ট্রাম্পের হামলা স্থগিত করায় তেলের দামে বড় পতন
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলা পাঁচ দিন পিছিয়ে দেওয়ার ঘোষণা দিলে আজ সোমবার বিশ্ববাজারে তেলের দাম ১৩ শতাংশের বেশি কমে যায়।
সংঘাত চতুর্থ সপ্তাহে গড়ানোর প্রেক্ষাপটে নির্ধারিত সময়সীমার কয়েক ঘণ্টা আগে দেওয়া এ ঘোষণার পর সোমবার তেলের দাম পড়ে যায়। এ খবর দিয়েছে রয়টার্স।
রয়টার্স বলছে, ব্রেন্ট ক্রুড ফিউচার্সের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১০৪ দশমিক ১ ডলারে বেচাকেনা হয়, যা ৭ দশমিক ২ শতাংশ কম। এক পর্যায়ে দাম ১৫ শতাংশ পড়ে ব্যারেলপ্রতি ৯৬ ডলারে নেমে আসে।
মার্কিন ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) তেলের দাম ৭ দশমিক ৮ শতাংশ কমে ৯০ দশমিক ৫৫ ডলারে দাঁড়ায়। এই তেলের দাম সর্বনিম্ন ৮৫ দশমিক ২৮ ডলারে নামে। এতে সাড়ে ১৩ শতাংশ দরপতন পতন হয়।
ট্রাম্প সতর্ক করে বলেছিলেন, তেহরান যদি ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সব জাহাজ চলাচলের জন্য হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি উন্মুক্ত না করে, তবে ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্র ধ্বংস করা হবে। এ জন্য আগামীকাল মঙ্গলবার সকাল প্রায় ৬ টা (বাংলাদেশ সময়) পর্যন্ত সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছিল।
তার এই মন্তব্যের পর ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডস পাল্টা হুমকি দেয়। তারা জানায়, ট্রাম্প যদি ইরানের বিদ্যুৎ অবকাঠামো সম্পূর্ণ ধ্বংস করার হুমকি বাস্তবায়ন করেন, তবে তারা ইসরায়েলের বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিগুলোতে বিদ্যুৎ সরবরাহকারী স্থাপনাগুলোতে হামলা চালাবে।
হুমকিতে তেলের বাজারে অস্থিরতা
এ দিকে সিএনবিসি সকালে জানিয়েছে, আজ সোমবার অপরিশোধিত জ্বালানি তেল ব্রেন্ট ক্রুড ফিউচার মে মাসের ডেলিভারির দাম ১ শতাংশ বেড়ে হয়েছে ১১৩ দশমিক ৩২ ডলার। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) ক্রুড প্রায় ২ দশমিক ৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে প্রতি ব্যারেল ১০১ দশমিক শূন্য ১ ডলার হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বহুজাতিক বিনিয়োগ ব্যাংক ও আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান গোল্ডম্যান স্যাকস আজ সোমবার জ্বালানি তেলের দামের পূর্বাভাস উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করেছে। সংস্থাটি বলেছে, মার্চ ও এপ্রিলে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি গড়ে ১১০ থাকবে। তাদের আগের পূর্বাভাস ছিল ৯৮ ডলার। এ ছাড়া প্রতিষ্ঠানটি ডব্লিউটিআই ক্রুডের দামের পূর্বাভাসও বাড়িয়েছে। তারা বলেছে, ডব্লিউটিআই ক্রুডের দাম মার্চে ৯৮ ও এপ্রিলে ১০৫ ডলার থাকবে।
গোল্ডম্যানের বিশ্লেষকেরা বলেন, হরমুজ প্রণালি যদি ১০ এপ্রিল পর্যন্ত স্বাভাবিকের মাত্র ৫ শতাংশ সচল থাকে, তাহলে ওই সময়ের মধ্যে দাম বাড়ার প্রবণতা থাকবে। প্রতিষ্ঠানটি আরও বলেছে, হরমুজ প্রণালি যদি ১০ সপ্তাহ ধরে স্বাভাবিকের তুলনায় মাত্র ৫ শতাংশ কার্যকর থাকে, তাহলে অপরিশোধিত তেলের দাম সম্ভবত ২০০৮ সালের রেকর্ড দরকে ছাড়িয়ে যেতে পারে। ২০০৮ সালের জুলাইতে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৪৭ ডলার ছুঁয়েছিল; যদিও কয়েক মাসের মধ্যে বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের কারণে তা ৪০ ডলারের কাছাকাছি নামতে বাধ্য হয়।
তেলের দামে নতুন করে অস্থিরতার কারণ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হুমকি। ট্রাম্প গত শনিবার ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে লেখেন, ‘ইরান যদি ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে হরমুজ প্রণালি খুলে না দেয়, তবে যুক্তরাষ্ট্র তাদের বিভিন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলা চালিয়ে সেগুলো গুঁড়িয়ে দেবে। আর শুরু করা হবে সবচেয়ে বড়টি দিয়ে!’ তারপর পাল্টা হুমকি দিয়ে ইরান বলেছে, বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো নিশানা করা হলে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্ত সব জ্বালানি ও পানির অবকাঠামোয় পাল্টা হামলা করবে ইরানি সামরিক বাহিনী।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানে হামলা চালায়। তার পর থেকেই বৈশ্বিক জ্বালানি পরিবহনে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্য জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। এতে তেলের সরবরাহ সংকটে দাম বাড়তে থাকে। যদিও ইরান বারবার নিশ্চিত করার চেষ্টা করছে, শত্রুরাষ্ট্রের চিহ্নিত জাহাজ বাদে অন্য জাহাজের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করবে তারা।
ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সির (আইইএ) নির্বাহী পরিচালক ফাতিহ বিড়োল আজ সোমবার সতর্ক করে বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি খুব গুরুতর। ১৯৭০ দশকের দুটি তেলসংকট এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবের চেয়ে অনেক খারাপ পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
আইইএর সদস্যদেশগুলো ১১ মার্চ একমত হয় যে সরবরাহ–বিঘ্ন মোকাবিলায় কৌশলগত মজুত থেকে রেকর্ড ৪০ কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল বাজারে ছাড়া হবে।
আইইএর প্রধান বলেন, তিনি এশিয়া ও ইউরোপের সরকারগুলোর সঙ্গে প্রয়োজনে আরও মজুত তেল ছাড়ার বিষয়ে পরামর্শ করছেন। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমাধান হবে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া।