বড় সংস্কার নয়, অর্থ ছড়িয়ে অর্থনীতি চাঙা করতে চায় চীন

চীন
রয়টার্স

অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে নতুন করে আর্থিক পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে চীন। মূলত ঋণ ও রাষ্ট্রীয় ব্যয় বৃদ্ধির মাধ্যমে অর্থনীতির হাল ফেরাতে চায় দেশটি, যদিও বিশ্লেষক ও অর্থনীতিবিদেরা বড় ধরনের সংস্কারের সুপারিশ করেছিলেন। চীন সেই পথে না হেঁটে বহুল ব্যবহৃত আর্থিক প্রণোদনার দিকে যাচ্ছে।

চীন সরকারের উপদেষ্টারা বাজেট ঘাটতির সীমা বৃদ্ধির পরামর্শ দিচ্ছেন। দেশটিতে বাজেট ঘাটতির সীমা ৩ শতাংশ। বিশ্লেষকেরা ২০২৪ সালের জন্য সেই সীমা বৃদ্ধির কথা বলেছেন। চীন সরকারের বিভিন্ন সূত্র ও অর্থনীতিবিদেরা রয়টার্সকে বলেছেন, সেটা হলে সরকার আরও বন্ড ছাড়তে পারবে এবং অর্থনীতির পালে হাওয়া লাগবে।

বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে চীনের প্রত্যাশাতীত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হয়েছে। ফলে ২০২৩ সালে চীন ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারবে, সেই সম্ভাবনা আরও শক্ত হয়েছে।

তৃতীয় প্রান্তিকের এই পরিসংখ্যানে চীনের বিনিয়োগকারীরা উল্লসিত হলেও কিছু কিছু বিষয়ে এখনো গুরুতর উদ্বেগ রয়ে গেছে, বিশেষ করে বেসরকারি খাতের গতি কমে যাওয়া এবং অর্থনীতিকে অভ্যন্তরীণ ভোগকেন্দ্রিক করার জন্য যেসব প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া দরকার, সেগুলো না হওয়া।

চীন সরকার এখন পর্যন্ত কেবল ভঙ্গুর অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে ব্যস্ত—অর্থনৈতিক বিপর্যয় এড়ানোই তাদের লক্ষ্য।

চীনের মন্ত্রিপরিষদের একজন উপদেষ্টা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেছেন, ‘আগামী বছরের জন্য ভালো প্রস্তুতি নেওয়ার পাশাপাশি প্রবৃদ্ধির গতি স্থিতিশীল রাখতে কাজ করছে সরকার। অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের গতি জোরদার নয়।’ তিনি আরও বলেন, আগামী বছরের জন্যও ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা উচিত।

অর্থ সংগ্রহ

এদিকে ২০ অক্টোবর চীনের সংসদ অধিবেশন শুরু হয়েছে। এই অধিবেশনে অতিরিক্ত ১৩৭ বিলিয়ন বা ১৩ হাজার ৭০০ কোটি ডলারের সার্বভৌম বন্ড অনুমোদন হওয়ার কথা। এই বন্ডের অর্থ পানি সংরক্ষণ ও বন্যা নিয়ন্ত্রণ প্রকল্পে ব্যয় হওয়ার কথা।

কোভিডের পর চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি কমে গেছে। মহামারির কারণে চীনের অর্থনীতির কিছু কাঠামোগত সমস্যা উন্মোচিত হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে চীনের প্রবৃদ্ধিকে আরও টেকসই ধারায় নিয়ে যেতে সংস্কারের দাবি জোরালো হয়েছে।

চীনের অর্থনৈতিক সংস্কার নিয়ে সম্প্রতি বেশ আলোচনা হচ্ছে। সরকারের পরামর্শকেরা আবাসন ও অবকাঠামোভিত্তিক উন্নয়নের পাশাপাশি আরও কিছু চালিকা শক্তি তৈরির তাগিদ দিয়েছেন।

