ধানের জমি
ফাইল ছবি

বছরের প্রথম ফলনের পর থাইল্যান্ডের কৃষক স্রিপাই কায়েও-ইয়াম তড়িঘড়ি করে খেত পরিষ্কার করে নতুন চারা লাগিয়েছেন গত আগস্ট মাসে, যদিও থাই সরকারের নির্দেশনা ছিল চারা রোপণ না করার। মূলত পানি সংরক্ষণের জন্য থাই সরকার এই নির্দেশনা দিয়েছিল।

জমিতে চারা কেবল কয়েক ইঞ্চি বেড়েছে। সেই চারার দিকে ইঙ্গিত করে বার্তা সংস্থা রয়টার্সের কাছে থাইল্যান্ডের কেন্দ্রীয় চাই নাট প্রদেশের ৫৮ বছর বয়সী চাষি স্রিপাই বলেন, ‘এই শস্যই আমাদের আশা।’

বিশ্বের বৃহত্তম চাল রপ্তানিকারক দেশ ভারত চাল রপ্তানি সীমিত করার পর বিশ্ববাজারে চালের দাম বেড়েছে। এই খাদ্যপণ্যের দাম এখন ১৫ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। তাতে উদ্বুদ্ধ হয়েছেন থাইল্যান্ডের এই কৃষক। তিনি আবার ঋণগ্রস্তও, দুই লাখ বাথ ঋণ পরিশোধ করার চেষ্টা করছেন তিনি।

ভারত চাল রপ্তানি সীমিত করায় এখন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম চাল উৎপাদনকারী দেশ থাইল্যান্ডের কৃষকেরা লাভবান হওয়ার কথা। কিন্তু গত বছরের আগস্টের তুলনায় চলতি বছরের আগস্টে থাইল্যান্ডে ধান চাষের জমি ১৪ দশমিক ৫০ শতাংশ কমেছে। থাই সরকারের অপ্রকাশিত আনুমানিক হিসাবেই এই তথ্য মিলেছে।

২০২০ সাল থেকে প্রতিবছরই চাষের জমি কমছে। দুজন বিশেষজ্ঞের সাক্ষাৎকার ও সরকারি তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনা করে বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে থাইল্যান্ডের শতাব্দীপ্রাচীন ধান উৎপাদনের খাত মারাত্মক চাপের মুখে পড়েছে। সেই সঙ্গে আছে টেকসই নয়, এমন কৃষিঋণের ব্যবস্থা ও উদ্ভাবনের অভাব।
চাষের জমি কমে গেলে থাইল্যান্ডে ধান উৎপাদন কমে যেতে পারে। বিশ্বের অন্যান্য ধান উৎপাদনকারী দেশে খরার কারণে উৎপাদন কমে যাওয়ায় এমনিতেই খাদ্যের মূল্যস্ফীতির হার বেশি; থাইল্যান্ডে উৎপাদন কমে যাওয়ার কারণে তা আরও চাপের মুখে পড়বে।

কৃষিবিশেষজ্ঞ ও থাইল্যান্ডের সরকারি প্রতিষ্ঠান নলেজ নেটওয়ার্ক ইনস্টিটিউট অব থাইল্যান্ডের জ্যেষ্ঠ ফেলো সমপর্ন ইসভিলালন্দা বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে এ কথা বলেন।

২০২২ সালে থাইল্যান্ড বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ৭৭ লাখ টন প্রক্রিয়াজাত চাল রপ্তানি করেছে—মধ্যপ্রাচ্য থেকে শুরু করে এশিয়া, আফ্রিকাসহ অনেক দেশেই এই চাল রপ্তানি হয়।
সমপর্ন ইসভিলালন্দা আরও বলেন, বৃষ্টিপাত ও সেচের পানি কমে যাওয়ার কারণে ধান চাষের জমি কমে যাচ্ছে। থাইল্যান্ডের সরকারি পূর্বাভাসেই বলা হচ্ছে, শুষ্ক আবহাওয়ার পরিস্থিতি এল-নিনো দীর্ঘায়িত হচ্ছে এবং সে কারণে ২০২৪ সালেও পানিসংকট থাকতে পারে।

