দ্রুতই কমে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় তেল মজুত, কী হবে এরপর

জ্বালানি তেলফাইল ছবি

২০২২ সালের শেষ দিকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচার শুরু করার সময় ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর উত্তরসূরি জো বাইডেনের তীব্র সমালোচনা করেছিলেন। অভিযোগ ছিল, মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে জ্বালানির দাম কম রাখতে যুক্তরাষ্ট্রের জরুরি তেলভান্ডার থেকে বিপুল পরিমাণ তেল ছাড়ছেন বাইডেন।

ফ্লোরিডার মার-এ-লাগোতে ২০২৪ সালের নির্বাচনী প্রচারণা শুরুর অনুষ্ঠানে ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘আমি যে কৌশলগত জাতীয় মজুত ভরে রেখে গিয়েছিলাম, তা প্রায় খালি করে ফেলা হয়েছে। নির্বাচনের ঠিক আগে পেট্রলের দাম কম রাখতে এই কাজ করা হয়েছে।’

ট্রাম্প তখন স্ট্র্যাটেজিক পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ (এসপিআর) থেকে বাইডেন প্রশাসনের রেকর্ড পরিমাণ তেল ছাড়ার প্রসঙ্গ টেনে এ সমালোচনা করেছিলেন।

কিন্তু এখন পরিস্থিতি ভিন্ন। জ্বালানির উচ্চ মূল্য নিয়ে ভোটারদের অসন্তোষ বাড়তে থাকায় চলতি বছরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজেই জরুরি তেলভান্ডার থেকে বাইডেনের তুলনায় আরও বেশি করে তেল ছাড়ছেন।

ট্রাম্প আমলে এসপিআর থেকে তেল ছাড়ার পরিমাণ শুধু আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যায়নি, মজুতের অবশিষ্ট পরিমাণও ১৯৮০-এর দশকের প্রথম ভাগের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ের কাছাকাছি নেমে এসেছে। অথচ তখন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি ছিল অনেক ছোট এবং জ্বালানি ব্যবহারও ছিল তুলনামূলক কম।

ইরানের সঙ্গে যুদ্ধকে ঘিরে যে বৈশ্বিক তেলসংকট তৈরি হয়েছে এবং পারস্য উপসাগরে আটকে পড়া তেলের বিকল্প উৎস খুঁজতে যে প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে, ট্রাম্পের এসব পদক্ষেপ থেকে সেই সংকটের গভীরতা বোঝা যাচ্ছে।

জরুরি তেলের মজুত কমে যাওয়ার আরেকটি তাৎপর্য আছে। সংকট কেটে গেলে যুক্তরাষ্ট্রকে আবার এই ভান্ডার পূরণ করতে হবে। সেই পুনর্মজুত প্রক্রিয়ার কারণে ভবিষ্যতে তেলের চাহিদা ও দাম—উভয়ই বেশি হতে পারে।

জ্বালানি বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান কেপলারের প্রধান তেল বিশ্লেষক ম্যাট স্মিথ বলেন, এটা কোনো বিস্কুটের জার নয় যে খালি করলেই শেষ। একসময় এই ব্যারেলগুলো আবার ভরতে হবে, তাতে দাম বাড়ানোর চাপ তৈরি হবে।

যুদ্ধ–পূর্ব সময়ের তুলনায় ৫ কোটি ব্যারেল কম

মূলত সংকটজনক পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্যই এসপিআর গড়ে তোলা হয়েছিল। টেক্সাস ও লুইজিয়ানার ভূগর্ভস্থ গুহাগুলোতে সংরক্ষিত এই ভান্ডার বিশ্বের সবচেয়ে বড় জরুরি অপরিশোধিত তেলের মজুত। যুদ্ধ, ঘূর্ণিঝড় কিংবা সরবরাহব্যবস্থার বড় ধরনের বিঘ্ন—এসব পরিস্থিতিতে রিপাবলিকান ও ডেমোক্রেটিক—উভয় পার্টির প্রেসিডেন্টই অতীতে এই মজুত ব্যবহার করেছেন।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ২০২২ সালে রাশিয়া ইউক্রেনে হামলা চালানোর পর যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রলের দাম গ্যালনপ্রতি ৫ ডলারের বেশি উঠে যায়। তখন বাইডেন প্রশাসন ব্যাপক হারে এসপিআর থেকে তেল ছাড়ে। ফলে ২০২১ সালের জানুয়ারিতে প্রায় ৬৩ কোটি ৮০ লাখ ব্যারেলের মজুত ২০২৩ সালের জুলাইয়ে নেমে আসে ৩৪ কোটি ৭০ লাখ ব্যারেলে—চার দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন।

এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল এনার্জির হিসাবে, ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালি কার্যত অচল হয়ে যাওয়ার ফলে ১২০ কোটির বেশি ব্যারেল অপরিশোধিত তেলের সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে।

এ ঘাটতি পূরণে গত সপ্তাহেই এসপিআর থেকে ৯১ লাখ ব্যারেল তেল ছাড়া হয়েছে; এটি আগের সপ্তাহে গড়া সর্বকালীন রেকর্ডের খুব কাছাকাছি।

ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এসপিআরে মজুত তেলের পরিমাণ প্রায় ৫ কোটি ব্যারেল বা ১২ শতাংশ কমে ৩৬ কোটি ৫০ লাখ ব্যারেলে নেমে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি তথ্য প্রশাসনের (ইআইএ) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের এপ্রিলের পর এটিই সর্বনিম্ন মজুত।

উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই জরুরি তেল শুধু যুক্তরাষ্ট্রের শোধনাগারগুলোর জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে না। কেপলারের হিসাব অনুযায়ী, এপ্রিল ও মে মাসে এসপিআর থেকে ছাড়া তেলের প্রায় অর্ধেকই রপ্তানি করা হয়েছে।

ম্যাট স্মিথ বলেন, ‘মূলত যুক্তরাষ্ট্র এখন শেষ ভরসা; বিশ্বের সব দেশের জন্যই এই তেল প্রয়োজন।’ বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এশিয়া ও ইউরোপের দেশগুলো বড় ধাক্কা খেয়েছে। ফলে তারা বিকল্প হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের তেলের দিকে ঝুঁকছে। সংকট দীর্ঘায়িত হলে এই প্রবণতা আরও জোরালো হতে পারে।

আরবিসি ক্যাপিটাল মার্কেটসের বৈশ্বিক পণ্যকৌশল বিভাগের প্রধান হেলিমা ক্রফট সিএনএনকে বলেন, ‘ধরুন, আগামীকালই কোনো চুক্তি হয়ে গেল, তারপরও হরমুজ প্রণালিতে স্বাভাবিক চলাচল ফিরতে অন্তত ছয় সপ্তাহ লাগতে পারে। গ্রীষ্মকালে যখন চাহিদা সবচেয়ে বেশি থাকে, তখন মজুতের ওপর আরও চাপ সৃষ্টি হবে। ইউরোপে জ্বালানি রেশনিংয়ের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।’

ন্যূনতম সীমার দিকে যাচ্ছে মজুত

শুধু জরুরি মজুত নয়, যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক তেলভান্ডারও দ্রুত খালি হচ্ছে।

বিশ্ববাজারে ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) তেলের মূল্য নির্ধারণ হয় ওকলাহোমার কুশিং কেন্দ্রকে ভিত্তি করে। সেখানে মজুত তেলের পরিমাণ কত, তার দিকে বাজারের বিশেষ নজর থাকে।

কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, সাত সপ্তাহ আগে কুশিংয়ে প্রায় ৩ কোটি ৩০ লাখ ব্যারেল তেল ছিল। বর্তমানে তা কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ কোটি ৪৫ লাখ ব্যারেলে। এটি কাজ চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় সর্বনিম্ন স্তর—শিগগিরই তা ২ কোটি ব্যারেলের দিকে যাচ্ছে।

ম্যাট স্মিথ বলেন, ‘মজুত কখনোই শূন্যে নামানো যায় না। ট্যাংকের নিচে সব সময় কিছু অবশিষ্টাংশ থাকে। কার্যক্রম সচল রাখতে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ তেল থাকা জরুরি।’

হেলিমা ক্রফটও মনে করেন, ‘আমরা দ্রুতই এমন অবস্থার দিকে এগোচ্ছি, যেখানে সংরক্ষণ ট্যাংকগুলো প্রায় তলানিতে পৌঁছে যাবে।’ তবে তাঁর মতে, সম্ভাব্য যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তির আশ্বাসে বাজারের উদ্বেগ অনেকটাই কমেছে।

হেলিমা আরও বলেন, শিগগিরই সমস্যার সমাধান হচ্ছে—এমন কথা বারবার শুনতে শুনতে বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কানে ময়লা পড়ার উপক্রম।

রপ্তানিতে নিয়ন্ত্রণ আসতে পারে

জরুরি ও বাণিজ্যিক—উভয় ধরনের মজুত কমে যাওয়ার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের তেল রপ্তানি দ্রুত বাড়ছে। ফলে ওয়াশিংটন চাইলে সবচেয়ে কঠোর পদক্ষেপ হিসেবে রপ্তানিতে সীমাবদ্ধতা কিংবা নিষেধাজ্ঞার কথাও বিবেচনা করতে পারে।

এ ধরনের পদক্ষেপে সাময়িকভাবে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম কমতে পারে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এতে বৈশ্বিক জ্বালানিবাজার আরও অস্থির হয়ে উঠবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের শোধনাগার ও উৎপাদকদের বড় ক্ষতির মুখে পড়তে হতে পারে।

হোয়াইট হাউস অবশ্য জানিয়েছে, আপাতত এমন কোনো পদক্ষেপ বিবেচনায় নেই।

কেপলারের ম্যাট স্মিথের মতে, সরকারি নিষেধাজ্ঞার আগেই বাজারের স্বাভাবিক গতিবিধির কারণে যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানি কমে যেতে পারে। তাঁর ভাষায়, মজুত কমতে থাকলে, বিশেষ করে কুশিংয়ে—ডব্লিউটিআই ও ব্রেন্ট তেলের দামের ব্যবধান কমবে। তখন আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের তেলের আকর্ষণ কমে যাবে।

তবে ম্যাট স্মিথ বড় প্রশ্নও তুলেছেন, একসময় যখন যুক্তরাষ্ট্র আর বৈশ্বিক বাজারে অতিরিক্ত তেল সরবরাহ করতে পারবে না, তখন অন্য দেশগুলো কোথা থেকে অপরিশোধিত তেল পাবে?