তাইওয়ান আক্রান্ত হলে চীনের ওপর কী ধরনের নিষেধাজ্ঞা দিতে পারে যুক্তরাষ্ট্র
চীন তাইওয়ানে আক্রমণ চালালে যুক্তরাষ্ট্র কী করতে পারে, সে প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে কংগ্রেসের প্রতিনিধি পরিষদের চীন–বিষয়ক কমিটি সম্প্রতি এক ‘ওয়্যার গেম’ বা রণকৌশল যাচাইয়ের খেলার আয়োজন করে। কমিটি একেবারে যুদ্ধকালীন পরিস্থিতির মতো টেবিলে মানচিত্র বিছিয়ে খুঁটিনাটি আলোচনা করে।
সেখানে দেখা গেল, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটির সক্ষমতা বাড়াতে হবে, এমনকি গুলি ও অস্ত্রও অপ্রতুল। আর অর্থনৈতিক অস্ত্র, অর্থাৎ নিষেধাজ্ঞা প্রসঙ্গে দেখা গেল, তাদের পরিকল্পনা পূর্ণাঙ্গ নয়। দ্য ইকোনমিস্টের এক প্রতিবেদনে এ খবর দেওয়া হয়েছে।
সিমুলেশনে বোঝা গেল, সে রকম পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে যুক্তরাষ্ট্রকে তড়িঘড়ি করে কিছু নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে হবে। নিষেধাজ্ঞার কৌশল হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র চীনের কিছু রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করবে। কিন্তু তারাই আবার মনে করছে, এ ধরনের নিষেধাজ্ঞা কঠোর কিছু হবে না, বরং তা সহনীয়ই হবে। ফলে যে উপসংহারে পৌঁছা গেল, তা হলো এ ধরনের নিষেধাজ্ঞার পরিকল্পনা প্রয়োজনীয়তা সৃষ্টি হওয়ার আগেই করা উচিত।
এই কিছুদিন আগেও এ ধরনের আলোচনা সতর্কতামূলক হিসেবে আখ্যা দেওয়া যেত, কিন্তু তাইওয়ান সংকট এখন অনেকটাই বাস্তব। আট মাস ধরে গবেষণাপ্রতিষ্ঠান রোডিয়াম গ্রুপের গবেষক চার্লি ভেস্ট ও আগাথা ক্রাটজ বার্লিন, ব্রাসেলস, লন্ডন ও ওয়াশিংটনের সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করে বুঝেছেন, চীন-তাইওয়ান সংঘাত ও চীনের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিষয়টি কেবল মার্কিনদের কোনো বদ্ধমূল ধারণা নয়।
নিষেধাজ্ঞার প্রভাবে কী হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু নাও থাকতে পারে। ভেস্ট বলেন, নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে, কিন্তু তাতে অর্থনীতিতে কী ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে, সে–বিষয়ক পরিষ্কার ধারণা নেই।
আটলান্টিক কাউন্সিলের কাছে পেশ করা এক প্রতিবেদনে ভেস্ট ও ক্রাটজ এর প্রতিকার দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ না হলে তাইওয়ান সংকটে কোন ধরনের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হতে পারে, সেটা তাঁরা বিবেচনা করে দেখেছেন। এ ক্ষেত্রে ব্যক্তি, শিল্প ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ওপর নানা ধরনের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হতে পারে।
এ ছাড়া ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর রাশিয়ার ওপর যে ধরনের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে, গড়পড়তাভাবে সে ধরনের কিছু নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হতে পারে। জি–৭ ভুক্ত দেশগুলো চীনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও ‘বৃহৎ চারটি’ রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের সঙ্গে লেনদেন বন্ধ করে দিতে পারে।
এসব পদক্ষেপ নেওয়া হলে চীনের বিদেশি মুদ্রার মজুতের ৯৫ শতাংশ জব্দ করা যাবে। মজুতের বাকি অংশটা সোনায় সংরক্ষিত। এ ছাড়া এর মাধ্যমে চীনের ব্যাংকগুলো তাদের বিদেশি সম্পদ থেকে বিচ্ছিন্ন হবে, যার পরিমাণ ৫৮৬ বিলিয়ন ডলার বা ৫৮ হাজার ৬০০ কোটি ডলার।
