানির দাম বাড়লে তা দ্রুতই ভোক্তাপর্যায়ে ছড়িয়ে পড়ে। গাড়ির জ্বালানির ইতিমধ্যে বেড়েছে; গৃহস্থালির বিদ্যুৎ ও জ্বালানির খরচও বাড়তে পারে। একই সঙ্গে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের খরচ বাড়বে। ব্যবসা-বাণিজ্যের রীতি অনুযায়ী, বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের মাধ্যমে এই বাড়তি ব্যয় শেষমেশ ভোক্তার ওপরই চাপিয়ে দেওয়া হবে।
অনেক অর্থনীতিবিদ আশা করছেন, ১৯৭০-এর দশকের মতো অতি উচ্চ মূল্যস্ফীতি আবার ফিরে না–ও আসতে পারে। তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় তখন বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের মূল্যস্ফীতি হয়েছিল।
বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দীর্ঘমেয়াদি মূল্যস্ফীতির প্রত্যাশা তুলনামূলক স্থিতিশীল ছিল। রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের পরও তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে যায়নি। বোঝা যাচ্ছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর সরকারের আস্থা আছে।
ডয়চে ব্যাংকের অর্থনীতিবিদ জিম রেইড বলেন, ৫০ বছর আগে যেমন ছিল, সেই তুলনায় আজকের বিশ্ব অর্থনীতি জ্বালানির দাম বৃদ্ধির কারণে অতটা ধাক্কা খায় না। অর্থনীতিতে জ্বালানির ব্যবহার তুলনামূলক কম। সেই সঙ্গে শ্রমবাজারে ইউনিয়নের প্রভাব কম। ফলে মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে শ্রমিকের মজুরি বাড়ানোর রীতিও সে রকম নেই। ফলে ১৯৭০-এর দশকের মতো মজুরি ও দাম বৃদ্ধির চক্র শুরু হওয়ার সম্ভাবনা কম।
বৈশ্বিক মন্দার আশঙ্কা কি বাড়ছে
কোভিড মহামারি এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর কয়েক বছর ধরেই পরিবার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো উচ্চমূল্যের চাপ সামলাচ্ছে। অনেকে ইতিমধ্যে চাপে পড়েছে।
অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, নতুন করে মূল্যস্ফীতি বাড়লে ভোক্তা চাহিদা কমে যাবে এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এতে ‘স্ট্যাগফ্লেশন’—অর্থাৎ স্থবির প্রবৃদ্ধি ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির আশঙ্কাও বাড়ছে।
যুক্তরাজ্যে ডেলয়েটের প্রধান অর্থনীতিবিদ ইয়ান স্টুয়ার্ট বলেন, মন্দার আলোচনা আবার ফিরে এসেছে। তেল ও গ্যাসের দাম হঠাৎ বেড়ে যাওয়া সাধারণত অর্থনৈতিক সমস্যার আগাম সংকেত।
স্টুয়ার্টের মতে, ১৯৭৩, ১৯৭৯ ও ১৯৯০ সালে পশ্চিমা বিশ্বের মন্দার বড় কারণ ছিল মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ বা বিপ্লবের কারণে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়া। একইভাবে রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের পর জ্বালানির দাম বৃদ্ধিতে ২০২৩ সালে ইউরোপের প্রবৃদ্ধিতে ধস নামে।
উচ্চ সুদের হার ও বাড়তি ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ব্যবসায় বিনিয়োগ ও বৈশ্বিক বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এতে যেসব দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আগে থেকেই নড়বড়ে, তারা সহজেই মন্দার কবলে পড়তে পারে।
সরকারের কী করণীয়
জি-৭ দেশগুলো জানিয়েছে, বৈশ্বিক সরবরাহে ঘাটতি দেখা দিলে তারা জরুরি মজুত থেকে বাজারে তেল ছাড়তে প্রস্তুত। গত কয়েক বছরে যুক্তরাষ্ট্র নিজস্ব তেল উৎপাদন বৃদ্ধি করেছে। ফলে তারা এখন জ্বালানিতে অনেকটাই স্বনির্ভর। অন্যদিকে চীনও বড় আকারের তেল মজুত গড়ে তুলেছে।
সবচেয়ে বেশি চাপে পড়তে পারে ইউরোপীয় দেশগুলো। অধিকাংশ দেশই জ্বালানি আমদানিনির্ভর এবং তেল ও গ্যাসের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।
এই পরিস্থিতিতে সব সরকার জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চাপে পড়বে। নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানোর চাপ বাড়বে। অর্থাৎ কার্বন নিঃসরণ কম হয়—এমন অর্থনীতিতে রূপান্তরের চাপ বাড়বে। যদিও এই রূপান্তরের গতি নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক হতে পারে, যেমনটি ইউক্রেন যুদ্ধের পর হয়েছিল।
একই সঙ্গে ইউরোপে বাড়তি জ্বালানি বিলের চাপে থাকা পরিবার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে সহায়তা দিতে জরুরি আর্থিক সহায়তার দাবি উঠছে। চার বছর আগে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাজ্য এমন ব্যয়বহুল সহায়তা কর্মসূচি চালু করেছিল।
পশ্চিমা অনেক দেশের সরকারি ঋণ ও বাজেট ঘাটতি ইতিমধ্যে বেশি। ফলে নতুন করে বড় সহায়তা কর্মসূচি চালু করলে তা বৈশ্বিক বন্ড বাজারে চাপ তৈরি করতে পারে।
মিজুহো ব্যাংকের অর্থনীতিবিদ জর্ডান রচেস্টার বলেন, এখন বড় প্রশ্ন হচ্ছে—এই সংকট মোকাবিলায় বিভিন্ন দেশের সরকার কত খরচ করবে। জ্বালানি সহায়তা প্যাকেজ নিয়ে ইতিমধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে।
রচেস্টারের ভাষায়, এটি শুধু যুদ্ধ নয়, বরং আধুনিক ইতিহাসে সম্ভবত সবচেয়ে বড় জ্বালানি সরবরাহ ও লজিস্টিক সংকটের মুখে বিশ্ব।