ইরান যুদ্ধের জেরে বাড়তে পারে জন্মনিয়ন্ত্রণসামগ্রীর দাম

প্রতীকী ছবি

ইরান যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক সরবরাহশৃঙ্খল ব্যাহত হচ্ছে। এ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে জন্মনিয়ন্ত্রণসামগ্রীর দামও বাড়তে পারে—বিশ্বের সবচেয়ে বড় কনডম প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহীর সাক্ষাৎকারে এমন আশঙ্কার কথা উঠে এসেছে।

কনডম প্রস্তুতকারী কোম্পানি কারেক্সের সিইও গোহ মিয়াহ কিয়াত রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, যুদ্ধ কত দিন স্থায়ী হয়, তার ওপর নির্ভর করে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত দাম বাড়াতে হতে পারে। ফেব্রুয়ারির শেষ দিক থেকে যুদ্ধ ও হরমুজ প্রণালিতে অচলাবস্থার কারণে বৈশ্বিক সরবরাহশৃঙ্খল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে কনডম তৈরিতে ব্যবহৃত কিছু কাঁচামালের সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে।

গোহ বলেন, ‘পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক, দাম অনেক বেড়ে গেছে। এখন এই বাড়তি খরচ গ্রাহকদের ওপর চাপানো ছাড়া আমাদের উপায় নেই।’

মালয়েশিয়াভিত্তিক কারেক্স কনডম, ব্যক্তিগত লুব্রিকেন্ট, গ্লাভস, মেডিক্যাল ক্যাথেটার ও প্রোব কভার তৈরি করে। প্রতিষ্ঠানটি ওয়ান, ট্রাসটেক্স, ক্যারেক্স ও পাসান্তে ব্র্যান্ডের ল্যাটেক্স কনডম উৎপাদন করে। তাদের বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতা ৫০০ কোটির বেশি। তাদের পণ্য ১৩০টির বেশি দেশে রপ্তানি হয়—প্রতিষ্ঠানটির ওয়েবসাইটে এ তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।

গোহ জানান, কনডম উৎপাদন ও প্যাকেজিং খরচ বৃদ্ধির পাশাপাশি জাহাজীকরণেও বিলম্ব হচ্ছে। ‘আমরা দেখছি, অনেক কনডম এখনো জাহাজে পড়ে আছে, গন্তব্যে পৌঁছায়নি, অথচ এগুলোর চাহিদা অনেক,’ বলেন তিনি।

কখন দাম বাড়ানো হতে পারে, তা জানতে চেয়ে সিএনএন কারেক্সের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। এদিকে গোহ রয়টার্সকে জানান, কোম্পানির কাছে কয়েক মাসের চাহিদা মেটানোর মতো মজুত আছে।

কারেক্সের ম্যাসাচুসেটসভিত্তিক সহযোগী প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল প্রটেকশন করপোরেশন জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ও হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে কাঁচামাল ও উপকরণের খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

গ্লোবাল প্রটেকশনের সিইও ডেভিন ওয়েডেল সিএনএনকে দেওয়া বিবৃতিতে বলেন, আপাতত বাড়তি খরচ ভোক্তাদের ওপর চাপানোর পরিকল্পনা নেই। উপকরণের মূল্যবৃদ্ধি সাময়িক কি না, তার ওপর বিষয়টি নির্ভর করবে।

তবে ওয়েডেল সতর্ক করে বলেন, ‘হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকলে শুধু আমাদের খরচই বাড়বে না; বরং পর্যাপ্ত কনডম উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের অভাবে বাজারে কনডমের ঘাটতিও দেখা দিতে পারে।’

ওয়েডেল জানান, ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকে প্যাকেজিং উপকরণ, যেমন ফয়েল মোড়ক ও প্লাস্টিকের দাম ২০ থেকে ৩০ শতাংশ, ল্যাটেক্সের ৩০ শতাংশ, কনডম লুব্রিকেন্টের ২৫ শতাংশ ও নন-ল্যাটেক্স কনডমে ব্যবহৃত নাইট্রাইলের দাম ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।

ওয়েডেল বলেন, ‘আমরা এখনো শুল্কজনিত চাপের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর চেষ্টা করছি। ইরান যুদ্ধ যেন আগুনে ঘি ঢালার মতো। দাম বাড়ানো বা খরচ কমিয়ে বর্তমান ব্যয় সামাল দেওয়ার মতো অবস্থায় আমরা নেই। আমাদের লক্ষ্য ছিল কনডম সহজলভ্য রাখা, কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাতের কারণে সেই লক্ষ্য অর্জন প্রায় অসম্ভব।’

ইরান যুদ্ধের পর জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় তেল ও গ্যাস খাত নিয়েই মূলত আলোচনা হচ্ছে। অর্থনীতিবিদেরা আশঙ্কা করছেন, মূল্যবৃদ্ধির কারণে যেমন ভোক্তা ব্যয় কমে যেতে পারে, তেমনি তেলের ঘাটতির কারণে উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে, বিশেষ করে এশিয়া অঞ্চলে, যেখানে মধ্যপ্রাচ্যের তেলের ওপর নির্ভরশীলতা বেশি।

তবে তথাকথিত ‘ফিডস্টক’ বা পেট্রোলিয়ামজাত কাঁচামালেও যুদ্ধের প্রভাব পড়েছে—প্লাস্টিকসহ নানা উপাদান তৈরিতে এসব ব্যবহৃত হয়। এর মধ্যে আছে প্যাকেজিং উপকরণ তৈরিতে ব্যবহৃত ন্যাফথা। তার সঙ্গে আছে সিলিকন অয়েল ও অ্যামোনিয়া—এসব কনডম উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।

কেপিএমজির তেল ও গ্যাস বিভাগের বৈশ্বিক প্রধান অ্যাঞ্জি গিলডিয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, অপরিশোধিত তেল ও জ্বালানির প্রভাব নিয়ে অনেক আলোচনা হলেও ফিডস্টক ও পেট্রোকেমিক্যালের সরবরাহ নিয়েও এখন সংকট আছে।

অ্যাঞ্জি গিলডিয়া জানান, এশিয়ার প্রায় ৪১ শতাংশ ন্যাফথা মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসে। ফলে যেসব দেশ, যেমন মালয়েশিয়া, তাদের ব্যবহৃত পণ্য উৎপাদন করে তারা যদি কাঁচামাল না পায়, তাহলে ক্ষতি পুষিয়ে নিতে দাম বাড়াতে বাধ্য হবে।

তবে সমস্যা শুধু কাঁচামালে সীমাবদ্ধ নয়। মিয়ানমার, কম্বোডিয়াসহ কিছু দেশে জ্বালানি রেশনিং শুরু হয়েছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কিছু দেশে, যেমন ভিয়েতনামে, যাতায়াত ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় শিক্ষার্থীদের ঘরে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

শিল্প বিশ্লেষকেরা আশঙ্কা করছেন, এ পরিস্থিতিতে কারখানার শ্রমিকদের যাতায়াত ব্যাহত হচ্ছে। ফলে উৎপাদনের গতি কমে যেতে পারে; গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি পণ্যে যার প্রভাব পড়তে পারে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রগামী পণ্যও আছে।