এইচঅ্যান্ডএমের কার্যাদেশ কমায় মিয়ানমারে কারখানা বন্ধ, চাকরি হারাবেন ৩,০০০ শ্রমিক

মিয়ানমারের পতাকারয়টার্স ফাইল ছবি

মিয়ানমার থেকে ব্যবসা গোটানোর অংশ হিসেবে কার্যাদেশ কমিয়ে দিচ্ছে আন্তর্জাতিক পোশাক ক্রেতা প্রতিষ্ঠান এইচঅ্যান্ডএম। এতে মিয়ানমারে চীনা প্রতিষ্ঠান টেং হুইয়ের একটি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ইরাবতীর সংবাদে বলা হয়েছে, এইচঅ্যান্ডএমের কার্যাদেশ কমে যাওয়ায় চীনের পোশাক প্রতিষ্ঠান টেং হুই ইয়াঙ্গুনে তাদের একটি কারখানা বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে। ১৩ বছর কার্যক্রম চালানোর পর চলতি মাসের শেষে কারখানাটি বন্ধ হবে। এতে তিন হাজারের বেশি পোশাকশ্রমিক চাকরি হারাবেন।

টেং হুই মিয়ানমার জানিয়েছে, সুইডেনের ফ্যাশন ব্র্যান্ড এইচঅ্যান্ডএমের কাছ থেকে কার্যাদেশ কমে যাওয়াই কারখানাটি বন্ধের কারণ। সামরিক শাসনাধীন মিয়ানমার থেকে তারা পোশাকের সরবরাহ নেবে না। তাদের এই ঘোষণা অবশ্য নতুন নয়, ২০২৩ সালেও তারা এই পরিকল্পনার কথা জানিয়েছিল। তার অংশ হিসেবে মিয়ানমারের পোশাক কারখানায় কার্যাদেশ কমিয়ে দিচ্ছে তারা।

টেং হুই বর্তমানে ইয়াঙ্গুনের পশ্চিমাঞ্চলে পাঁচটি কারখানা পরিচালনা করছে। এসব কারখানায় মূলত নারী শ্রমিকেরা কাজ করেন। মিয়ানমারে যত পোশাক প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান কাজ করছে, তাদের মধ্যে টেং হুই অন্যতম বৃহৎ প্রতিষ্ঠান।

টেং হুইয়ের একজন ব্যবস্থাপক বলেন, শ্রমিকেরা চুক্তি ও চাকরির মেয়াদ অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ পাবেন, তবে এ বিষয়ে তিনি বিস্তারিত জানাতে রাজি হননি।

কারখানার স্থানীয় কর্মীরা টিকটকে দেওয়া ভিডিওতে জানিয়েছেন, ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ কারখানা বন্ধের বিষয়ে নোটিশ দিয়েছে। সেই সঙ্গে তাঁদের নতুন চাকরি খুঁজতে বলা হয়েছে।

টেং হুইয়ে ১০ বছর ধরে কাজ করা এক পোশাকশ্রমিক বলেন, ‘হঠাৎ কারখানা বন্ধের খবর পেয়ে ভেঙে পড়েছি।’ চাকরি হারানো শ্রমিকেরা নতুন কাজ পাবেন কি না, সে বিষয়ে তিনি উদ্বিগ্ন।

টিকটকে প্রকাশিত বিভিন্ন ভিডিওতে টেং হুইয়ের ইউনিফর্ম পরা কর্মীদের দেখা গেছে। এসব ভিডিওতে দেখা যায়, তাঁরা পরস্পরকে বিদায় জানাচ্ছেন।

মিয়ানমারের শ্রম আইন অনুযায়ী, শ্রমিকদের চাকরিচ্যুত করার ক্ষেত্রে নিয়োগকর্তাকে কমপক্ষে ৩০ দিনের নোটিশ দিতে হয়। একই সঙ্গে চাকরির মেয়াদের ভিত্তিতে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিধান আছে।

মিয়ানমারের পোশাকশ্রমিকেরা দিনে প্রায় ১০ হাজার কিয়াত মজুরি পান, এই অর্থ ৩ মার্কিন ডলারের কম।

মিয়ানমারে ২০২১ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকেই শ্রমিকসংকট, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ঘন ঘন বিদ্যুৎ-বিভ্রাটে দেশটির পোশাকশিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বেড়েছে উৎপাদন ব্যয়। বন্ধ হয়ে গেছে অনেক কারখানা।

অন্যদিকে সামরিক সরকারের আমলে শ্রমিক অধিকার লঙ্ঘনের গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। বৈশ্বিক ব্র্যান্ডগুলোর ওপর চাপ বাড়ছে, তারা যেন মিয়ানমারে কার্যাদেশ না দেয় বা সেখান থেকে সরে আসে।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) শ্রমিকদের অধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে মিয়ানমারের সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে। ইউনিয়ন নেতাদের আটক ও নির্যাতন থেকে শুরু করে জোরপূর্বক সামরিক বাহিনীতে নিয়োগ-শ্রমিক অধিকার লঙ্ঘনের বিভিন্ন অভিযোগ আছে দেশটির সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) সংবিধানের ৩৩ অনুচ্ছেদের আওতায় সংস্থাটি তার সদস্যদেশগুলোর সরকার, নিয়োগকর্তা ও শ্রমিক ইউনিয়নগুলোকে আহ্বান জানিয়েছে, তারা যেন মিয়ানমারকে আন্তর্জাতিক শ্রমমান মেনে চলতে চাপ দেয়।

কিছু পর্যবেক্ষকের মতে, মিয়ানমারের পোশাকশিল্প বয়কট করতে বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করা হলে শ্রমিকদের দুর্ভোগ আরও বাড়তে পারে। এমনিতেই সামরিক শাসনের অধীন তাদের অধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে। তার ওপর আন্তর্জাতিক ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো চলে গেলে তা হবে মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা।

২০২১ সালে মিয়ানমারের পুনরায় সামরিক শাসন জারি হওয়ার পর থেকেই পশ্চিমা ব্র্যান্ডগুলো সে দেশ থেকে ব্যবসা গোটাচ্ছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থাও ব্র্যান্ডগুলোকে মিয়ানমার ছাড়ার আহ্বান জানিয়েছে। সামরিক শাসনের মধ্যে শ্রমিক ও মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে—এই অভিযোগে গত বছর দেশটি থেকে কার্যক্রম গুটিয়ে নিতে পোশাক ব্র্যান্ডগুলোকে আহ্বান জানায় আন্তর্জাতিক ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশন ইন্ডাস্ট্রিঅল।

২০২৫ সালে এক বিবৃতিতে সংগঠনটি দাবি করে, পোশাক ও বস্ত্রশিল্প থেকে পাওয়া বৈদেশিক মুদ্রা মিয়ানমারের সামরিক জান্তার অস্ত্র, গোলাবারুদ ও জ্বালানি কেনায় ব্যবহৃত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার তদন্তেও দেশটিতে শ্রমিক অধিকার লঙ্ঘনের তথ্য উঠে আসে।

ইন্ডাস্ট্রিঅল বলছে, সামরিক শাসনের অধীন পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঝুঁকি কমানো সম্ভব নয়। তাই ব্র্যান্ডগুলোর উচিত, মিয়ানমার থেকে দায়িত্বশীলভাবে সরে গিয়ে শ্রমিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা।