লিপস্টিক

আপাতদৃষ্টে পণ্য হিসেবে লিপস্টিককে নিরীহ মনে হলেও ২০০১ সালের মন্দায় যুক্তরাষ্ট্রে ‘লিপস্টিক তত্ত্ব’ জনপ্রিয়তা পায়। তবে লিপস্টিক বিক্রির সঙ্গে মন্দার সম্পর্ক ঠিক উল্টো। মন্দা শুরু হলেও লিপস্টিকের বিক্রি কমেনি। ১৯২৯ ও ১৯৩৩ সালের মহামন্দার সময় এ প্রবণতা দেখা গেছে।

২০০০ সালে আমেরিকার অর্থনৈতিক মন্দার সময় প্রসাধন সংস্থা এস্টি লওডার প্রথম ‘দ্য লিপস্টিক এফেক্ট’ শব্দটি ব্যবহার করে। বিশেষজ্ঞদের মতে, আর্থিক সংকটের মুখে পড়ে সে দেশের নারীদের মধ্যে লিপস্টিক কেনার প্রবণতা বেড়ে গিয়েছিল।

চলতি বছর অর্থনীতিতে মন্দাভাব দেখা দিলেও আগের মন্দার সময়ের মতো লিপস্টিক বিক্রি কমেনি, বিশেষজ্ঞরা একে বলছেন ‘লিপস্টিক সূচক’। মার্কিন অর্থনৈতিক বিশ্লেষক নাতালিয়া বামবিজারের মতে, ২০২২ সালের প্রথম প্রান্তিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে লিপস্টিক বিক্রি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪৮ শতাংশ বেড়েছে।

কেন মন্দায় লিপস্টিকের বিক্রি বাড়ে

লিপস্টিক এফেক্ট নামের যে তত্ত্বটি মন্দার কারণে জনপ্রিয়তা পেয়েছে, তার কারণ হিসেবে বেশ কিছু মতামত বা ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। এর মধ্যে জনপ্রিয় ব্যাখ্যা হচ্ছে, মানুষের আয় কমে গেলে তারা বিলাস পণ্য কেনা বন্ধ করে দেয়। তার পরিবর্তে কম বিলাসী পণ্য কেনার প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠে। যখন অর্থনীতি স্বাভাবিক থাকে, মানুষের আয়রোজগার ভালো থাকে, তখন সাধারণত বিলাসী পণ্যের চাহিদা বেড়ে যায়। আর আয়রোজগার কমে গেলে তখন কম বিলাসী পণ্যের চাহিদা বাড়ে। তখন এসব পণ্যের বিক্রি বেড়ে যায়।

এ ছাড়া মন্দার সময় লিপস্টিক বিক্রি বেড়ে যাওয়ার আরও একটি কারণের কথা জানা যায়। সেটি হচ্ছে মানুষ তার আর্থিক কষ্ট বা আর্থিক সমস্যার কথা ভুলে থাকতে নিজের প্রতি অধিক যত্নশীল হন। সাজগোজের মাধ্যমে নিজের পরিপাটি রাখার মধ্য দিয়ে কষ্ট ভুলে থাকার চেষ্টা করেন। এ কারণেও মন্দার সময় লিপস্টিকের চাহিদা বেড়ে যায় বলে যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক খাতের বিশ্লেষকদের ধারণা। এ জন্য মন্দার দেখা দিলেও লিপস্টিকের বিক্রির ওপর নজর রাখেন বিশ্লেষকেরা।

পুরুষের অন্তর্বাস

এদিকে ২০০৮ সালের মন্দার সময় লিপস্টিকের উল্টো এক বিষয় দেখা যায়। ফেডারেল রিজার্ভের তৎকালীন চেয়ারম্যান অ্যালান গ্রিনস্প্যান লক্ষ করেন, মন্দার সময় মানুষ অন্তর্বাস কেনা কমিয়ে দিয়েছে। কারণ, তখন কাপড় কেনা দায় হয়ে যায়, নতুন অন্তর্বাস কেনা মানুষের জন্য বাড়তি ঝামেলায় পরিণত হয়।

