সোনার দাম বিশ্ববাজারে টানা ১০ দিন ধরে কমছে, এক মাসে কমেছে ৮০১ ডলার
টানা ১০ দিন ধরে বিশ্ববাজারে সোনার দাম কমছে। সেই ধারাবাহিকতায় আজ মঙ্গলবার সোনার দাম ১ শতাংশের বেশি কমেছে। ইকোনমিক টাইমসের সংবাদে বলা হয়েছে, মার্কিন ডলারের দাম বেড়ে যাওয়া এবং ফেডারেল রিজার্ভের সুদহার কমানোর সম্ভাবনা কমে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দাম কমছে।
আজ সকালে নিউইয়র্কের বাজারে সোনার দাম আউন্সপ্রতি ৫২ ডলার ৪৯ সেন্ট বা ১ দশমিক ১৯শতাংশ কমেছে। ফলে বিশ্ববাজারে এখন সোনার দাম আউন্সপ্রতি ৪ হাজার ৩৪৭ ডলার। গত ৩০ দিনে সোনার দাম কমেছে ৮০১ ডলার ৪৭ সেন্ট বা ১৫ দশমিক ৪০ শতাংশ।
ইরানের সঙ্গে ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ চতুর্থ সপ্তাহে গড়িয়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি উত্তেজনা বৃদ্ধির পর থেকে স্পট মার্কেটে সোনার দাম প্রায় ১৫ শতাংশ কমেছে। জানুয়ারিতে সোনার দাম যে রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছিল, সেখান থেকে এখন তা প্রায় ২২ শতাংশ কম।
সাধারণত মূল্যস্ফীতির বিরুদ্ধে সোনা নিরাপদ বিনিয়োগ মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত হয়। তবে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে স্বল্প থেকে মধ্য মেয়াদে ফেডারেল রিজার্ভের নীতি সুদহার বাড়তি থাকবে—এমন প্রত্যাশা জোরালো হচ্ছে। ফেডারেল রিজার্ভসহ বিভিন্ন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এমন অবস্থান সোনার বাজারে চাপ তৈরি করছে। সোনার থেকে সুদ বা সরাসরি আয় হয় না, সে কারণে ফেডের নীতি সুদহারের সঙ্গে সোনার প্রত্যক্ষ সম্পর্ক আছে।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, ঝুঁকি কমাতে বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদে বিনিয়োগ কমিয়ে আনায় স্বল্প মেয়াদে সোনার দামে তীব্র ওঠানামা অব্যাহত থাকতে পারে। ইরানকে ঘিরে চলমান সংঘাতে মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা বাড়ছে। সেই সঙ্গে নিকট ভবিষ্যতে ফেডারেল রিজার্ভ নীতি সুদহার কমাবে—এমন প্রত্যাশা কমছে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতেও চাপ তৈরি হয়েছে। তবে দীর্ঘ মেয়াদে মূল্য সংরক্ষণের নিরাপদ মাধ্যম হিসেবে সোনার গুরুত্ব আবারও বাড়তে পারে বলে তাঁদের ধারণা।
এদিকে গতকাল দিনের শুরুতেই সোনার দাম চার মাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসে—আউন্স প্রতি দাম কমে দাঁড়ায় ৪ হাজার ৯৮ ডলার। পরে অবশ্য দাম বেড়ে যায়। একই সময়ে বিশ্বের সবচেয়ে বড় স্বর্ণভোক্তা দেশ চীনের শেয়ারবাজারে এক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ দরপতন হয়। চীনের বাজারও শেষমেশ ঘুরে দাঁড়ায়।
গতকাল সোনার দামে বড় ধরনের পতনের পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষণায় সোনার দাম ঘুরে দাঁড়ায়। ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলার পরিকল্পনা আপাতত স্থগিত করা হয়েছে—ট্রাম্পের এ ঘোষণার পর সোনার দাম আংশিকভাবে ঘুরে দাঁড়ায়।
কী হচ্ছে সোনার বাজারে