কৃষক স্রিপাই বলেন, থাইল্যান্ডের লাখ লাখ কৃষক ঋণগ্রস্ত; ভালো ফলন হলেই কেবল তাঁরা ঋণের জাঁতাকল থেকে কোনোভাবে বেরোতে পারতেন। ভালো ফলন হলে ভালো দামও মিলত। কারণ, চালের দাম আগের বছরগুলোর চেয়ে দ্বিগুণ, কোনো কোনো ক্ষেত্রে তিন গুণ।

বিশ্বে পারিবারিক পর্যায়ে সবচেয়ে বেশি ঋণ থাইল্যান্ডের মানুষের। ২০২১ সালে দেশটির ৬৬ দশমিক ৭ শতাংশ কৃষি পরিবারের ঋণ ছিল। সরকারি তথ্যেই বলা হচ্ছে, কৃষিকাজের জন্যই ঋণ নিয়েছে এসব পরিবার। তবে পরিবর্তনের সম্ভাবনায় খুশি কৃষক স্রিপাই, ‘আমি স্বপ্ন দেখছি। কারণ, ভারত চাল রপ্তানি বন্ধ করেছে।’

মন্তব্য জানার জন্য থাই সরকারের ধানবিষয়ক কার্যালয়ে যোগাযোগ করা হলেও তারা রয়টার্সের প্রশ্নের জবাব দেয়নি।

ধান থাইল্যান্ডের কৃষির প্রাণ। দেশটির চাষের জমির অর্ধেকের বেশি ধান চাষের জন্য বরাদ্দ এবং এর সঙ্গে যুক্ত ৫০ লাখের বেশি পরিবার।

গত এক দশকে বিভিন্ন থাই সরকার ধানের দাম ও চাষিদের আয় নিশ্চিতকরণে ১ লাখ ২০ হাজার কোটি থাই বাথ ব্যয় করেছে। কিন্তু সমপর্ন ইসভিলালন্দা বলেন, উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর জন্য এটা যথেষ্ট নয়। তিনি জানান, চালের দাম এখন বেশি হলেও থাইল্যান্ডের কৃষকেরা সেই সুযোগ নিতে পারছেন না। তাঁর মতে, পানি স্বল্পতার কারণে আগামী দুই মৌসুমে ধানের উৎপাদন ৩০ শতাংশ কমে যাওয়ার আশঙ্কা আছে।

থাইল্যান্ডে ধান উৎপাদনের দীর্ঘ ঐতিহ্য থাকলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভিয়েতনাম ও ভারত ধান গবেষণায় থাইল্যান্ডের চেয়ে বেশি অর্থ বরাদ্দ করছে। দেশটির কৃষকেরা বলছেন, ‘আমরা যেন নিজেদের সাফল্যের ফাঁদে আটকা পড়েছি। এক দশক আগে থাই সরকার ধান গবেষণায় ৩০ কোটি বাথ বরাদ্দ দিলেও এ বছর বরাদ্দ ১২ কোটি বাথে নেমে এসেছে।’

এ ছাড়া দেশটির কৃষকেরা সরকার অনুমোদিত জাতের ধান চাষ করতে পারেন। অন্যান্য জাতের ধান চাষ করলে তাঁদের পক্ষে ক্রেতা খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়।

থাই সরকার সাধারণত বাজার থেকে নিজেকে দূরে রাখলেও ২০১১ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইংলাক সিনাওয়াত্রা কৃষকদের বাজারমূল্যের চেয়ে বেশি দাম দেওয়ার প্রকল্প হাতে নেন। এরপর দেশটির ধান উৎপাদন বাংলাদেশ ও নেপালের চেয়ে কমে যায়।

রয়টার্স বলছে, এই পরিস্থিতিতে কৃষকদের চ্যালেঞ্জ বহুবিধ, যেমন ঋণের বোঝা থেকে শুরু করে জলবায়ু পরিবর্তন, ফলন কমে যাওয়া ইত্যাদি। সরকার অবশ্য পানি ব্যবস্থাপনা থেকে শুরু করে নতুন বাজার খুঁজে বের করা ও ঋণ পরিশোধ প্রক্রিয়া স্থগিত করে কৃষকদের সহায়তা করার আশ্বাস দিয়েছে। তবে সরকারের আশ্বাসে দেশটির কৃষকেরা কিছুটা সন্দিহানও। তাঁদের আশা, চালের উচ্চ দামের কারণে তাঁরা শেষ পর্যন্ত ঋণ পরিশোধ করতে পারবেন।