অ্যালান জানিয়েছেন, আমেরিকার পুরুষদের মধ্যে নতুন নতুন অন্তর্বাস কেনার ঝোঁক রয়েছে। বিশেষ কিছু ব্র্যান্ডের অন্তর্বাসের প্রতি রয়েছে বিশেষ দুর্বলতা। তবে সাম্প্রতিক সমীক্ষার তথ্য বলছে, বিগত কয়েক মাসে যুক্তরাষ্ট্রের পুরুষদের মধ্যে অন্তর্বাস কেনার পরিমাণ অনেক কমে গেছে। আর তা দেখেই মন্দা আসার আশঙ্কা করছেন দেশটির অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞরা।

তাই মন্দাকালীন অবস্থা বোঝার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে পুরুষের অন্তর্বাস সূচক ব্যবহার করা হয়। ২০০৭ ও ২০০৯ সালে মন্দার কারণে যুক্তরাষ্ট্রে পুরুষের অন্তর্বাস বিক্রি উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কমে গিয়েছিল। আবার ২০১০ সালে অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের সময় পুরুষের অন্তর্বাস বিক্রি হু হু করে বাড়তে শুরু করে।

রোমান্স

২০০৯ সালে ঘটকালি ওয়েবসাইট ম্যাচ ডটকম সাত বছরের মধ্যে এক প্রান্তিকে সর্বোচ্চ আয় করে। এরপর করোনা মহামারির মধ্যে দেখা গেছে, বাম্বল ও টিনডারের মতো ঘটকালি ওয়েবসাইটে প্রচুর মানুষ ঢুঁ মেরেছেন। বিষয়টি হচ্ছে, মানুষ ঘরে বসে থেকে মনের মানুষ খোঁজায় সময় দিয়েছে।

মরগ্যান স্ট্যানলির বিশ্লেষক লরেন শেঙ্ক এক পডকাস্টে বলেন, মন্দার সময়ও মানুষের ভালোবাসা ও সম্পর্কের প্রয়োজন হয়, এটা চিরন্তন। তাই যখনই ঘটকালির বিভিন্ন ওয়েবসাইটে মানুষের আনাগোনা বেড়ে যায়, তখন ধরে নেওয়া হয়, ঘরে বসে থাকা মানুষ একাকিত্ব দূর করতে সঙ্গী খুঁজছেন।

শ্যাম্পেন

যুক্তরাষ্ট্রের জনপ্রিয় পানীয়গুলোর মধ্যে অন্যতম হলো শ্যাম্পেন। যুক্তরাষ্ট্রের বাসিন্দারা যেকোনো আনন্দ শ্যাম্পেনের বোতল খুলে উদ্​যাপন করতে পছন্দ করেন। তাই বিশেষজ্ঞরা শ্যাম্পেনের বিক্রি দেখেও মন্দার পূর্বাভাস সম্পর্কে ধারণা করেন। তাঁদের মতে, শ্যাম্পেন বিক্রি দেখেও বোঝা যায়, যুক্তরাষ্ট্রে মন্দা আসতে পারে কি না।

১৯৮০-এর দশকের মাঝামাঝিতে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াল স্ট্রিটজুড়ে শ্যাম্পেনের বিক্রি বেড়ে গিয়েছিল। ১৯৮৭ সালে সারা বছরে ১ কোটি ৫৮ লাখ বোতল শ্যাম্পেন বিক্রি হয়েছিল। এরপরই ১৯৯২ সালে অর্থনৈতিক সংকটের মুখে শ্যাম্পেনের বিক্রি বেশ খানিকটা কমে যায়। এই একই জিনিস বারবার ঘটেছে। এরপর ২০০৬ সালে শ্যাম্পেনের বিক্রি অনেক বেড়ে যায়। তবে ২০০৯ সালে বিক্রি কমে প্রায় এক কোটিতে নেমে আসে। শ্যাম্পেনের বিক্রি কমে যায় ২০১২ সালের অর্থনৈতিক মন্দার সময়ও।