বিশ্ববাজারে সোনার দাম গত বছর ৭০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। গত ২৬ জানুয়ারি সোনার দাম আউন্সপ্রতি পাঁচ হাজার ডলার ছাড়িয়ে যায়। এর পর থেকে সোনার দাম আউন্সপ্রতি পাঁচ হাজার ডলারের কাছাকাছি ঘোরাফেরা করছিল। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যদ্বাণী ছিল, চলতি বছর সোনার দাম ছয় হাজার ডলার ছাড়িয়ে যাবে।
সাধারণত অর্থনৈতিক সংকটের সময় বিনিয়োগকারীরা নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য সোনার দিকে ঝোঁকেন। ফলে সোনার মূল্য দ্রুত বেড়ে যায়। বিশ্বব্যাপী সংঘাতের সময় এই প্রবণতা আরও স্পষ্ট হয়।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, রাশিয়া ইউক্রেনের সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার পর সোনার দাম দ্রুত বেড়ে যায়। প্যারিসভিত্তিক ফরাসি আন্তর্জাতিক ও কৌশলগত গবেষণা ইনস্টিটিউটের অর্থনীতিবিদ রেমি বুরজো বলেন, পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছিল। এতে সোনার বাজারের গতিপথই বদলে যায়।
চীনসহ কয়েকটি দেশ ডলারের ওপর নির্ভরতা কমাতে ব্যাপকহারে সোনা কেনা শুরু করে। এতে সোনার দাম বাড়তে শুরু করে। তবে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের ইরানবিরোধী যুদ্ধের সময় সোনার বাজারে ভিন্ন চিত্র দেখা যাচ্ছে।
ডলারের শক্তি বাড়ছে
ইরানের সঙ্গে ইসরায়েল–যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের মধ্যে মার্কিন ডলারের দাম বাড়ছে। বিশ্বের বিভিন্ন প্রধান মুদ্রার বিপরীতে ডলার শক্তিশালী হচ্ছে। আজ শূন্য দশশিক ২ শতাংশ বেড়ে ৯৯ দশমিক ৩৮৭-এ উঠেছে। খবর রয়টার্সের
সামগ্রিকভাবে মার্চ মাসে ডলার ইনডেক্সের মান ১ দশমিক ৮ শতাংশ বেড়েছে। অক্টোবরের পর এটাই ডলার ইনডেক্সের মাসিক সর্বোচ্চ বৃদ্ধি। ইরানকে ঘিরে চলমান সংঘাতের কারণে নিরাপদ বিনিয়োগের চাহিদা বেড়েছে। বিনিয়োগকারীরা মনে করছেন, ফেড আপাতত সুদহার কমাবে না।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, একদিকে তেলের দাম বাড়তি, আরেক দিকে যুদ্ধ পরিস্থিতির সমাধান দেখা যাচ্ছে না; এই পরিস্থিতিতে ডলারের পালে যে হাওয়া লেগেছে, তা আগের মতোই থাকবে। যুদ্ধ বন্ধের ইঙ্গিত না থাকলে এ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকতে পারে। এদিকে এশিয়ার বাজারে দুই বছর মেয়াদি মার্কিন ট্রেজারি বন্ডের সুদহার আজ ৭ দশমিক ৭ ভিত্তি পয়েন্ট বেড়েছে। ফলে ডলার আরও শক্তিশালী হবে।
এ বছর সোনা ঐতিহাসিক গড়ের তুলনায় অনেক বেশি দামে লেনদেন হচ্ছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা। ফলে যুদ্ধের মধ্যে সোনার দাম বাড়ছে না। সেই সঙ্গে ডলারের বিনিময় হার বেড়ে যাওয়ায় সোনার দাম এখন কমছে।
বিষয়টি হলো, যেহেতু সোনার লেনদেন ডলারে হয়, সেহেতু ডলার শক্তিশালী হলে সোনার মূল্যবৃদ্ধি কঠিন হয়ে পড়ে। সোনার দাম যে টানা ১০ দিন ধরে কমছে, এটাই তার মূল কারণ।
যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে ও ক্ষয়ক্ষতি বাড়তে থাকলে সোনা আবারও বিনিয়োগকারীদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে। তবে আপাতত সোনার বাজারে বড় ধরনের উত্থানের স্পষ্ট ইঙ্গিত নেই বলেই মনে করেন বিশ্লেষকেরা।