জি–৭ ভুক্ত দেশগুলোর কাছে যে ৫২ বিলিয়ন বা ৫ হাজার ২০০ কোটি ইউয়ানের রিজার্ভ আছে, সেটা তারা বাজেয়াপ্ত করতে পারবে। পরিণামে অবশ্য চীনের ব্যাংকগুলোতে তাদের যে ঋণ, আমানত ও বন্ড আছে, তার দাবি ছাড়তে হবে। তবে এটি তাদের মোট আন্তর্জাতিক সম্পদের মাত্র ১ শতাংশ।
চীনের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ৪০ শতাংশই হয় চারটি বড় ব্যাংকের মাধ্যমে, যা বিভিন্ন দেশে রক্ষিত চীনের সম্পদের প্রায় সমান। তাই এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হলে চীনের ১২৭ বিলিয়ন বা ১২ হাজার ৭০০ কোটি ডলারের প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। সেই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে আরও ১০৮ বিলিয়ন বা ১০ হাজার ৮০০ কোটি ডলারের পোর্টফোলিও বিনিয়োগ।
এ ছাড়া চীনে পশ্চিমের দেশগুলো যে বিনিয়োগ করেছে, তার মুনাফা বাবদ বছরে ১৪৮ বিলিয়ন বা ১৪ হাজার ৮০০ কোটি ডলার হারাতে পারে পশ্চিমারা। তবে পণ্য ও সেবা বাণিজ্যের যে ক্ষতি হবে, সেটা এর তুলনায় নগণ্য। চার্লি ভেস্ট ও আগাথা ক্রাটজ দেখিয়েছেন, চীনের চারটি বড় রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক প্রতিবছর ২ লাখ ৬০ হাজার কোটি ডলারের বাণিজ্যিক লেনদেন করে।
তবে চার্লি ভেস্ট ও আগাথা ক্রাটজ মনে করেন, নিষেধাজ্ঞার কিছু তাৎক্ষণিক প্রভাব অবশ্যই অনুভূত হবে। চীন তখন পুঁজির বহির্গমনে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে ইউয়ানের দরপতন ঘটাবে। তাঁরা এ-ও মনে করছেন, জি–৭ তখন অন্যান্য ব্যাংককে সেই চার ব্যাংকের শূন্যতা পূরণ করতে দেবে। তবে রপ্তানি শুরু হলে বাজারে ডলার আসবে, তাতে চীনের অর্থনীতি স্থিতিশীল হবে।
এ ক্ষেত্রে আর্থিক নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে জি–৭ আমদানি ও রপ্তানি প্রত্যক্ষভাবে সীমিত করবে। প্রতিবেদনে যেকোনো একটি শিল্পে নিষেধাজ্ঞার কথা বলা হয়েছে, যেমন অ্যারোস্পেস। সেই সঙ্গে রাসায়নিক, ধাতু, ইলেকট্রনিক, বিমান চলাচল ও যোগাযোগ সরঞ্জামের কথাও বলা হয়েছে।
এ ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হলে চীনের বিভিন্ন খাতের ১ কোটি ৩০ লাখ কর্মসংস্থান ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। তবে পরিণামে জি–৭ ভুক্ত দেশগুলোর যেসব প্রতিষ্ঠান এসব খাতে বিভিন্ন পণ্য সরবরাহ করে, তাদের ১৩ লাখ চাকরিও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
বড় পরিসরে আর্থিক নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হলে তার পরিণতি ভালো হয় না। যুদ্ধ না হলে এ ধরনের পদক্ষেপের কথা ভাবা যায় না। কিন্তু যুদ্ধ শুরু হলে আবার কঠোর নিষেধাজ্ঞার পরিণতি সামান্য হতে পারে। সশস্ত্র সংঘাত হলে জাহাজ পরিবহন ব্যাহত হতে পারে, ফলে তাইওয়ানের উচ্চ মানের চিপ পরিবহন ব্যাহত হতে পারে। তাতে বাজারে আবার আতঙ্ক তৈরি হতে পারে।
আরেক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের গবেষক জেরার্ড ডি পিপো ও জুড ব্লানশেট বলেছেন, সামরিক সংঘাত নিজেই একধরনের অবরোধ। রাশিয়ার ইউক্রেন আগ্রাসনের পর জি–৭ যে অর্থনৈতিক অস্ত্র প্রয়োগ করেছে, সেগুলো কেবল দুধারি নয়। যে পরিস্থিতিতে এগুলো ব্যবহার করার কথা, সেখানে এগুলো আবার অকার্যকর হয়ে যেতে পারে।