ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করলে তেলের দাম ১০০ ডলার ছাড়াতে পারে

ম্যাপে হরমুজ প্রণালি ও ইরানের অবস্থানফাইল ছবি: রয়টার্স

ইসরায়েল–ইরানে পাল্টাপাল্টি হামলা শুরু হওয়ার পর আবারও আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছে হরমুজ প্রণালি। ভারতের ইকুইরাস সিকিউরিটিজের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তেহরান যদি প্রতিশোধ হিসেবে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহ পথ বন্ধ করে দেয়, তাহলে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৯৫ থেকে ১১০ ডলারে উঠে যেতে পারে।

বর্তমানে ইরানের দৈনিক তেল উৎপাদন প্রায় ৩৩ লাখ ব্যারেল, যা বৈশ্বিক সরবরাহের প্রায় ৩ শতাংশ। প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়েছে, চলমান উত্তেজনার মূল বিষয় হচ্ছে এই তেল। হিসাব অনুযায়ী, প্রতি ১ শতাংশ সরবরাহ ব্যাহত হলে তেলের দাম সাধারণত ৩ থেকে ৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। সে হিসেবে শুধু ইরানের তেল সরবরাহই যদি ব্যাহত হয়, তাহলে অপরিশোধিত তেলের দাম ৯ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। খবর এনডিটিভি

বর্তমান ভিত্তিমূল্য যদি ব্যারেলপ্রতি ৭০ ডলার ধরা হয়, তাহলে শুধু প্রত্যক্ষ সরবরাহ কমার কারণেই তেলের দাম প্রায় ৬ থেকে ১১ ডলার বাড়তে পারে। এতে তেলের দাম ৭৬ থেকে ৮১ ডলারের মধ্যে উঠতে পারে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংঘাতের প্রভাব বাজারে কতটা পড়বে, তা সব সময় সরল গাণিতিক নিয়মে নির্ধারিত হয় না। হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল হুমকির মুখে পড়লে মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব হয়ে ওঠে কাঠামোগত। এমনকি আংশিক বিঘ্ন ঘটার ঝুঁকি থাকলেও ব্যারেলপ্রতি ২০ থেকে ৪০ ডলারের ‘ভূরাজনৈতিক প্রিমিয়াম’ যুক্ত হতে পারে। ফলে তেলের দাম আবারও ৯৫ থেকে ১১০ ডলার বা তারও বেশি হতে পারে, এমন শঙ্কা আছে।

এর আগে বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান গোল্ডম্যান স্যাকস বলেছিল, ইরান হরমুজ প্রণালি অবরোধ করলে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়াতে পারে। এতে বিশ্বজুড়ে উৎপাদন খরচ বাড়বে এবং শেষ পর্যন্ত ভোক্তামূল্যে এর বড় প্রভাব পড়বে। বিশেষ করে খাদ্য, পোশাক ও রাসায়নিকের মতো পণ্যে।

কয়েক দিন ধরেই তেলের দাম ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্র ইরানে আবার হামলা চালাবে, তা একরকম অনুমেয়ই ছিল। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সেনা ও অস্ত্রশস্ত্র মোতায়েন বৃদ্ধি শুরু হওয়ার পরই তেলের দামে তার প্রভাব পড়তে শুরু করে। এরপর অপরিশোধিত তেলের দাম ইতিমধ্যে প্রায় ১০ শতাংশ বেড়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এটি ভূরাজনৈতিক ঝুঁকির প্রতিফলন।

সারা বিশ্বে সমুদ্রপথে যে পরিমাণ তেল ও এলএনজি পরিবহন হয়, তার বড় অংশই হয় এই প্রণালি দিয়ে। প্রতিদিন বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের এক–পঞ্চমাংশ অর্থাৎ প্রায় দুই কোটি ব্যারেল তেল ও বিপুল পরিমাণ তরলীকৃত গ্যাস পরিবহন হয় এই হরমুজ প্রণালি দিয়ে। এটি পারস্য উপসাগরে যাওয়ার একমাত্র সামুদ্রিক প্রবেশপথ। এর এক পাশে ইরান, অন্য পাশে ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। ফলে ইরানকে ঘিরে যেকোনো সংঘাতে এই প্রণালি কৌশলগত দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

ক্রাইসিস গ্রুপের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আনুষ্ঠানিকভাবে প্রণালি বন্ধ ঘোষণা না করেও তেহরানের হাতে বিভিন্ন অস্ত্র আছে। এর মধ্যে আছে ট্যাংকার চলাচলের ক্ষেত্রে হয়রানি, সামরিক মহড়ার সময় সাময়িক নৌ চলাচল সীমাবদ্ধ করা, ড্রোন দিয়ে নজরদারি বা যেকোনো জাহাজে উঠে যাওয়ার মতো কিছু ঘটানো। এর উদ্দেশ্য হবে, সরাসরি অবরোধ না করেও বিমা ও পরিবহন ব্যয় বাড়ানো।

বাজারে বার্তা দিতে ইরান এমনিতেও জাহাজ চলাচলের গতি কমিয়ে দিতে বা এমনকি মাঝেমধ্যে জাহাজ চলাচল সীমিতও করতে পারে। তবে দীর্ঘ সময়ের জন্য প্রণালি বন্ধ হয়ে গেলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাণিজ্যে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটবে। তখন আবার রাস্তা পরিষ্কার করতে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী জড়িয়ে পড়তে পারে। একই সঙ্গে ইরানের তেল রপ্তানিও সীমিত হয়ে পড়বে।

ইকুইরাসের মতে, সাধারণত কোনো সংঘাত শুরু হলে প্রথম দিকে তেলের বাজারে ভূরাজনৈতিক প্রিমিয়াম যুক্ত হয় অর্থাৎ ভূরাজনৈতিক কারণে দাম বাড়ে। পরবর্তী সময় বাণিজ্যপথ পুনর্বিন্যাস ও সরবরাহের ক্ষেত্রে বাস্তবতা ফিরে এলে বাজার ধীরে ধীরে নতুন ভারসাম্যে পৌঁছায়।

ইরান এর আগে অনেকবার হরমুজ প্রণালি বন্ধের হুমকি দিয়েছে, কিন্তু শেষমেশ কখনোই তা বন্ধ করেনি।