বিপর্যস্ত ইরানের অর্থনীতি, যুদ্ধবিরতিতেও কাজ হচ্ছে না
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বোমাবর্ষণে সাময়িক বিরতি আসায় এই সপ্তাহে ইরানের আরও বেশি মানুষ কাজে ফিরেছেন। তবে এই স্বস্তি ক্ষণস্থায়ী, সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি হতাশাজনক।
রাজধানী তেহরানের গ্র্যান্ড বাজারে দেখা গেছে, শনিবার অর্থাৎ সপ্তাহের প্রথম কর্মদিবসে আগের তুলনায় বেশি দোকান খোলা ছিল। সেই সঙ্গে এসব দোকানপাট খোলাও ছিল দীর্ঘ সময়।
বুধবার ভোরে ঘোষিত যুদ্ধবিরতির আগের সময়ের চেয়ে যে পরিস্থিতি ভালো, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তবে ব্যবসায়ীরা বলছেন, বিক্রি এখনো যুদ্ধ-পূর্ব সময়ের তুলনায় অনেক কম। গ্র্যান্ড বাজারের এক ধাতব পণ্য, যন্ত্রপাতি ও হালকা শিল্পসামগ্রী বিক্রেতা বলেন, বাজারে প্রায় পূর্ণাঙ্গ স্থবিরতা নেমে এসেছে।
সেই বিক্রেতা বলেন, পাইকারদের কাছ থেকে কিছু পণ্যের নতুন মূল্যতালিকা পেয়েছেন, যেখানে দেখা যাচ্ছে, জানুয়ারির শেষের তুলনায় সবকিছুর দাম প্রায় ২০ থেকে ৩০ শতাংশ বেশি। যুদ্ধের কারণে ভবিষ্যতে কখন, আদৌ, কী পরিমাণে ও কী দামে নতুন পণ্য আমদানি করা সম্ভব হবে, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা আছে বলে তিনি জানান।
বিক্রেতা আরও বলেন, জানুয়ারির দামও আগের মাসগুলোর তুলনায় অনেক বেশি ছিল। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, দেশজুড়ে বিক্ষোভ, সহিংসতা ও কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা প্রায় সম্পূর্ণ ইন্টারনেট শাটডাউনের কারণে মূল্যস্ফীতি বেড়ে গিয়েছিল। ওই বিক্ষোভে সহস্রাধিক মানুষ নিহত হয় এবং প্রায় ২০ দিন দেশজুড়ে ইন্টারনেট কার্যত বন্ধ ছিল।
এরপর ফেব্রুয়ারি ২৮ তারিখে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরানে আবারও প্রায় সম্পূর্ণ ইন্টারনেট শাটডাউন চলছে। ফলে অসংখ্য পরিবারের আয়ের পথ বন্ধ হয়ে গেছে। একদিকে শহরজুড়ে বোমা হামলা, অন্যদিকে ক্রমাবনতিশীল অর্থনীতি—এই দুটি বিষয়ের সঙ্গেই ইরানিদের লড়াই করতে হচ্ছে।
তেহরানে বসবাসরত এক তরুণী বলেন, ‘আমি বুঝতে পারি না, কেন কর্তৃপক্ষ মনে করছে না যে ইন্টারনেটও বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতোই গুরুত্বপূর্ণ বেসামরিক অবকাঠামো; এটাই যুক্তরাষ্ট্রের হামলার ঝুঁকিতে আছে।’
এই তরুণী পেশায় অনলাইন ইংরেজি শিক্ষক। আগে গুগল মিট ব্যবহার করে শিক্ষার্থীদের পড়াতেন। এখন বাধ্য হয়ে রাষ্ট্র-নিয়ন্ত্রিত স্থানীয় প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করছেন, কিন্তু এটি ইন্ট্রানেটভিত্তিক সীমিত সেবা। বিশ্বব্যাপী ইন্টারনেট না থাকলে যাতে অন্তত সেবা পুরোপুরি বন্ধ না হয়ে যায়, সে জন্য এই ব্যবস্থা।
তরুণী শিক্ষকের অভিযোগ, এসব স্থানীয় মেসেজিং সেবা ও প্ল্যাটফর্ম নিরাপত্তা ও ডেটা এনক্রিপশনের দিক থেকে দুর্বল। এগুলোতে কেবল ইরানি আইপি ব্যবহারকারীরাই প্রবেশ করতে পারেন। ফলে বিদেশে বসবাসরত তাঁর শিক্ষার্থীরা ক্লাসে যুক্ত হতে পারছে না।
গ্র্যান্ড বাজারের ওই বিক্রেতা জানান, তাদের অনলাইন বিক্রি প্রায় শূন্যে নেমে এসেছে। গ্রাহকেরা ওয়েবসাইট খুঁজে পাচ্ছেন না। বিশেষ ব্যবস্থায় এসব ওয়েবসাইটে প্রবেশ করা যায়, কিন্তু তার পরিসর একেবারেই সীমিত।
প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ানের সরকার চলমান যুদ্ধ ও জানুয়ারির বিক্ষোভের আগেই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, ইন্টারনেটের নিয়ন্ত্রণ শিথিল করা হবে। কিন্তু এখন তারা বলছে, ‘নিরাপত্তাজনিত কারণে’ এই সীমাবদ্ধতা বহাল থাকবে।
তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিমন্ত্রী সত্তার হাশেমি গত সপ্তাহে বলেন, কিছু নির্বাচিত ডিজিটাল ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে ‘লক্ষ্যভিত্তিক ও সমন্বিত সহায়তা’ দেওয়া হবে। যেমন, ঋণ ও উন্নত ইন্টারনেট সংযোগ। তবে এই সহায়তা কীভাবে বাস্তবায়ন হবে বা যারা সরকারি সহায়তা পাবে না, তারা কীভাবে ব্যবসা চালাবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
এদিকে কয়েকটি টেলিযোগাযোগ প্রতিষ্ঠান ‘ইন্টারনেট প্রো’ নামে নতুন পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। এতে বিভিন্ন পেশা ও ব্যবহারকারীর জন্য ভিন্ন ধাঁচের ইন্টারনেট সংযোগ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এটি অবশ্য দেশটির বহুদিনের পরিকল্পিত স্তরভিত্তিক ইন্টারনেট ব্যবস্থার অংশ।
সর্বত্র ছাঁটাই
ইরানের অর্থনীতিতে চাপ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বেসামরিক অবকাঠামোর ওপর হামলার প্রভাব কী, তা ভবিষ্যতে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইতিমধ্যে ইরানের বড় ইস্পাত কারখানা, পেট্রোকেমিক্যাল শিল্প, অ্যালুমিনিয়াম উৎপাদনকেন্দ্র, বিমানবন্দর ও বেসামরিক বিমান, বন্দর ও কাস্টমস কর্তৃপক্ষ, সেতু ও রেল নেটওয়ার্ক আর তেল-গ্যাস স্থাপনায় হামলা চালিয়ে অনেক ক্ষেত্রেই কার্যক্রম অচল করে দিয়েছে।
যুদ্ধ আজ শেষ হলেও এসব পুনর্গঠনে অনেক বছর লাগতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অথচ যুদ্ধের আগেই দেশটি বড় ধরনের বাজেট সংকটে ছিল। সেই সঙ্গে পারমাণবিক কর্মসূচির কারণে যুক্তরাষ্ট্র ও জাতিসংঘের কঠোর নিষেধাজ্ঞা শিথিল হওয়ার সম্ভাবনাও নেই। বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধির পথে এসব বড় বাধা।
এদিকে পাকিস্তানেরর মাটিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে শান্তি আলোচনা ইতিমধ্যে ভেস্তে গেছে। মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে এখন ৫০ হাজারের বেশি মার্কিন সেনা মোতায়েন আছে, সঙ্গে আছে বিমানবাহী রণতরী ও অন্যান্য সামরিক সরঞ্জাম। ওয়াশিংটন হুঁশিয়ারি দিয়েছে, প্রয়োজনে স্থল অভিযান চালিয়ে ইরানের আরও তেল-গ্যাস স্থাপনা ধ্বংস করা হতে পারে এবং হরমুজ প্রণালি জোর করে খুলে দেওয়ার চেষ্টা করা হতে পারে।
অন্যদিকে দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতি, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, এক বছরের মধ্যে দুটি বড় যুদ্ধ ও দুই মাসের বেশি সময় ধরে প্রায় সম্পূর্ণ ইন্টারনেটবিহীন অবস্থা—সব মিলিয়ে ইরানের অর্থনীতির সব খাতই ক্ষতিগ্রস্ত।
প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো এখন কয়েক মাসের বেশি মেয়াদে চুক্তি করছে না, বড় গাড়ি কোম্পানিগুলো হাজার হাজার কর্মী ছাঁটাই করেছে, রাষ্ট্রীয় ও বেসরকারি গণমাধ্যমের অনেক সাংবাদিক চাকরি হারিয়েছেন।
তেহরানের এক অনলাইন কনটেন্ট নির্মাতা বলেন, তিনি ও তাঁর মতো অনেকে আরও অনেক আগেই সামান্য সঞ্চয়টুকু শেষ করে ফেলেছেন। এখন তিনি নিজের কিছু পেশাগত সরঞ্জাম ও ব্যক্তিগত জিনিসপত্র বিক্রির চেষ্টা করছেন, কিন্তু বাজারদরের চেয়ে কম দামে বিক্রি করতে চাইলেও ক্রেতা মিলছে না।
কনটেন্ট নির্মাতার ভাষ্য, ‘যুদ্ধ থাকুক বা না থাকুক, মনে হচ্ছে, আমরা অনেক দিন ধরেই মৃত। শুধু আমাদের কণ্ঠই স্তব্ধ নয়, মৌলিক প্রয়োজন মেটাতেও আমাদের লড়াই করতে হচ্ছে।’