মাদুরোকে তুলে নিয়ে যাওয়া, বিশ্ববাজারে তেলের দাম উল্টো কমেছে
ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে তুলে নিয়ে গেছে যুক্তরাষ্ট্র। এ ঘটনার জেরে বিশ্ববাজারে তেলের দামে যে প্রভাব পড়বে বলে আশঙ্কা করা হয়েছিল, বাস্তবে তা ঘটেনি। গতকাল শনিবার বিশ্ববাজারে তেলের দাম উল্টো কমেছে।
অয়েল প্রাইস ডট কমের তথ্যানুসারে, গতকাল বিশ্ববাজারে বেন্ট্র ক্রুডের দাম শূন্য দশমিক ১৬ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ৬০ ডলার ৭৫ সেন্ট নেমে এসেছে। সেই সঙ্গে ডব্লিউটিআই ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি শূন্য দশমিক ১৭ শতাংশ কমে ৫৭ ডলার ৩২ সেন্টে কমেছে। অন্যান্য ব্র্যান্ডের তেলের দামও কমেছে।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, অপরিশোধিত তেলের বাজারে একসময় যে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বা অনিশ্চয়তার ভীতি কাজ করত, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তা একরকম হারিয়ে গেছে। গত বছরের জুন মাসে বিশ্ববাসী তার নজির দেখেছে। তখন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা ধ্বংসের লক্ষ্যে বড় ধরনের বোমা হামলা চালালেও তেলের বাজারে তেমন প্রভাব পড়েনি।
এই অভিযান যদি ২০ কিংবা এমনকি ১০ বছর আগেও হতো, তাহলে বাজারে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হতো বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা। প্রায় নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, তেলের দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ত। আধুনিক প্রযুক্তির কারণে তথ্যপ্রবাহ এখন তাৎক্ষণিক। এমনকি বিনিয়োগকারীরা আগেভাগেই সরবরাহ ও চাহিদার তথ্য পেতে পারেন। ফলে বাজারে সেই হামলার প্রভাব ছিল নামমাত্র—দামের গ্রাফে শুধু ক্ষণিকের সামান্য ওঠানামা।
ফোর্বসের সংবাদে বলা হয়েছে, তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের মতো প্রত্যক্ষ সামরিক সংঘাত শুরু হওয়া ছাড়া হঠাৎ তেলের দাম অনেকটা বেড়ে যেতে পারে কেবল একটি কারণে। সেটা হলো পারস্য উপসাগর থেকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়া।
প্রতিদিন বিশ্ববাজারে যত তেল সরবরাহ হয়, তার প্রায় ২০ থেকে ২৫ শতাংশ এই গুরুত্বপূর্ণ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে টানা কয়েক দিন এই পথে জাহাজ চলাচল বন্ধ থাকলে তেলের দাম দ্রুত আকাশচুম্বী হয়ে উঠবে—সম্ভবত ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়েও পৌঁছাতে পারে। তখন চুক্তিভিত্তিক সরবরাহ নিশ্চিত করতে ব্যবসায়ীরা হুড়োহুড়ি করে তেল সংগ্রহে নামবেন। এতে বাজার আরও অস্থির হয়ে উঠবে।
ভেনেজুয়েলার প্রভাব
ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে যুক্তরাষ্ট্রের উঠিয়ে নিয়ে যাওয়ার এ ঘটনায় নিঃসন্দেহে তেলের সরবরাহে কিছুটা টান পড়বে। তাতে যে তেলের দাম বেড়ে যাবে, এমন সম্ভাবনা একেবারেই কম বলে ফোর্বসের সংবাদে বলা হয়েছে। যদিও কাগজে-কলমে বিশ্বের সবচেয়ে বড় অপরিশোধিত তেলের মজুত এ ভেনেজুয়েলায়।
একসময় বৈশ্বিক তেল বাজারে ভেনেজুয়েলা প্রভাবশালী ছিল। কিন্তু দুই দশকের বেশি সময় আগে সেই পরিস্থিতির অবসান ঘটে—দেশটির তৎকালীন সমাজতান্ত্রিক প্রেসিডেন্ট হুগো শাভেজের শাসনামলে। নিকোলাস মাদুরোর শাসন সেই পতনকে আরও গভীর করেছে। দেশটির অভ্যন্তরীণ তেলশিল্প কার্যত ভেঙে পড়েছে, ফলে বৈশ্বিক সরবরাহের হিসাবে ভেনেজুয়েলা এখনো ঠিক ‘শূন্যের কোঠায়’ না পড়লেও বাস্তবে তারা প্রায় গুরুত্বহীন হয়ে পড়েছে।
দেশটির দৈনিক উৎপাদন কমতে কমতে ২০২০ সালে মাত্র পাঁচ লাখ ব্যারেলে এসে ঠেকে। এরপর কিছুটা ঘুরে দাঁড়ালেও বর্তমানে ভেনেজুয়েলার দৈনিক তেল উৎপাদন ১০ লাখ ব্যারেলের সামান্য বেশি। এর বড় অংশই দেশটির নিজস্ব চাহিদা মেটাতে ব্যবহৃত হয়। ফলে রপ্তানির পরিমাণ দাঁড়ায় বৈশ্বিক বাজারের ১ শতাংশের কম, যে বাজারের আকার এখন দৈনিক ১০ কোটির বেশি ব্যারেল।
তেলের দাম কমছে
বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, ২০২৪ সালের মার্চে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল বা ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের ব্যারেলপ্রতি দর ছিল ৮৫ মার্কিন ডলারের কিছু বেশি। গত অক্টোবরে এই দর নেমে আসে ৬৪ ডলারের কাছাকাছি, এখন তা ৬০ ডলার।
তেলের দামে বড় উল্লম্ফন ঘটে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর। ২০২২ সালে তেলের গড় দাম ব্যারেলে ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যায়। ওই বছর সর্বোচ্চ দাম উঠেছিল ১৩৯ ডলার পর্যন্ত। সে কারণে বিশ্বজুড়ে জিনিসপত্রের দামও বাড়তে থাকে। কিন্তু ২০২৩ সাল থেকে বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমছে।
এর মধ্যে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কমতি ছিল না। তারপরও তেলের মূল্যবৃদ্ধি না পাওয়ার বড় কারণ হলো বিশ্বের বৃহত্তম তেল আমদানিকারক দেশ চীনের অর্থনীতির গতি কমে যাওয়া। চাহিদা কমে যাওয়ায় এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।