যাঁরা কাঠামোগত সংস্কারের কথা বলছেন তাঁদের প্রস্তাব হলো, এমন নীতি গ্রহণ করা হোক, যাতে নগরায়ণ ও পরিবারের ব্যয়ের সক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। সেই সঙ্গে বিনিয়োগের ওপর নির্ভরশীলতা কমানো এবং রাষ্ট্রীয় ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানই যেন সমান সুযোগ পায়, তা নিশ্চিত করারও দাবি তুলেছেন তাঁরা।

এ ধরনের পরিবর্তন না হলে চীন দীর্ঘমেয়াদি মূল্যহ্রাসের দিকে ধাবিত হতে পারে, যেখানে অন্যান্য দেশ মূল্যস্ফীতির সঙ্গে লড়াই করছে। এতে দেশটির ১৪০ কোটি মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন হবে না।

কিন্তু স্বল্পমেয়াদি চাহিদার কাছে এসব দীর্ঘমেয়াদি বিষয় অনেকটাই মার খেয়ে যায়। দেখা যায়, কর্তৃপক্ষ রাজস্ব ও মুদ্রা নীতিগত সহায়তা বাড়িয়ে পরিস্থিতি মোকাবিলার চেষ্টা করে।
রয়টার্স বলছে, ২০২৩ সালে অবকাঠামো উন্নয়নে চীনের স্থানীয় সরকারের যে ৩ লাখ ৭৮ হাজার কোটি ইউয়ানের বন্ড ছাড়ার কথা ছিল, সেটা তাদের ছেড়ে দেওয়ার জন্য বলা হয়েছে।

পরামর্শকেরা বলেছেন, জিডিপির অনুপাতের চীনের কেন্দ্রীয় সরকারের ঋণ ২১ শতাংশ, যেখানে স্থানীয় সরকারের ৭৬ শতাংশ। ফলে কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষে আরও ব্যয় করার সুযোগ আছে, স্থানীয় সরকারের নয়।

এই পরিস্থিতিতে চায়না অ্যাসোসিয়েশন অব পলিসি সায়েন্সের উপপরিচালক সু হংসাই বলেন, এরপরও আগামী বছর রাজস্ব নীতির বড় ভূমিকা পালন করা উচিত। তিনি আরও বলেন, আগামী বছর প্রকৃত প্রবৃদ্ধির হার ৫ শতাংশের কম হতে পারে, তবে এর চেয়ে বেশি কমে যাওয়া ঠিক হবে না। সে ক্ষেত্রে বেকারত্ব ও আয়ের মতো সমস্যাগুলো আরও প্রকট আকার ধারণ করতে পারে।

মুদ্রানীতির বাঁধন

চীনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সম্প্রতি খুব সামান্য হারে সুদহার কমিয়ে অর্থনীতিতে আরও অর্থ সঞ্চালন করেছে। কিন্তু সুদহার কমানো হলে পুঁজি পাচার হতে পারে, সেই আশঙ্কা থেকে তারা মুদ্রানীতির বাঁধন কতটা আলগা করতে পারে, তা নিয়ে একধরনের আলোচনা তৈরি হয়েছে। কারণ, পুঁজি পাচার হলে ইউয়ানের দরপতন হবে।

তারপরও কোনো কোনো অর্থনীতিবিদ মনে করেন, সুদহার কমানোর আরও সুযোগ আছে। সরকারের নীতিপ্রণেতারা মনে করছেন, রাজনৈতিক পরিবেশের কারণে বাজারভিত্তিক সংস্কারের মতো আরও কিছু মৌলিক পরিবর্তন করার সুযোগ সীমিত। কারণ, এসবের মধ্য দিয়ে সরকার বেসরকারি খাতসহ অর্থনীতির ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে।

আগামী নভেম্বরে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির পূর্ণাঙ্গ অধিবেশন অনুষ্ঠিত হবে। এ ধরনের অধিবেশনে সাধারণত সংস্কারের বিষয়ে আলোচনা হয়। তবে এবার যাঁরা বড় সংস্কারের আশা করছেন, তাঁরা হতাশ হতে পারেন।

চীন সরকারের একটি সূত্র রয়টার্সকে বলেছে, ‘সংস্কারের বিষয়ে আমাদের জোর দিতে হবে। কারণ, অনেক সমস্যাই কাঠামোগত; কিন্তু সংস্কার বাস্তবায়ন করা কঠিন, তার জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা।’